অকস্মাৎ জ্যান্ত একটা প্রাণী, ক্ষিপ্র ও ভারী, ঠিক ওর চোখের সামনে পানির ভেতর পাক খেল, আঁতকে উঠে ঝট করে হাতটা পানি থেকে তুলে নিল নিকোলাস। প্রাণীটা ওর হাতের পিছু নিয়ে সারফেস পর্যন্ত উঠে এলো, ওর নগ্ন মাংসে লম্বা সূচের মতো দাঁত বসাতে চেষ্টা করলো। পলকের জন্য কুৎসিত ও ভীতিকর ব্যারাকুড়ার মতো মাথাটা দেখতে পেল ও, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো আঙুলের ক্ষত থেকে বের হওয়া রক্তের গন্ধই ওটাকে আকৃষ্ট করেছে।
লাফ দিয়ে সোজা হলো নিকোলাস, সরু কার্নিসে টলমল করছে অক্ষত হাতে অপর হাতের বাহু খামচে ধরেছে। প্রাণীটার শুধু সামনের একটা দাঁত স্পর্শ করেছে ওকে, অথচ তাতেই ডান হাতের উল্টোপিঠের চামড়া যেনো ধারালো ক্ষুর দিয়ে চিরে দেওয়া হয়েছে। ওর পায়ের সামনে পানির উপর ঝর ঝর করে রক্ত ঝরছে।
চোখের পলকে কালো পানি যেনো জ্যান্ত হয়ে উঠলো, জলজ প্রাণীর আকৃতি তীব্র উন্মাদনায় মোচড় খাওয়ায় আলোড়িত পানিতে ফেনা তৈরি হলো। পাঁচিল পিঠ সাঁটিয়ে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে নিকোলাস। আকৃতিগুলো অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে ও, মোচড়ানো ও আঁকাবাঁকা ফিতের মতো, কোনো কোনটা ওর কব্জির মতো চওড়া, কালো আর চকচকে।
ঈল, বুঝতে পারলো নিকোলাস। ওর জানা আছে ট্রপিক্যাল ঈল এরকম দৈত্যাকারই হয়। বদ্ধ জলে আটকা পড়েছে ওগুলো, ছোট্ট জায়গায় সংখ্যায় খুব বেশি হওয়ায় সমস্ত মাছ ইতোমধ্যে সাবাড় করে ফেলেছে, ফলে খিদের জ্বালায় একেকটা রাক্ষসে পরিণত হয়েছে। শেষবার এখানে সাঁতার কাটার সময় ওর শরীর থেকে রক্ত ঝরেনি, সেজন্য ভাগ্যকে কৃতজ্ঞতা জানালো নিকোলাস।
গলা থেকে সূতি রুমালটা খুলে হাতের ক্ষতটা বাধলো। পাহাড়-প্রাচীরের ফাটলটা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, ঈলগুলো মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এরই মধ্যে ওগুলোয় কী ব্যবস্থা করে যায় চিন্তা করে কেরেছে নিকোলাস।
ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো হ্রদের পানি। চেয়ার সহ কপিকলটা নেমে আসছে আবার। ফাটলের ভেতর কোনও টানেল পেলেন? চেয়ার তেকে জানতে চাইলো। রোয়েন। তারপর নিকোলাসের হাতে বাধা রুমালটা দেখে আঁতকে উঠলো। আরে রক্ত কেন? কীভাবে কাটলো?
রক্ত একটু বেশি বের হচ্ছে, তবে ক্ষতটা গভীর নয়, বলল নিকোলাস। কীভাবে হলো? রক্তে ভেজা রুমালের একটা কোণ ছিঁড়ে পানিতে ফেললো ও। দেখুন।
লম্বা আকৃতিগুলো পানিতে আলোড়ন তুলতে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো রোয়েন। একটা ঈল পানির উপর মাথা তুলে শরীরের অর্ধেকটা আছড়ালো সরু কার্নিসে, তারপর কয়েকটা মোচড় খেয়ে আবার অদৃশ্য হলো পানির নিচে। কি… কি ওগুলো?
বিশ্বস্ত দারোয়ান রেখে গেছে টাইটা, বলল নিকোলাস। আমরা যাতে পানির নিচে ফাটলটায় ঢুকতে না পারি।
*
বাঁশ দিয়ে নিকোলাস ও ড্যানিয়েল যে ভারাগুলো বানিয়েছে সেগুলো ঝুলে আছে প্রায় চার হাজার বছর আগে পাথর কেটে তৈরি করা কুলুঙ্গিতে গাঁথা অবস্থায়। টাইটা প্রতিটি কাঠামো জোড়া লাগিয়েছিল সম্ভবত গাছের বাকল দিয়ে তৈরি রশি দিয়ে, তবে ড্যানিয়েল ব্যবহার করছে হেভী-গজ গ্যালভানাইজ ওয়ায়্যার, ফলে অনেক লোকের ভার সহ্য করার মতো পোক্ত হয়েছে। বাঘ নামে শ্রমিকদের গ্রুপটা একটা চেইন তৈরি করলো, সমস্ত জিনিসপত্র আর ইকুইপমেন্ট হাতে হাতে নামতে শুরু করলো এক ভারা থেকে আরেক ভারায়।
খাদের নিচে প্রথমে নামানো হলো পোর্টেবল হোল্ডা ইএমফাইভ হানড্রেড জেনারেটর। পাহাড়-প্রাচীরের গোড়ায় ফ্লাডলাইট সাজানো হয়েছে আগেই, কানেকশন দেয়ার পর জেনারেটর চালু করতেই উজ্জ্বল আলো বহুদূরে তাড়িয়ে নিয়ে গেল ছায়াগুলোকে। ভারার উপর থেকে শ্রমিকদের হাততালি আর হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। ফুয়েল বাঁচানোর জন্য একটু পরই অবশ্য বন্ধ করে দেওয়া হলো জেনারেটর।
জলমগ্ন ফাটলটার চারধারে গ্যাবিয়ন অর্থাৎ তারের জানে আটকানো বোল্ডার ফেলা হলো, এরপর বালতি করে শুরু হবে পানি সেচা। তার আগে সবাইকে ভারার উপর আশ্রয় নিতে বলল নিকোলাস, হ্রদের কিনারায় একা থেকে গেল ও সঙ্গে ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড ভরা একটা ব্যাগ। গ্রেনেডগুলো গেরিলা লীডার মেক মেক নিমুরের কাছ থেকে দান হিসেবে পেয়েছেও।
পিন খোলার সাত সেকেন্ড পর বিস্ফোরিত হলো ওগুলো হ্রদের মাঝখানে একের পর এক অনেকগুলো ছুঁড়ে দিল নিকোলাস। একটা করে ছেড়ে, কার্নিস ধরে যতটা সম্ভব দূরে সরে আসে, কানে হাত। শেষ গ্রেনেডটা বিস্ফোরিত হওয়ার পর হ্রদের কিনারায় ফিরে এসে নিকোলাস দেখলো অসংখ্য ঈল মারা গেছে, তবে আহত হয়ে মোচড় খাচ্ছে তারচেয়েও বেশি, বিস্ফোরণের ধাক্কায় হ্রদের পানি থেকে ডাঙায় উঠে এসেছে। ভারা থেকে নেমে এসে শ্রমিকরা মরা ও আধমরা ঈলগুলো তুলে যত্ন করে সাজিয়ে রাখছে দেখে নিকোলাস একজন সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা এগুলো খান?
পেটে হাত বুলিয়ে সন্ন্যাসী একগাল হাসলেন, ভারি স্বাদ!
একটা বাঁশ দিয়ে হ্রদের গভীরতা মাপল নিকোলাস, প্রায় সাত ফুট। গ্যাবিয়ন ফেলে পুলটাকে অর্ধচন্দ্র আকৃতিতে ঘিরে ফেলা হয়েছে, বালতি দিয়ে বাঘেরা পানি সেচতে শুরু করলো। পানির লেভেল নিচে নামছে, সেই সঙ্গে পাহাড়-প্রাচীরের গোড়ার পালটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
