সামনে বর্ডার, রোয়েনের মুখের কাছাকাছি নিঃশ্বাস ফেললো নিকোলাস। উত্তেজনাটা সংক্রামক। ক্লান্তিক কথা ভুলে গেল রোয়েন। পালস রেট বেড়ে গেছে।
এক ঘণ্টা পার হলো। তবু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামলো না ওরা। আরো এক ঘণ্টা পর সামনে থেকে কারো হাসির অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে এলো। অল ক্লিয়ার, রোয়েনকে বলল নিকোলাস। ইথিওপিয়ায় ঢুকে পড়েছি আমরা। আপনার খবর কি, রোয়েন?
ভালো আছি।
ক্লান্ত আমিও। চাঁদের আলোয় হাসলো নিকোলাস। খানিক পরই ক্যাম্প ফেলা হবে।
সন্দেহ হলো মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে নিকোলাস। পথ যেনো ফুরোবার নয়, কাজেই হাঁটারও কোনো বিরাম নেই। এক সময় কান্না পেল রোয়েনের। তারপর হঠাৎ নদীর আওয়াজ ভেসে এলো কানে। ইতোমধ্যে ভোর হয়ে এসেছে। সামনে যারা অপেক্ষা করছিল, তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেল মেককে। হাত ধরে পথ থেকে রোয়েনকে সরিয়ে আনলো নিকোলাস, এক জায়গায় বসিয়ে নিজের হাতে খুলে দিল পায়ের বুট।
সত্যি আপনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে নিয়ে গর্ব করা চলে, রোয়েনের মোজা খোলার সময় বলল নিকোলাস, পায়ের ফোস্কাগুলো পরীক্ষা করলো। হাঁটুর ব্যান্ডেজটাও খুললো। সামান্য ফুলে আছে। নরম ছোঁয়ায় ডলে দিল নিকোলাস। পেইনকিলার দিচ্ছি, আরাম পাবেন। ব্যাগ থেকে ট্যাবলেট বের করলো ও। তারপর প্যাড লাগানো নিজের জ্যাকেটটা মাটিতে বিছালো। দুঃখিত, স্লিপিং ব্যাগ পেছনে ফেলে আসা হয়েছে। এয়ার ড্রপের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ট্যাবলেট আর পানির বোতলটা রোয়েনের হাতে ধরিয়ে দিল। সবশেষে ইমার্জেন্সী রেশনের প্যাকটা খুললো।
মুখে খানিকটা শুকনো মাংস নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন। হাতে গরম এক মগ চা নিয়ে নিকোলাস যখন ওর ঘুম ভাঙালো, তখন বিকেল যাই যাই করছে। ওঁর পাশে বসে নিকোলাসও চুমুক দিচ্ছে নিজের মগে। শুনে খুশি হবেন, মেক এখন সব কথাই জানে। আমাদেরকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে সে।
কতটুকু কী বললেন?
আগ্রহী করে তোলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন। ঠোঁট টিপে হাসলো নিকোলাস। সব কথা একসঙ্গে বলা ঠিক না, প্রতিবার একটু একটু করে বলতে হয়। আমরা কি খুঁচছি, জানে। আরো জানে নদীতে একটা বাঁধ দিতে যাচ্ছি।
বাধ তৈরির জন্য লোকবল দরকার, তার কী ব্যবস্থা?
সেন্ট ফুমেনটিয়াসের সন্ন্যাসীরা তার কথা শুনবেন। ওঁরা তাকে বীরপুরুষ বা হিরো বলে মনে করেন।
বিনিময়ে নিশ্চয়ই কিছু দেয়ার কথা বলেছেন। কি?
এ বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয় নি। আমি বলেছি, কি পাব জানা নেই। হেসে উঠে বলল, আমাকে ও বিশ্বাস করে।
উনি খুব চালাক, তাই না?
চালাক শব্দটা যদি নিন্দার অর্থে ব্যবহার করেন, আমি একমত হব না, বিড়বিড় করলো নিকোলাস। আমি জানি সময় হলে স্পষ্ট করেই বলবে সাহায্যের বিনিময়ে কী সে চায়। হঠাৎ মুখ তুলে তাকালো ও। তোমার কথাই হচ্ছিল, মেক।
এগিয়ে এসে নিকোলাসের পাশে উবু হয়ে বসলো মেক। আমাকে নিয়ে কি ষড়যন্ত্র করছিলে তোমরা?
রোয়েন বলছেন, তোমার মধ্যে দয়া-মায়া বলে কিছু নেই, সারারাত তাকে হটিয়েছ।
নিকোলাস আসলে আপনাকে পঙ্গু বানাচ্ছে। দেখলাম তো, আপনাকে নিয়ে কী রকম ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমার কথা হলো, ওদের সঙ্গে কঠিন ব্যবহার করতে হবে। মেয়েরা সেটা উপভোগ করে। তারপরই সিরিয়াস হয়ে উঠলো মেক। সত্যি দুঃখিত, রোয়েন। সীমান্ত মানেই হাজার রকম বিপদ। হোম গ্রাউন্ডে চলে এসেছি, এখন আর আমাকে আপনার অতোটা দানব বলে মনে হবে না।
রোয়েন বলল, ধ্যাত, আমরা তো আসলে আপনার প্রশংসা করছিলাম। সত্যি কৃতজ্ঞ বোধ করছি, মেক।
নিকোলাস আমার পুরানো বন্ধু না!
প্রসঙ্গ বদলে রোয়েন বলল, মঠে কি ঘটেছে টিসের কাছে খানিকটা শুনলাম। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
রাগে দু হাত দিয়ে ধরে নিজের দাড়ি টানছে মেক। ওখানে যা ঘটেছে তার জন্য নগু আর তার টুপাররা দায়ি। ওরা পশুও অধম। এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় আমরা কাদের বিরুদ্ধে লড়ছি। মেনজিসটুর নির্যাতন থেকে মুক্তি পেলাম, তার জায়গায় নতুন একটা আতংখ ছড়িয়ে পড়লো।
ওখানে ঠিক কি ঘটেছে মেক?
ধীরে ধীরে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিল মেক, বলল কী কী লুঠ হয়েছে। ঘুমা যে দায়ী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সন্ন্যাসী যারা পালাতে পেরেছেন তারা সবাই তাকে চেনেন।
রাগে দাঁড়িয়ে পড়লো মেক। থরথর করে কাঁপছে সে। যে কোনো গোজামবাসীর কাছে ওই মঠ প্রাণের চেয়েও প্রিয়। আমি নিজে ধর্মকর্ম করি না, কিন্তু যারা করেন তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আছে। জালি হোরাকে আমি গুরুজন বলে মানতাম। প্রধান পুরোহিতকে খুন করে আমাকে খেপিয়ে তুলেছে ওরা। এর ফল ওদেরকে ভোগ করতে হবে। মাথায় ক্যাপ পরল সে। চলুন এবার রওনা হতে হয়। সামনের পথ অত্যন্ত দুর্গম।
*
সীমান্তে অনেকটা পেছনে ফেলে আসায় এখন দিনের বেলাও হাঁটা নিরাপদ। দ্বিতীয় দিনের পদযাত্রা ওদেরকে গিরিখাদের গভীরে পৌঁছে দিল। বড় পাহাড়ের সামনে যে ছোট পাহাড় থাকে, এখানে তেমন কিছু নেই–এ যেনো অকস্মাৎ মাথাচাড়া দেওয়া একটা বিশাল দুর্গে ঢুকে পড়া। দু দিকে পাহাড়ের স্তূপ বা গুচ্ছের পাঁচিল প্রায় চার হাজার ফুট ওপরের আকাশ ছুঁয়েছে, মাঝখানের গভীরতায় সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে নদীটা, দৈর্ঘ্যের যত দূর দেখা যায় আলোচন আর উচ্ছ্বাস, দ্রুতগতি স্রোত আর ঘূর্ণি সমস্ত পানিকে সাদা করে রেখেছে। দুপুরে নদীর ধারে ঝোঁপ আর গাছপালার নিচে বিশ্রাম নেয়ার জন্য থামার। অনুমতি দিল মেক। ওদের নিচে সৈকত, প্রকাণ্ড সব বোল্ডারের ছাড়াছড়ি। ওগুলো নিশ্চয়ই পাহাড়-প্রাচীরের গা বেয়ে গড়িয়ে নেমেছে।
