জেনি বললেন, নো প্রবলেম।
টাইটা, আসছি আমরা! রোয়েনের ফিসফিসানি একা শুধু নিকোলাস শুনতে পেল।
এমন চোরের মতো ঢোকায় একটা সুবিধা হবে–পেগাসাসের টের পেতে সময় লাগবে, নিকোলাস মন্তব্য করলো।
আপনার কথা যেনো সত্যি হয়, হাতের আঙুলগুলো এক করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল রোয়েন। পেগাসাস ধারে কাছে না থাকলে টাইটার ধাঁধা নিয়ে পূর্ণমনোনিবেশ করা সম্ভব হবে।
*
ওরা আবার ইথিওপিয়ায় ফিরে যাচ্ছে, গম্ভীর সুরে বললেন হের ফন শিলার। আচ্ছা! আপনি ঠিক জানেন, হের ফন শিলার?
নাহুতের দিকে কটমট করে তাকালেন ফন শিলার। এ মিশরীয় আর্কিওলজি এক্সপার্ট তাঁর বিরক্তি উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছেন। ভদ্রলোককে চাকরি দেওয়ায় নিজের উপর এখন তিনি অসন্তুষ্ট। নিজের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লম্বা-চওড়া বক্তৃতা ঝাড়লেও, মঠ থেকে উদ্ধার করে আনা ফলকটার খোদাই অনুবাদ করতে মোটেও সফল হননি নাহুত। কেন দেরি হচ্ছে জিজ্ঞেস করায় একের পর এক খোঁড়া অজুহাত খাড়া করছেন। আপনি কি ভাবেন, প্রতিপক্ষ কি করছে না করছে আমি তার খবর রাখব না? জেনারেল ওবেঈদ ওদের উপর নজর রাখছেন, তাঁর কাছ থেকে সব খবর পাচ্ছি আমি। ইংল্যান্ড থেকে ডক্টর রোয়েন মিশরে গিয়েছিলেন…
সেক্ষেত্রে, হের ফন শিলার, তার ব্যবস্থা করেন নি কেন?
আপনি গাধা নাকি? রেগে গেলেন ফন শিলার। ব্যবস্থা করি নি, কারণ আমার ধারণা আপনি নন, ডক্টর রোয়েনই আমাকে ফারাও-এর সমাধিতে নিয়ে যাবে।
কিন্তু স্যার, আমি তো…
এখন পর্যন্ত কিছুই আপনি করেন নি, নাহুত। ফলকটা এখনো দুর্বোধ্য…
কাজটা খুব কঠিন, হের ফন শিলার।
কঠিন বলেই তো মোটা টাকা বেতন দিয়ে আনা হয়েছে আপনাকে। ওই ফলকে সত্যি যদি মামোসের সমাধিতে পৌঁছানোর সূত্র থাকে, তাহলে লেখক টাইটা সেটাকে জটিল করেই তো রাখবে।
আমাকে যদি আরো খানিক সময় দেওয়া হয়…
কি বলছি শুনতে পাচ্ছেন না? হারপার নিকোলাস অ্যাবে গিরিখাদে ফিরে যাচ্ছেন। মাল্টা থেকে একটা চার্টার করা প্লেন নিয়ে রওনা হয়ে গেছেন তাঁরা, সঙ্গে সমস্ত ইকুইপমেন্ট আছে, ট্র্যাক্টের সহ। আমার কাছে এর অর্থ হলো, তারা সমাধিটা খুঁজে পেয়েছেন, ফিরে যাচ্ছেন মাটি খুঁড়ে বের করতে।
ওরা মঠে পৌঁছাক না, খতম করা কোনো ব্যাপার না, বললেন নাহুত, যেনো নিজেই আশ্বস্ত হতে চাইছেন। কর্নেল নগুকে বললেই তিনি ব্যবস্থা করবেন।
আপনি একটা উজবুক। গর্জে উঠলেন ফন শিলার। যারা আমাকে মামোসের সমাধি পাইয়ে দেবেন, আমি তাদেরকে মেরে ফেলবো? নাহুতের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। আপনাকে আমি ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠাচ্ছি। ওখানে কোনো কাজে এলেও আসতে পারেন।
নাহুত চুপ করে থাকলেন।
বেস ক্যাম্পে গিয়ে হেলমের অধীনে কাজ করবেন আপনি, বললেন ফন শিলার। সে আপনাকে অর্ডার করবে, আপনি তার অর্ডার মতো কাজ করবেন। হারপার নিকোলাস আল রোয়েনের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিতে যাবে না।
ওখানে তাহলে আমার কাজটা কি হবে?
অ্যাকশন নেবেন না, তবে ওদের উপর নজর রাখবেন। কিন্তু সাবধান, নজর রাখতে গিয়ে ওদেরকে আবার সতর্ক করে দেবেন না যেন। কর্নেল নগুর একজন স্পাই আছে, ওদের গতিবিধি সম্পর্কে সে কর্নেলকে রিপোর্ট করবে, আপনি কর্নেলের কাছ থেকে সে সব জেনে নিয়ে বিশ্লেষণ করবেন, বুঝতে চেষ্টা করবেন হারপার নিকোলাস ঠিক কী অর্জন করতে চাইছেন।
আর আপনি? ইথিওপিয়ায় আসছেন না?
এতো প্রশ্ন করেন কেন? সময় হলেই ঠিকই আমি ওখানে পৌঁছে যাব।
ফলকটার কি হবে?
আপনি ওটার ফটো তুলে নিয়ে যান। স্যাটেলাইটে রিপোর্ট পাঠাবেন।
আমাকে কখন আপনি পাঠাতে চান?
যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। সম্ভব হলে এক্ষুনি। আমার সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলুন, যান।
সেইদিনে প্রথমবারের মতো সুখী দেখালো নাহুতকে।
*
পনেরো ঘণ্টার ফ্লাইট শেষ হয়ে এলো। পূর্ব দিগন্তে ইথিওপিয়ান পাহাড়-শ্রেণীর নীলচে আভাস ফুটে উঠলো গাঢ় নীল আফ্রিকান আকাশের গায়ে, হাত তুলে নিকোলাস না দেখানো পর্যন্ত রোয়েনের চোখে ধরা পড়লো না। প্রায় পৌঁছে গেছি, বলল ও। চলুন, ফ্লাইট ডেকে যাই।
উইন্ডশীল্ডের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে সামনে কোথাও ল্যান্ডমার্ক দেখলো না ওরা, যতদূর দৃষ্টি যায় ধু-ধু বৃক্ষহীন প্রান্তরই শুধু চোখে পড়ে।
আমার হিসেবে দশ মিনিটে পৌঁছে যাব আমরা, বললেন জেনি। কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছেন? উত্তরে কেউ কিছু বলল না।
পাঁচ মিনিট।
ওদিকে! জেনি বাদেনহোর্সটের কাঁধের উপর দিয়ে হাত লম্বা করে দেখালো নিকোলাস। ওটাই নীলনদের কোর্স। বহু দূর সামনে ঘন কাঁটাঝোঁপ গাঢ় একটা রেখা তৈরি করেছে। সুগার মিলের চিমনিটাও দেখা যাচ্ছে। মেক বলেছে মিল থেকে তিন মাইল দূরে এয়ারস্ট্রিপটা।
কিন্তু চার্টে নেই, বললেন জেনি। কোঅর্ডিনেটস-এর পৌঁছতে আর এক মিনিট। স্টপওয়াচে ধীরে ধীরে পার হলো সময়টা।
এখনো কিছু দেখছি না, কো-পাইলটের সিট থেকে বলল ফ্রেড। তার কথা শেষ হওয়া মাত্র হারকিউলিসের নাকের সামনে দিয়ে একটা ফ্লেয়ার উঠে গেল আকাশের আরো ওপরে। ককপিটে উপস্থিত সবাই স্বস্তির হাসি হাসলো।
জেনি বাদেনহোর্সটের পিঠ চাপড়ে দিল নিকোলাস। ধন্যবাদ।
কয়েকশো ফুট ওপরে উঠলো প্লেন, ওয়ান-এইটি টার্ন নিয়ে ফিরে আসছে। প্রান্তরে এখন দুটো সিগন্যাল ফ্লেয়ার জ্বলছে-একটা কালো ধোয়া ছাড়ছে, অপরটা সাদা। মাইলখানেক দূরে থাকতে ঝোপে ঢাকা ও পরিত্যক্ত ল্যান্ডিং স্ট্রিপের অস্পষ্ট রেখা ধরা পড়লো চোখে। বিশ বছর আগে রোজিরেস এয়ারস্ট্রিপ তৈরি করেছিল একটা বেসরকারি কোম্পানি। নীলনদ থেকে পানি নিয়ে আখ চাষ করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু বরাবরের মতো আফ্রিকান খরা জিতে যায়, পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নেয় কোম্পানি। সেই থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এয়ারস্ট্রিপটা। মেক নিমুর রদেভো হিসেবে এ জায়গাটা বেছে নিয়েছে।
