ড্রপ শুরু করার আগে প্লেন নিয়ে পাঁচ মাইল সোজা এগিয়ে আসার মতো উন্মুক্ত আকাশ পাবেন জেনি। ফ্লেয়ার আর মার্কার গতকালই কিছু কিছু বসানো হয়েছে, আজ সেগুলো চেক করলো ওরা। উপত্যকার মাথায় রয়েছে ড্যানিয়েল, আকাশের গায়ে তার নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে স্মোক ফ্লেয়ার সেট করছে সে। ঘাড় ফিরিয়ে উল্টো দিকে তাকালো নিকোলাস, উপত্যকার দূর প্রান্তে একটা পাথরের উপর বসে রয়েছে ড্যানিয়েল। মেকের লোকজন এখনো মার্কার বসানোর কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারে নি, তবে জানিয়েছে আর বেশি সময় নিবে না।
সব কিছু সুষ্ঠুভাবেই ঘটলো। ঘড়ির কাঁটা ধরে উড়ে এলো জেনি বাদেনহোর্সটের প্রকাণ্ড হারকিউলিস। মোট ছয় বার উপত্যকার উপর দিয়ে উড়ে গেলেন তিনি, প্রতিবার চারটে করে ভারী ও চৌকো বাক্স ফেললেন নিচে। বাতাসে ভর করে প্যারাস্যুটগুলো উপত্যকার নানাদিকে ছড়িয়ে পড়লো। আগেই নির্দেশ দেওয়া আছে, দল বেঁধে ছুটলো তরুণ সন্ন্যাসীরা, বাক্সগুলো ধরা ধরি করে তুলে আনবে। নিকোলাস, মেক আর মানটিন আলোচনা করে আগেই ঠিক করে রেখেছে ক্যাম্পের কোথায় কী রাখা হবে। প্রতিটি বাক্সে নম্বর দেওয়া আছে, নম্বর দেখে বোঝা যাবে কোনটায় কী আছে। এক নম্বর বাক্সে আছে শুকনো খাবার, ওদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, ক্যাম্পিং ইকুইপমেন্ট, মশারিসহ; মেককে খুশি করার জন্যে কয়েক বোতল হুইস্কিও আনা হয়েছে। এ বাক্সটার দায়িত্বে নিকোলাস নিজে থাকলো।
নির্মাণ সামগ্রী আর হেভি ইকুইপমেন্টের দায়িত্ব থাকলো ড্যানিয়েলের উপর। তার নির্দেশ অনুবাদ করছে টিসে, সন্ন্যাসীরা বাক্সটা বয়ে নিচে যাচ্ছে প্রাচীন পাথরখনিতে।
রাত হয়ে গেল, অথচ অর্ধেক বাক্সও উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি, যেখানে পড়েছে সেখানেই পড়ে থাকলো। সশস্ত্র পাহারার ব্যবস্থা করলো মেক, কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সে।
পরদিন আবার হারকিউলিস নিয়ে ফিরে এলেন জেনি। এবার তিনি রোজিরেস থেকে কার্গো তুলে এনেছেন। সব বাক্স উপত্যকা থেকে তুলে আনতে আরো দুটো দিন লেগে গেল। প্রায় সবই জমা করা হলো প্রাচীন পাথরখনিতে, বাক্স খোলর পর জিনিসগুলো এমনভাবে সাজানো হলো যাতে যেটা যখন দরকার চাইলেই পাওয়া যাবে।
এ কয় দিন কাজ করার সময় সন্ন্যাসীদের উপর নজর ছিল নিকোলাসের, কয়েকজনের পরিচয় আলাদাভাবে জানার সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে কারো কারো রয়েছে নেতৃত্ব দেয়ার গুণ। দু একজন আরবি ও অল্পস্বল্প ইংরেজি জানে। তাদের মধ্যে একজন হানশিত শেরিফ। নিকোলাস তাকে সহকারি হিসেবে বেছে নিল, দোভাষীর কাজও চালানো যাবে।
ক্যাম্প গুছিয়ে নেয়ার পর কাজ ভাগাভাগির পালা। রোয়েন আর টিসের কাছ থেকে নিকোলাসকে দূরে সরিয়ে এনে মেক বলল, এখন থেকে আমার কাজ হবে সাইটের সিকিউরিটি রক্ষা করা। তৃতীয়বার হামলা করতে পারে নগু, কাজেই প্রস্তুত থাকা দরকার। তোমরা যে খাদে ফিরে এসেছ, এ খবর পেতে দেরি হবে না তার।
শাবলের চেয়ে একে-ফরটিসেভেনই মানাবে তোমার হাতে, সায় দিল নিকোলাস। তবে টিসেকে এখানে রেখে যাও। ওকে আমার দরকার।
তা থাকুক, তবে আশা করব ওর উপর নজর রাখবে তুমি। রাতে এসে একবার করে দেখে যাব আমি।
নিজের লোকজনকে ডিফেন্সিভ পজিশনে পাঠিয়ে দিল মেক। ট্রেইলের অনেক দূর পর্যন্ত থাকলো তারা, ক্যাম্পের চারধারেও পজিশন নিল। কাজ থেকে মুখ তুলে তাকালে নিকোলাস তাদের দু একজনকে উঁচু জমিনের মাথায় নড়তে চড়তে দেখতে পায়।
সেই থেকে রোজ রাতে ক্যাম্পে এসে টিসের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে মেক। কোনো কোনো গভীর রাতে টিসের তাঁবু থেকে তার ভরাট গলার উল্লাসধ্বনি ভেসে আসে, তার সঙ্গে মিশে থাকে টিসের জলতরঙ্গ হাসি। তখন রোয়েনের কথা মনে পড়ে যায় নিকোলাসের। পাশের তাঁবুতেই রয়েছে মেয়েটা, অথচ কত দূরে।
৬. পঞ্চম দিনে তিনশো শ্রমিক
পঞ্চম দিনে তিনশো শ্রমিক পাঠালেন মাই মেতাম্মা। এরা কেউই সন্ন্যাসী নয়, পাহাড়ী গ্রামগুলোর তরুণ অধিবাসী। সবাইকে নিয়ে দল গঠন করা হলো, প্রতি দলে থাকলো ত্রিশজন শ্রমিক। দলের নেতা নির্বাচন করা হলো একজন সন্ন্যাসীকে। বাঘ, সিংহ, মৌমাছি-এভাবে রাখা হলো দলের নাম। স্বেচ্ছাসেবক হয়ে এসেছে সবাই, একঘেয়ে লাগলেই পালাবে। তাই পারিশ্রমিক দেয়ার কথা ঘোষণা করলো নিকোলাস, কাজের বিনিময়ে সবাইকে রূপালি ডলার, অর্থাৎ মারিয়া থেরেসা দেওয়া হবে। একটা লোহার সিন্দুকে ভরে এ ডলার প্রচুর পরিমাণে নিয়েও এসেছে নিকোলাস।
ফ্রন্ট-এন্ডারের উঁচু সিটে বসে কলকাঠি নাড়লো ড্যানিয়েল, ট্র্যাক্টরের হাইড্রলিক বাহু তুলে নিল তারের জাল দিয়ে তৈরি প্রথম গ্যাবিয়ন। বোল্ডর ভর্তি পার্সেল, ওজন হবে কয়েক টন। সবাই যে যার কাজ ফেলে ডানডেরা নদীর কিনারায় জুড়ো হয়েছে দেখার জন্য। হলুদ ট্রাক্টর নিয়ে খাড়া পাড় বেয়ে সাবধানে নেমে যাচ্ছে ড্যানিয়েল, বিস্ময়সূচক গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। গ্যাবিয়ন শূন্যে ঝুলছে, নদীতে নেমে এলে ট্র্যাক্টর। বাধা পেয়ে খেপে উঠলো নদীর স্রোত, পেছনের চাকার চারপাশে ফণা তুলছে! কিছুই গ্রাহ্য করছে না ড্যানিয়েল, নদীর আরো গভীরে নেমে যাচ্ছে সে।
মেশিনার পেট ডুবে গেল পানিতে। সন্ন্যাসীরা গান ধরল, বাকি সবাই তালি দিচ্ছে। মেশিন লক করে ব্রেক কষলো ড্যানিয়েল, ভারী গ্যাবিয়ন নিচে নামিয়ে এনে খালাস করলো পানিতে, তারপর পিছিয়ে আনছে ট্র্যাক্টর। গ্যাবিয়ন সঙ্গে সঙ্গে ডুবে গেছে, তবে ছোট একটা ঘূর্ণি ওটার অবস্থান চিহ্নিত করছে। নদীর কিনারায় আরেকটা গ্যাবিয়ন তৈরি রাখা হয়েছে, হাইড্রলিক বাহু তুলে নিল সেটাকে।
