সামান্য ব্যবধানে বসে আছে ওরা পাঁচজন। থিয়ডালাইট নিয়ে মেকের সঙ্গে ড্যানিয়েলের এ কষাকষি এখনো থামেনি। ড্যানিয়েল বেশি কথা না বলে নির্লিপ্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারী ইট্রুমেন্টার কাছাকাছি বসে আছে সে। মেক আর টিসে একদমই চুপচাপ। তবে হঠাৎ টিসে হাত লম্বা করে মেকের বাহু স্পর্শ করলো। ওদেরকে আমি জানাতে চাই, বলল সে।
উত্তর দেয়ার আগে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলো মেক, তারপর মাথা আঁকালো। অসুবিধে কি, বলল সে, কাঁধ ঝাঁকালো।
আমি চাই ওরা জানুক, আবার বলল টিসে। বোরিসকে ওরা চিনতেন। কাজেই বুঝবেন।
তুমি চাও আমি বলি? নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো মেক, টিসের একটা হাত ধরল।
হ্যাঁ। মাথা ঝাঁকালো টিসে। তুমি বললেই ভালো হয়।
কিছুক্ষণ কথা বলল না মেক, নিজের চিন্তা-ভাবনা গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর যখন শুরু করলো, নিকোলাস রোয়েনের দিকে তাকালো না, তাকিয়ে থাকলো টিসের দিকে। এই মেয়েটার উপর প্রথম যখন আমার চোখ পড়লো, উপলব্ধি করলাম ওর আর আমার নিয়তি এক সুতোয় বাঁধা।
মেকের আরো গা ঘেঁষে বসলো টিসে।
টিসে আর আমি তিমকাত উৎসবের রাতে শপথ নিই এবং ঈশ্বরের ক্ষমা প্রার্থনা করি, তারপর আমি ওকে আমার মেয়েমানুষ হিসেবে গ্রহণ করি।
মেকের পেশীবহুল কাঁধে হাত রাখলো টিসে।
রাশিয়ান লোকটা আমাদের পিছু নিল। সে এখানটায় আমাদেরকে ধরে ফেলে, ঠিক এখন যেখানে বসে আছি। আমি তাকে আলোচনায় বসে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে বললাম। কিন্তু সে রাজি হলো না। তখন আমি বললাম, টিসে যদি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে যেতে রাজি হয়, আমি বাধা দিব না। সে বলল, টিসেকে চায় না, চায় ওর লাশ। তারপরই গুলি করলো সে, প্রথমে আমাকে লক্ষ্য করে, তারপর টিসেকে। কিন্তু সে জানত না, আড়াল থেকে তার উপর আমার লোকজন নজর রাখছিল।
ঘটনাটা স্মরণ করে শিউরে উঠলো টিসে।
বোরিস নিজের বোকামিতে মারা গেছে। তার লাশটা আমরা নদীতে ভাসিয়ে দিই।
বোরিস যে মারা গেছে আমরা তা জানি, এ প্রথম কথা বলল রোয়েন। তারপর প্রসঙ্গটা বদলাবার জন্য জিজ্ঞেস করলো, মঠে পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগবে আমাদের?
এখুনি রওনা হলে সন্ধ্যের আগেই পৌঁছে যাব, বলল মেক।
*
মাই মেতাম্মা, সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের নব নির্বাচিত প্রধান পুরোহিত, মঠের চাতালে ওদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁর মাথায় রুপালি চুল, জালি হোরার চেয়ে বয়েস কিছু কম হবে, একহারা ও লম্বা। আজ তিনি বিশিষ্ট অতিথি অ্যাল্যান মেকের সম্মানে নীল মুকুটটা পরেছেন।
অতিথিদের জন্য আলাদা সেল বরাদ্দ করা হয়েছে, গোসলের পর সেখানে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিল ওরা। তারপর সন্ন্যাসীরা এসে নিয়ে গেলেন ওদেরকে। খানাপিনার বিরাট আয়োজন করা হয়েছে। তেজ-এর পাত্র তৃতীয়বার ভরার পর প্রধান পুরোহিত আর সন্ন্যাসীদের মন-মেজাজ হালকা ও নরম হয়ে উঠলো, লক্ষ্য করে মাই মেতাম্মার কানে ফিসফিস করলো মেক।
সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের ইতিহাস নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে-ঝড়-বিক্ষুব্ধ সাগর থেকে কীভাবে ঈশ্বর তাঁকে আমাদের তীরে তুলে দিলেন, তিনি যাতে আমাদের সত্যিকার ঈমানদার হতে সাহায্য করতে পারেন?
প্রধান পুরোহিতের চোখ পানিতে ভরে উঠলো। তার পবিত্র শরীর, এখানে সমাধিস্থ করা হয়, আমাদের মাকডাসে। বর্বররা এলো, আমাদের ধর্মীয় ঐশ্বর্য লুঠ করে নিয়ে গেল। আমরা পিতৃহীন বালকে পরিণত হয়েছি। এখন আর পূণ্য অর্জনের জন্য ইথিওপিয়ার প্রতিটি প্রান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা এখানে আসবে না। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। এ মঠ ধ্বংস হয়ে যাবে। সন্ন্যাসীরা চলে যাবে ঝরে পড়া পাতার মতো।
সেইন্ট ফুমেনটিয়াস যখন ইথিওপিয়ায় আসেন, একা আসেন নি। বাইজানটিয়াম চার্চ থেকে তার সঙ্গে আরো একজন খ্রিস্টান এসেছিলেন, নরম সুরে তাকে মনে করিয়ে দিল মেক।
সেইন্ট অ্যান্টোনিয়া, তেজ পাত্র থেকে আরো এক ঢোক পান করলেন প্রধান। পুরোহিত।
সেইন্ট অ্যান্টোনিয়া, সায় দিল মেক। সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের আগেই তিনি মারা যান। তবে তিনি তার ভাইয়ের চেয়ে কম পবিত্র ছিলেন না।
অবশ্যই তিনি অতি পবিত্র এবং মহান সেইন্ট ছিলেন, আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা তার প্রাপ্য, বলে আরো এক ঢোক তেজ পান করলেন মাই মেতাম্মা।
ঈশ্বরের চাল বড়ই রহস্যময়, নয় কি? সবিস্ময়ে মাথা নাড়লো মেক।
তার পথ অত্যন্ত গভীর, আমাদের বুঝতে চাওয়ার বা প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার নেই।
তবে তিনি করুণাময় এবং বিশ্বাসীদের পুরস্কৃত করেন। তিনি পরম করুণাময়, ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন প্রধান পুরোহিত।
আপনারা, আপনাদের মঠ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বলল মেক। সেইন্ট ফুমেনটিয়াসকে লুঠ করে নিয়ে গেছে ওরা-হায়, তা আর কোনোদিন উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু ঈশ্বর যদি আরেকজনকে পাঠান, তাহলে কেমন হয়? তিনি যদি আপনাদেরকে সেইন্ট অ্যান্টোনিয়ার শরীর পাঠিয়ে দেন, তখন আপনারা কী করবেন?–ভেজা চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো, মনে হলো প্রধান পুরোহিত একটা হিসাব মেলাবার চেষ্টা করছেন। সেটা হবে সত্যিকার একটা মিরাকল।
বৃদ্ধ প্রধান পুরোহিতের কাঁধে একটা হাত রেখে নরম সুরে ফিসফিস করলো মেক, কান্না থামিয়ে গভীর মনোযোগর সঙ্গে তার কথা শুনছেন মাই মেতাম্মা।
*
শ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়েছে, পরদিন সকালে উপত্যকার ঢাল বেয়ে ওঠার সময় নিকোলাসকে বলল মেক। মাই মেতাম্মা কথা দিয়েছেন দুদিনের মধ্যে একশো লোক যোগাড় করে দেবেন। আরো পাঁচশো দেবেন আগামী সপ্তাহ। দূর দূরান্তের খ্রিস্টান গ্রামগুলোর খবর পাঠিয়ে দিয়েছেন উনি, বাঁধ তৈরির কাজে সাহায্য করলে নরকের আজাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, কারণ এ বাঁধ তৈরির মাধ্যমে উদ্ধার হবে সেইন্ট অ্যান্টোনিয়ার পবিত্র দেহাবশেষ।
