দুই মেয়েই ঢালের উপর দাঁড়িয়ে পড়লো।
বেচারা বুড়ো মানুষটাকে এসব বলে লোভ দেখিয়েছ তুমি? জিজ্ঞেস করলো টিসে।
সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের বদলে অন্য একজন সেইন্টের দেহ। আমরা যদি সমাধিটা খুঁজে পাই, মঠের পাওনা হবে মামোসের মমি।
কাজটা অত্যন্ত নিচ হয়েছে, বিস্ফোরিত হলো রোয়েন। সাহায্য পাবার বিনিময়ে আপনি তাকে চিট করবেন?
কেন, চিট করা হবে কেন?
অভিযোগ শুনে রেগে গেল মেক। কোনো প্রমাণ নেই যে ওটা আসলেই সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের লাশ ছিল। অথচ তারপরও কয়েকশো বছর ধরে এলাকার খ্রিস্টানদের ঐক্যবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য পূরণ করছিল, গোটা ইথিওপিয়ার তীর্থযাত্রীদের আকর্ষণ করছিল, উৎসাহ দিচ্ছিল ভক্তবৃন্দকে সন্ন্যাসী হতে। এখন সেটা লুঠ হয়ে যাওয়ায় মঠের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
তাই আপনি মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেবেন? রোয়েন এখনো রেগে আছে।
ওঁরা যেটা হারিয়েছেন সেটার চেয়ে কোনো অংশে মামোসের লাশ কম অথেনটিক নয়। প্রাচীন খ্রিশ্চানের লাশের বদলে প্রাচীন মিশরীয়র লাশ হলে কী আসে যায়, যদি সবগুলো উদ্দেশ্য সেটা পূরণ করতে পারে এবং আরো পাঁচশো বছর টিতে থাকতে পারে মঠটা? নিকোলাসের দিকে ফিরলো মেক। তুমি কি বলো, নিকোলাস?
ধর্মীয় ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না, বলল নিকোলাস। তবে মনে হচ্ছে মেকের কথায় খানিকটা বোধহয় যুক্তি আছে।
খ্রিশ্চানিটি সম্পর্কে আপনি আবার কবে থেকে এক্সপার্ট হলেন? আপনি তো, আমি যতদূর জানি, অজ্ঞেয়বাদী।
সত্যিই তো, ওসব সম্বন্ধে আমি আর কী জানি। আপনি বরঞ্চ মেকের সঙ্গে আলাপ করুন, বলে ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে হাতজোড়া করে উঠে দাঁড়ালো নিকোলাস। আমি বরং স্যাপার ওয়েবের সঙ্গে বাঁধটা নিয়ে আলোচনা করি। হন হন করে এগিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের পাশে চলে এলো, লাইনের একেবারে মাথায়।
পেছন থেকে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। নিকোলাসের কানে। আপনমনে হাসলো ও। মেককে ওর চেনা আছে, নতুন করে চেনা হচ্ছে রোয়েনকে। ওদের মধ্যে কে জেতে দেখার খুব আগ্রহ জাগলো।
*
মাঝ দুপুরে গহ্বরের মাথায় পৌঁছল ওরা। ক্যাম্প ফেলার জন্য জায়গা খুঁজছে মেক, মারটনকে নিয়ে নদীর সরু গলায় চলে এলো নিকোলাস, ঠিক নদী যেখানে জলপ্রপাতে পরিণত হয়ে নিচে লাফ দিয়েছে, তার ওপরে। থিয়ডালাইট সেট করার পর হাত ইশারায় নিকোলাসকে লেভেলিং স্টাফ নিয়ে পাহাড়-প্রাচীরে ওঠা নামা করতে বলল ড্যানিয়েল, সারাক্ষণ থিয়ডালাইটের লেন্সে চোখ। ওঠা নামা করার সময় লেভেলিং স্টাফটা খাড়া রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে নিকোলাস।
ঠিক আছে, হাঁক ছাড়লো ড্যানিয়েল, বিশটা শট নেয়ার পর। এবার তুমি নদীর ওপারে চলে যাও।
কী বলে! কীভাবে যাব? সাঁতরে, নাকি উড়ে?
উজানের দিকে তিন মাইল হাঁটতে হলো নিকোলাসকে, ট্রেইরটা যেখানে অগভীর ডানডেরা নদীর উপর দিয়ে ওপারে পৌঁছেছে। ওপারে পৌঁছে কাঁটাঝোঁপের ভেতর দিয়ে উল্টোদিকে হাঁটতে হলো ওকে, থামলো অপর পাড়ে বসে যেখানে ড্যানিয়েল সিগারেট ফুকছে। ফুসফুসে ক্যান্সার বাধিয়ো না, কেমন? পানির এদিক থেকে চিৎকার করে বলল নিকোলাস।
প্রয়োজনীয় শট নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ফেরার জন্য আবার নদীর অগভীর অংশটুকু পার হতে হলো নিকোলাসকে। শেষ এক মাইল প্রায় গাঢ় অন্ধকারে হাঁটতে হলো ওকে, তবে পথ দেখালো ক্যাম্পসাইটের কাঁপা কাঁপা অস্পষ্ট আলো। ক্যাম্পে পৌঁছে লেভেলিং স্টাফটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।
এতো খাটালে, ফলটা ফেলে দিল?
স্লাইড রুল থেকে চোখ তুললাম না ড্যানিয়েল। লণ্ঠনের আলোয় ড্রইংগুলো স্টাডি করছে সে, কিছু রদবদলও করছে। তোমার আনুমানিক হিসাব প্রায় নির্ভুলই বলতে হবে, এক সময় মুখ তুলে বলল সে। জলপ্রপাতের উপর ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে নদীটা একচল্লিশ গজ চওড়া, যেখানে আমি স্ট্রাকচারটা খাড়া করতে চাই।
আমি শুধু জানতে চাই ওখানে একটা বাঁধ তৈরি করা সম্ভব কিনা।
নাকের পাশে আঙুল ঘষলো ড্যানিয়েল, হাসছে। তুমি আমাকে আমার লাল ফ্রন্ট-এন্ডার এনে দাও, আমি নীলনদকেও বাঁধতে পারব।
*
রাত একটু বেশি হতে আগুনের ধারে বসে সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া সারলো। ক্যাম্পফায়ারের দিক থেকে নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে আছে রোয়েন, চোখাচোখি হতে ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকিয়ে আমন্ত্রণ জানালো। কয়েক সেকেন্ড পর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে ক্যাম্প এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, একবার পেছন ফিরে দেখে নিল নিকোলাস ওকে অনুসরণ করছে কিনা। পাশে চলে এসে টর্চ জালল নিকোলাস, দু জন ফিরে এলো আবার ড্যাম সাইটে, বসলো একটা বোন্ডারের উপর।
টর্চ নিভিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকলো ওরা, চোখে অন্ধকার সয়ে আসতে তারার আলোয় এখন অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। নিস্তব্ধতা ভাঙলো রোয়েন, খুব নিচু গলায় কথা বলছে, গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে, জানেন। ভেবেছিলাম আর বোধহয় কোনোদিন এখানে আমাদের ফিরে আসা হবে না।
মেক আর প্রধান পুরোহিত সাহায্য না করলে ব্যাপারটা সম্ভব হত না।
মেক আর আপনিই জিতলেন, ক্ষীণ হাসির শব্দ রোয়েনের গলায়। হ্যাঁ, সন্ন্যাসীদের সাহায্য আমাদের দরকার। স্বীকার করছি, মেকের সঙ্গে তর্কে পারা সম্ভব নয়।
