পনেরো দিনের দিন তৈরি হয়ে গেল বাঁধ। সেদিনই নতুন কাটা খাল বেয়ে ছুটলো ডানডেরা, কিছুদূর গিয়ে ছড়িয়ে পড়লো গোটা উপত্যকায়।
খালের পাড় ধরে রোয়েনকে নিয়ে হাঁটছে নিকোলাস, লম্বা উপত্যকার পুরোটা দৈর্ঘ্য পেরিয়ে এলো ওরা। অবশেষে সেই প্রবাহটার কাছে পৌঁছল দু জন, যে ঝরনার মেরের সঙ্গে এসেছিল ওরা-তামের হাত লম্বা করায় আঙুলে এসে বসেছিল রঙিন প্রজাপতি। পাড়ে এসে দাঁড়ালো ওরা, তারপর কথা না বলে পরস্পরের দিকে তাকালো। প্রবাহটা নেই, শুকিয়ে গেছে।
ঘুরে গিয়ে খালি ঝরনার তলা অনুসরণ করলো ওরা, ঢাল বেয়ে উঠছে। খানিক দূর ওঠার পর একটা কার্নিসে পৌঁছল, প্রজাপতি ঝরনার এখান থেকেই নির্গত হতো। গুহাটা এখনো গাঢ় সবুজ লতা গুল্মে ভরে আছে, তবে এখন দেখতে হয়েছে কঙ্কালের খুলির অক্ষিগোলকের মতো, অন্ধকার ও খালি।
ঝরনা শুকিয়ে গেছে! ফিসফিস করলো রোয়েন, নিকোলাসের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। বাধ তৈরি হওয়ার ফলে পানির সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। এ থেকেই প্রমাণ হয় টাইটার পুল থেকেই এখানে পানি আসছিল!
আসুন, উত্তেজনায় রোয়েনের একটা হাত চেপে ধরলো নিকোলাস। এখানে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
কোথায়? রোয়েন অবাক। নিকোলাসের আরো কাছে সরে এলো ও।
কোথায় আবার, টাইটার পুলে। ফিসফিস করলো নিকোলাস।
*
টাইটার পুলে প্রথমে নামলো নিকোলাস। পাহাড়-প্রাচীরের মাথা থেকে নিচে নামার জন্য এবার চওড়া কপিকল ব্যবহার করা হচ্ছে, দোলনার মতো দেখতে রশির শেষ প্রান্তে কাঠের চেয়ার সহ। পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে ফুলে থাকা ঝুল পাথরটাকে এড়াবার সময় আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দুলতে শুরু করলো চেয়ার, পাঁচিল আর চেয়ারের মাঝখানে আটকা পড়লো ওর ডান হাতটা। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলো নিকোলাস, হাতটা ছাড়িয়ে আনার পর দেখলো একটা আঙুলের গিটের চামড়া উঠে গেছে, টপ টপ করে রক্ত ঝরছে ক্ষতটা থেকে। জখমটা তেমন গুরুতর নয়, মুখের ভেতর পুরে চুষে পরিষ্কার করে নিল। তারপরও অবশ্য রক্ত বের হচ্ছে, তবে এ মুহূর্তে আর কিছু করার নেই ওর।
জুল-পাথরটাকে ছাড়িয়ে এসেছে কপিকল, ওর নিচে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো অতল গহ্বর, প্রায় অন্ধকার গা ছমছম করা পরিবেশ। পাথর পাঁচিলের গায়ে খোদাই করা নকশাটার উপর চোখ আটকে গেল, খাড়া দুই সারি কুলুঙ্গির মাঝখানে। কী খুঁজতে হবে জানে বলেই এবার পঙ্গু বাজপাখিটার আউটলাইন চিনতে পারলো ও। প্রায় এক মাস আগে গিরিখাদ ছেড়ে চলে যাবার পর মনে প্রায়ই একটা সংশয় জাগত যে ব্যাপারটা বোধহয় তাদের কল্পনা, পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে টাইটা নিজের কোনো প্রতীক চিহ্ন খোদাই করে নি, আবার ফিরে এলে দেখতে পাবে পাচিলটা মসৃণ ও নিষ্কলঙ্ক। কিন্তু না, ব্যাপারটা কল্পনা নয়। প্রতীক চিহ্ন একটা সত্যি আছে, সেই সঙ্গে আছে প্রতিশ্রুতি।
পায়ের নিচে গিরিখাদের তলায় তাকালো নিকোলাস, পুরের উপর জলপ্রপাতের ধারা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। উজানে তৈরি বাঁধের ভেতর দিয়ে জোয়ানো পানি এখনো নেমে আসছে, তবে খুব বেশি নয়। ওর নিচে হ্রদের লেভেল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে, পাথর পাঁচিলের গায়ে পানির ভেজা ধাপ দেখে বোঝা গেল। এখন আরো পঞ্চাশ ফুট পাঁচিল পানির উপর রয়েছে। আরো আট জোড়া কুলুঙ্গি দেখা যচ্ছে পানির উপর। আগে যেখানে ওগুলোর কাছে যাবার জন্য সাঁতরাতে হয়েছে। নিকোলাসকে, এখন সেখানে প্রায় কোনো পানিই নেই।
তবে পুলটা পুরোপুরি পানি শূন্য হয়ে পড়ে নি। মাঝখানটায় এখনো কালো পানি জমে আছে, চারপাশে সরু কার্নিস। ওই কার্নিসেই নামলো নিকোলাস। বিচিত্র অভিজ্ঞতাই বলতে হবে। এখানে যখন শেষবার এসেছিল, পানির নিচের ফাটলটা ওকে টেনে নিতে চেয়েছিল ভেতরে, প্রাণ বাঁচাবার জন্য মরণপণ যুদ্ধ করতে হয়েছিল ওকে।
মুখ তুলে তাকালো নিকোলাস, গহ্বরের ওপরের স্তরে, রোদ যেখানে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। ও যেনো একটা মাইনশ্যাফটের তলায় রয়েছে। তলপেটের ভেতরটা খালি খালি লাগলো, স্যাঁতসেঁতে বাতাসে কেঁপে উঠলো শরীর। কপিকলের রশিতে ঝাঁকি দিল ও, উপর থেকে সেটা টেনে নিল ওরা। পিচ্ছিল পাথুরে কার্নিস ধরে পাহাড়-প্রাচীনের দিকে এগুলো নিকোলাস, ওখানে কুলুঙ্গির সারিগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
পাঁচিলের গায়ে ফাটলটার আকৃতি এখন পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছে নিকোলাস। ওই ফাটলই ওকে নিজের শ্যাওলা ভরা গলায় টেনে নিতে চেয়েছিল। পাচিলের গোড়ায় পানি জমে গেছে, গভীরতাও একটু বেশি, ফলে ফাটলট। প্রায় পুরোপুরি ডুবে আছে এখনো। সারফেসের উপর দেখা যাচ্ছে শুধু নেমে আসা কুলুঙ্গি সারির নিচে খিলান আকৃতির ফাটলটার ওপরের অংশ। বাকিটা পানির নিচে।
ক্যার্নিস ধরে পাঁচিল ঘেঁষে এগুচ্ছে নিকোলাস, ক্রমশ সরু হয়ে আসছে কার্নিস। পাঁচিল পিছ ঘষে এগুতে হচ্ছে ওকে, পায়ের গোড়ালি পানি ছুঁয়ে থাকছে। তারপর আর পানিতে না নেমে এগুবার উপায় থাকলো না। অথচ এখানে পানির গভীরতা সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা নেই।
তবু পা শুকনো রাখার জন্যে সরু কার্নিসে উবু হয়ে বসলো নিকোলাস, একটা হাত পাঁচিলে রেখে ঝুঁকলো, অপর হাতটা দিয়ে ভোবা ফাটলটার নাগাল পেতে চাইছে।
গর্তটার ঠোঁট মসৃণ। কিনারাগুলো এতো বেশি সরল আর ফাটলটা এতো বেশি চৌকো, ধরেই নিতে হয় মানুষের তৈরি। শার্টের আস্তিন গুটাবার সময় নিকোলাস লক্ষ্য করলো, ওর আহত আঙুলটা থেকে এখনো রক্ত গড়াচ্ছে। তবে গ্রাহ্য না করে হাতটা ডুবিয়ে দিল পানির তলায়। নিচের দিকটা হাতড়াচ্ছে, ফাঁকটার সিল বা গোবরাট খুঁজছে। আঙুলের ডগায় কর্কশ পলস্তারা করা একটা ব্লক ঠেকলো। আরো ঝুঁকলো নিকোলাস, পানির নিচে বাইসেপের অর্ধেকটা ডুবে গেল।
