চিৎকার করে শ্রমিদের কাজে ফিরতে বলল নিকোলাস। উপত্যকা ধরে এক লাইনে উঠতে শুরু করলো তারা। নিকোলাসের নির্দেশে কাজের সময় তারা শুধু ল্যাঙট বা নেংটি পরে আছ। প্রচণ্ড গরমে দরদর করে ঘামছে সবাই, কয়লার মতো কালো চামড়া চকচক করছে।
পাথরখনি থেকে পাথর বয়ে আসতে হচ্ছে নদীর কিনারায়, ওখানে তারের জালে ভরা হচ্ছে গ্যাবিয়ন।
*
যতোই কিনা ডলারের লোভ বা মারের ভয় দেখাও, সন্ন্যাসীরা কেউ রোববারে কাজ করবে না। রোববারে সারাদিন ঘুমোবে তারা। এর প্রস্তুতি হিসেবে প্রতি শনিবারে আগে ভাগেই কাজকর্ম শেষ করে ফেলে।
তো, শনিবার রাতে যখন সব কয়টা ভোস ভোস করে ঘুমাচ্ছে, নিকোলাসের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। কিছুতেই ঘুমাতে পারছে না সে। শেষমেষ, একা একাই বাধের এলাকাটা দেখে এলো সে। ফিরে এসে দেখে, পুরোদস্তুর কাপড়-চোপড় পরে বসে আছে রোয়েন–তারও ঘুম আসে না।
কফি? আগুনের ধার থেকে নিকোলাসের জন্য কাপে কফি ঢাললো ও।
গতরাতে আমারও ঘুম হয় নি, স্বীকার গেল রোয়েন। একদম বাজে একটা স্বপন দেখেছি। একবার দেখলাম, মামোসের সমাধিতে গোলকধাঁধার মধ্যে হারিয়ে গেছি। সমাধি প্রকোষ্ঠ খুঁজছি-, একের পর এক দরজা খুলছি কিন্তু প্রতিটি কক্ষেই মানুষজন। একটা কক্ষে কাজ করছিল ডুরেঈদ–আমি দেখলাম–ও আমার উদ্দেশ্যে বলছে, চার ষাঁড়ের চাল মনে আছে তো? শুরু থেকে ওই নিয়মে খেলবে! এতো জীবন্ত, এতো সত্যি! আমি খুব চাইছিলাম ওকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথেই বুঝলাম, ওকে আর কোনোদিনও
দেখতে পাবো না! ক্যাম্পফায়ারের আলোয় মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। রোয়েনের চোখের পানি।
এমন বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা থেকে ওর এ সরিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়ে নিকোলাস বলল, অন্যান্য কক্ষে কাদের দেখলেন?
পরের রুমে ছিলেন নাহুত গাদ্দাবি। খুশির হাসি হেসে, তিনি বললেন, শিয়াল ধাওয়া করছে সূর্যকে! সাথে সাথে, তার চেহারা পাল্টে হয়ে গেল শিয়াল দেবতা আনুবিস–সমাধি দেব। এমন ডাকাডাকি শুরু করলো, ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম আমি।
নীরবে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে ওরা। শেষমেষ, রোয়েন বলে উঠলো, জানি, এ সবই উঠলোতু–অর্থহীন। কিন্তু পরের রুমে ফন শিলার ছিলেন। তিনি আকাশে উড়ে, ডানা ঝাঁপটে বললেন, পাখা মেলেছে শকুন, আর পতন ঘটছে অতিকায় পাথরের। ঘৃণায় ইচ্ছে হলো তাকে আঘাত করি, কিন্তু তা করার আগেই পালিয়ে গেল যে!
এরপর আপনি জেগে গেলেন? নিকোলাস বলে।
না। আরো একটা কক্ষ দেখেছি স্বপ্নে।
এবারে কে ছিল? চোখ নামিয়ে নিল রোয়েন, মৃদুস্বরে বলল, আপনি ছিলেন।
আমি? বলেন কি?
কিন্তু আপনি কিছু বলেন নি। বলে, লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো রোয়েন। দারুণ মজা পেল নিকোলাস।
কী করলাম আমি তখন?
কিছু না। মানে আপনাকে তা বলতে পারবো না। রোয়েনের চোখের সামনে এখনো ভাসছে দৃশ্যগুলো একেবারে জীবন্ত। নিকোলাসের সুঠাম-নগ্ন শরীরের সৌন্দর্য, গন্ধ–সব এসে যেনো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো ওকে।
আরে, বলুনই না! কি করছিলাম? নিকোলাস শুনেই ছাড়বে!
না! দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে চট করে উঠে দাঁড়ায় রোয়েন, লজ্জায় মুখ লাল। এ প্রথম স্বপ্নে কাউকে ওমন করে দেখলো ও। অনুভব করলো চরম পুলক। ভোরে ঘুম ভেঙে উঠে রোয়েন আবিষ্কার করেছে, ওর পাজামার নিচটা ভিজে গেছে।
আমাদের সামনে পুরো এক দিনের কাজ! এ কথাটাই মাথায় এলো মেয়েটার।
হ্যাঁ। এখান থেকে বের হবার উপায় খুঁজে পেতে হবে আমাদের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিকোলাস বলে।
*
প্রথম কয়েকদিন কাজের কোনো অগ্রগতি খালি চোখে ধরা পড়লো না। জালে আটকানো যতো বোল্ডারই ফেলা হলো সব বেমালুম হজম করে ফেলছে ডানডেরা। তারপর অবশ্য ধীরে ধীরে উঁচু হতে শুরু করলো বাঁধ। অমনি কাজের উৎসাহ বেড়ে গেল সবার। আরো দু দিন পর নদীর এদিক থেকে পানিতে বোল্ডার ফেলা অসম্ভব মনে হলো, এবার কাজ শুরু করতে হবে নদীর উপর থেকে।
শ্রমিকদের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় ডানডেরার অগভীর পয়েন্ট পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। ট্যাক্টরটাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওপারে, একশো লোক রশি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে গেছে। ওখান থেকে ড্যাম সাইটে আসার জন্য আরো একটা পথ তৈরি করতে হলো। তারপর থেকে প্রতিদিন কয়েক মিটার করে লম্বা হচ্ছে বাঁধটা, মাঝখানের ফাঁক ক্রমশ সরু হয়ে আসছে।
ওদিকে বাফেলল আর হাতি–শ্রমিকদের দুটো দল, ড্যাম সাইট থেকে দুশো : মিটার দূরে কঠিন পরিশ্রম করছে। জঙ্গল থেকে কেটে আনা গাছের কাণ্ড দিয়ে খেলনা তৈরি করছে তারা। গাছের কাণ্ড পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে হেভি পিভিসি দিয়ে মোড়া হচ্ছে, ওয়াটারপ্রুফ করার জন্য। কাঠামোটার উপর চাপানো হচ্ছে একই আকৃতির আরো একটা কাঠামো। দৈত্যকার একটা স্যান্ডউইচ তৈরি হলো, বাঁধা হলো মোটা তার দিয়ে। সবশেষে জোড়া লাগানো কাঠামোর একপ্রান্তে বোল্ডার ভরে ব্যালাস্ট তৈরি করা হলো। ভেলার একটা দিক ভারী করতে চেয়েছে ড্যানিয়েল, ওটা যাতে পানিতে প্রায় খাড়াভাবে ভেসে থাকে-একটা প্রান্ত নদীর তলায় আঁচড় কাটবে, অপরপ্রান্তটা ভেসে থাকবে সারফেসের উপর। এ ভেলা বাঁধের দুই বাহুর মাঝখানের ফাঁকে আলম্ব বা ঠেকনা হিসেবে কাজ করবে।
হাতি, মোষ আর গণ্ডার, এ তিনটে দল উপত্যকার মাথায় মাটি খুঁড়ে একটা খাল তৈরি করছে; নদী দিক বদলে ওই খালে ঢুকবে।
