কাউকেই তো দেখছি না, বললেন জেনি। আমাকে এখন কি করতে বলেন?
আরেকটা ফ্লেয়ার থাকার কথা… ওই তো! রানওয়ের শেষ প্রান্ত থেকে আকাশে উঠলো আরেকটা ফ্লেয়ার। হাসছে নিকোলাস। কাঁটাঝোঁপের আশপাশে এ প্রথম মানুষের নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে গা ঢাকা দিয়েছিল ওরা।
মেক, সন্দেহ নাই। আপনি ল্যান্ড করতে পারেন।
*
ওদের সামনে রানওয়েতে এখন ক্যামোফ্লেজ ফেটিগ পরা সচল মূর্তি দেখা যাচ্ছে।
প্লেন থামার পর লোডিং র্যাম্প নিচু করা হলো, সেটা বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে এলো মেক। নিকোলাস! আলিঙ্গন করলো নিকোলাসকে, সশব্দে চুমো খেলো দু গালে, আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে আছে চেহারা। আমার কথাই ঠিক! শুধুই ডিক ডিক শিকার নয়, অন্য কোনো রহস্য আছে! কি?
পুরানো বন্ধুকে মিথ্যে বলি কীভাবে! কাঁধ ঝাঁকালো নিকোলাস।
তাহলে কি ধরে নিতে পারি দু জন মিলে খুব মজা করা যাবে? জীবন এখানে বড়ই একঘেয়ে।
কথা দিচ্ছি।
একহারা দেহ সৌষ্ঠব, একটা নারীমূর্তি উঠে এলো র্যাম্প বেয়ে। মেয়েটার পরনে জলপাইস সবুজ ফেটিগ। কথা না বলা পর্যন্ত টিসেকে নিকোলাস চিনতেই পারলো না। ক্যানভাস প্যারা বুট আর কাপড়ের তৈরি ক্যাপ পরে আছে, দেখে মনে হবে একটা ছেলে।
নিকোলাস! রোয়েন! ওয়েলকাম চিৎকার জুড়ে দিল টিসে, হাঁপাচ্ছে। রোয়েন আর টিসে জোড়া লেগে গেল।
আরে, এরা তো দেখছি খোশগল্পে মগ্ন হয়ে পড়লো! জেনি হাসছে। আমাকে আজ রাতেই মাল্টা ফিরতে হবে। সন্ধের আগেই টেক-অফ করতে চাই।
মেকের নেতৃত্বে দ্রুত মাল খালাস করার কাজ শুরু হলো। তার লোকজন প্লেনে ঢুকে রোলারে চড়ালো ভারী বাক্সগুলো। ড্যানিয়েল অবশ্য নিজের ফ্রন্ট-এন্ড লোডার স্টার্ট দিল, বাছাই করা কিছু কার্গো নামিয়ে এনে জড়ো করলো কাঁটাঝোঁপের আড়ালে। সূর্য পাটে বসেছে, এ সময় খালি হয়ে গেল প্লেন।
ককপিটে বসে শেষ একবার আলোচনা করলো নিকোলাস ও জেনি।
আজ থেকে চারদিন পর, একমত হলেন জেনি, হ্যান্ডশেক করলেন নিকোলাসের সঙ্গে।
ভদ্রলোকেকে যেতে দাও, নিকোলাস, নিচে থেকে হাঁক ছাড়লো মেক। ভোরের আগে সীমান্ত পার হতে হবে আমাদের।
প্লেন ফিরে যাবার পর টিসেকে নিয়ে একটা ঝোঁপের সামনে বসলো রোয়েন। আবার দেখা হওয়ায় দু জনেই খুব খুশি।
তোমাদের মালপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য পুরো একটা কমব্যাট প্লাটুন রেখে যাচ্ছি এখানে, নিকোলাসকে বলল মেক। সীমান্ত পর্যন্ত খুব ছোট একটা দল যাব আমরা। আপাতত এদিকে শত্রুপক্ষের তৎপরতা খুবই কম, কাজেই কোনো বিপদ হবারই কথা।
ইথিওপিয়ান বর্ডার কত দূরে? জানতে চাইলো নিকোলাস।
পাঁচ ঘণ্টা হাঁটতে হবে, বলল মেক। চাঁদ ওঠার আগেই সীমান্ত পার হতে চাই। আমার দলের বাকি লোকজন অ্যাবে গিরিখাদের মুখে অপেক্ষা করছে। কাল ভোরে ওদের সঙ্গে মিলিত হব।
প্লাটুন কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলার জন্য একপাশে সরে গেল মেক, রোজিরেসে রেখে যাওয়া অবশিষ্ট কার্গো তার অধীনেই পাহারা বেদে গেরিলানা। তারপর ছজন লোককে ডাকলো সে, বর্ডার পার হবার সময় এসকর্ট হিসেবে থাকবে ওরা।
হঠাৎ গলা চড়িয়ে নিকোলাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো মেক। ওটা উনি কোনো, বুদ্ধিতে প্লেনে করে এনেছেন, নিকোলাস? থিয়ডালাইট-এর মোটাতাজা পায়াগুলোর দিকে বিরূপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। বিশাল এক বাক্স খুলে প্লেন থেকে ওটা বের করে এনেছে ড্যানি স্যাপার।
ড্যানিয়েল আরবি জানে না, কাজেই অনুবাদকের ভূমিকা নিতে হলো নিকোলাসকে। ড্যানিয়েল বলছে ওটার ডেলিকেট ইট্রুমেন্ট। প্লেন থেকে ড্রপ করার ঝুঁকি নিতে রাজি হয় নি। বলছে, এটার কোনো ক্ষতি হলেও যে কাজের জন্য তাকে আনা হয়েছে সে-কাজ করতে পারবে না।
কে ওটা বহন করবে? জিজ্ঞেস করলো মেক। আমার লোকদের বললে বিদ্রোহ করবে তারা।
বুনো ভাঁড়টাকে বলো আমি নিজে এটা বহন করবো, বলল ড্যানিয়েল। তার বাঁদরগুলো এটা ছুঁলে তাদের হাত আমি ভেঙে দিব। বোঝাটা হ্যাঁচকা টানে নিজের কাঁধে তুলে নিল সে।
হারকিউলিস ফিরে যাবার আধঘণ্টা পর অন্ধকার ও নিস্তব্ধ প্রান্তর ধরে রওনা হলো ওরা, অ্যাডভান্স পাগৰ্ড পাঁচ মিনিট আগে রওনা হয়েছে। পুব দিকে যাচ্ছে ওরা। লম্বা পা পেলে দ্রুত হাটছে মেক। রোয়েন ভাবলো, নিকোলাস আর মেকের চোখ শিকারি বিড়ালের মতো সতর্ক, ওদের দুজনের ঠিক পেছনেই রয়েছে ও। অন্ধকারে কীভাবে দেখতে পাচ্ছে কে জানে, মাঝে মধ্যেই ফিসফিস করে সাবধান করে দিচ্ছে ওকে কখনো মেক, কখনো নিকোলাস-সাবধান করায় গর্ত বা পাথরের স্তূপগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারছে রোয়েন। তারপরও যখন হোঁচট খেল, সব সময় মনে হলো ওর পাশেই আছে নিকোলাস, শক্ত হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো প্রতিবার।
নিস্তব্ধতার ভেতর শৃংখলা বজায় রেখে এগুচ্ছে দলটা। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিট করে বিশ্রাম। বিশ্রামের সময় একসঙ্গে বসছে নিকোলাস আর মেক, ওদের দু একটা কথা রোয়েনের কানে ভেসে আসছে। অ্যাবে গিরিখাদে ওদের ফিরে আসার কারণটা মেককে ব্যাখ্যা করে নিকোলাস। মামোস আর টাইটা শব্দ দুটো কয়েকবার উচ্চারণ করলো নিকোলাস। মেকের ভরাট কণ্ঠস্বর থেকে প্রশ্নবোধক আওয়াজ বের হচ্ছে। বিশ্রাম শেষে আবার শুরু হলো যাত্রা।
এক পর্যায়ে সময়ের আর কোনো হিসাব থাকলো না রোয়েনের। শরীর ও এ দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপ পরিশ্রম সাপেক্ষ ও কষ্টকর মনে হলো। ক্ষতটা প্রায় সেরে গেলেও, আবার ব্যথা শুরু হলো হাঁটুতে। মাঝে মধ্যে অনুভব করলো নিকোলাস ওর বাহু ধরেছে, খানা-খন্দটুকু পার করে দিচ্ছে। আবার কখনো বা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো গোটা দল, সামনে থেকে নিচু গলার সতর্ক সংকেত ভেসে এসেছে। অন্ধকারে চুপচাপ অপেক্ষা। সবাই উত্তেজিত ও নার্ভাস। তারপর আরো একটা সংকেত এলো। আবার শুরু হলো কষ্টকর পদযাত্রা। একবার নদীর গন্ধ পেল রোয়েন, ভাবল নীলনদের কাছাকাছি কোথাও রয়েছে ওরা। কেউ কোনো কথা বলে নি, তবু পুরুষদের আড়ষ্ট ভাব লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো সামনে কিছু একটা আছে। গেরিলারা কাঁধ থেকে অস্ত্র নামিয়ে বাগিয়ে ধরলো।
