অনেকক্ষণ ডুরেঈদের পাশে বসে রইলো ও। কত উপভোগ্য সময়ই পার করেছে সে, এ জ্ঞানতাপসের সঙ্গে। তার নরম মনোভাব, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা সবকিছু ভিড় করে আসছে রোয়েনের মনে। রোয়েন জানে, ডুরেঈদের মতো করে তাঁকে সে কখনোই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারে নি, কিন্তু এতে ডুরেঈদের মনে কোনো ক্ষোভ ছিল না।
ও নিশ্চই বুঝেছে–কেননা আমি আজ এখানে এসেছি–রোয়েন ভাবে। বিদায় বলতে এসেছে রোয়েন। ওর জন্য তার শোক আর ভালোবাসা থাকবে, তবু তাকে এগিয়ে যেতে হবে। জীবন থেমে থাকে না। ডুরেঈদ, আমাকে বিদায় বলো! বহুক্ষণ পর, দৃঢ়পায়ে সমাধি ছেড়ে বেরিয়ে আসে রোয়েন, একবারো পেছনে ফিরে তাকিয়ে।
ঘুরপথে গিয়ে আগুনে পোড়া ভিলার রাস্তা এড়িয়ে গেল ও। কায়রোতে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। উদ্বিগ্ন মুখে ওর অপেক্ষায় বসে ডুরেঈদের পরিবার। রাতে ভালো খাবারের আয়োজন আছে আজ রোয়েনের সম্মানে।
*
মূলত, মন্ত্রী আতালান আবু সিন-এর সঙ্গে দেখা করতেই কায়রো এসেছে রোয়েন, কিন্তু তিনি অফিসের কাজে প্যারিসে আছেন। তিন দিন ধরে অপেক্ষা করতে হলো তাকে। রোয়েন জানে, নাহুত গাদ্দাবি কায়রোতে নেই, তাই ওর মনে তেমন কোনো ভীতিরও উদয় হলো না। মনের সুখে প্রচুর সময়ে মিউজিয়ামে কাটালো ও। অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে এখানে, তাদের সাথে আলাপ গল্পে অনেকটা সময় কাটলো।
বাকি সময় মিউজিয়ামের রিডিং রুমে বসে টাইটার স্ক্রোলের মাইক্রোফিল্মে চোখ বোলালো সে। বার বার করে পড়ে নিশ্চিত হতে চাইলো, কোনোকিছু বাদ পরেছে কি না। একটা অংশ ভালোমতো পড়ে বিষদ নোট নিল রোয়েন। এখন যখন ফারাও মামোসের সমাধি আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারছে সে।
একটা অংশে লিপিকার টাইটা ফারাও-এর সমাধি পরিদর্শনের বর্ণনা দিয়েছে। এ অংশটা বেশ আকর্ষণ করলো রোয়েকে। বিশেষত, ফারাও-এর মৃত্যু-মুখোশের তাকে যেনো জাদু করলো। টাইটা লিখেছে, আমি নিশ্চিত, হাজার বছরেও কোনো স্বর্ণকার এমন একটি জিনিস তৈরি করে নি কখনো। অনাগত দিনগুলোর মানুষজন একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখবে এ সৃষ্টি।
একজন কপটিক খ্রিস্টান হিসেবে সরাসরি এ প্রাচীন লিপিকারের উত্তরসূরী রোয়েন। আবেগে কেঁপে উঠে সে।
কিন্তু আতালান আবু সিনের জন্য অপেক্ষার দিনগুলোতে নিকোলাস কুয়েনটন হারপারের কথা বারবারই মনে হলো তার। তার অনেক বিষয়েই বেশ অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রোয়েন। অনেকগুলো কঠিন সিন্ধান্ত নিতে হবে তাকে, খুব দ্রুত।
অবশেষে, আতালান আবু সিনের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রহর চলে এলো। চুড়ান্ত সময়টাতে বিদ্রোহ করতে চাইলো রোয়েনের মন, ইচ্ছে হলো, না যায়, কিন্তু নিশিথে পাওয়া মানুষের মতোই বাজারের মধ্য দিয়ে হেঁটে চললো ও।
এক ঘণ্টা দেরি করে মন্ত্রী মহোদয়ের অফিসে পৌঁছলো রোয়েন। বেশ চনমনে মুডে আছেন আতালান। সাদা দিশদাশা আর পাগড়ী মাথায়। আন্তরিক ভঙ্গিতে হাত মেলালেন রোয়েনের সাথে। লন্ডনে হলে হয়তো গালে চুমো খেতেন!
গত কয়েকদিন মিউজিয়ামে পড়ে কাটিয়েছি আমি, অনেক পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। শুনে অবাক হলাম–নাহুত নাকি ইস্তফা দিয়েছে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আতালান। আমার ভাইপোটা আসলে মোটেও ধীরস্থির নয়। সে নাকি জার্মানিতে কি একটা ভালো চাকরি পেয়েছে। আমি অবশ্য জোর করেছিলাম, কিন্তু–
তাহলে পরিচালক পদে কাকে নিয়োগ দিচ্ছেন এখন? এমন নিষ্পাপ কণ্ঠে জানতে চাইলো রোয়েন, যেনো কিছু সন্দেহ না হয়।
এখনো কোনো এপয়েন্টমেন্ট দিই নি, স্বীকার করলেন আতালান। নাহুত ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে ভালো কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। হতে পারে, হয়তো আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দিব। কিন্তু বিদেশী কেউ ওই পদ পেলে আমার খুব খারাপ লাগবে।
সম্মানীত মন্ত্রী–আপনার সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে রাজি হলেন আতালান।
ব্যক্তিগত সেক্রেটারিকে ইশারায় বিদায় করে দিলেন তিনি।
বলুন, মাই লেডি, কি ব্যাপারে কথা বলতে চান?
এর এক ঘণ্টা পর রোয়েন বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। ওকে বিগলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে দিলেন মন্ত্রী মহোদয়।
বিদায়ের ক্ষণে নিচু গলায় বললেন, আবার আমাদের দেখা হবে, খুব শীঘ্রই ইনশাল্লাহ!
*
হিথরো বিমান বন্দরে ইজিপশিয়ান বিমান থেকে নামলো রোয়েন। দারুণ ঠান্ডা এখানে অন্তত পনেরো ডিগ্রি কম মিশরের চেয়ে। বিষণ্ণ, কুয়াশাঘেসা সন্ধ্যায় ইয়র্কের উদ্দেশ্যে ট্রেনে চড়লো ও। ট্রেন ইয়র্কে পৌঁছতে স্টেশন থেকে নিকোলাসের নাম্বারে ফোন করলো।
আরে, আপনি আমাকে বললেই তো এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিতাম, ভর্ৎসনার সুরে বলল নিকোলাস।
আবার নিকিকে দেখে নিজের আনন্দে অবাক হয়ে গেল রোয়েন নিজেই। রেঞ্জ রোভার থেকে নেমে, লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছে সে। এ ক-দিনে চুল কাটে নি নিকোলাস–এলোমেলো হয়ে আছে বড়ো বড়ো চুল।
আপনার হাঁটুর খবর কি? প্রথমেই জানতে চাইলো নিকোলাস। এখনো কি পিঠে তুলে নেয়ার প্রয়োজন আছে?
প্রায় সেরে গেছে হাসতে হাসতে জবাব দিল রোয়েন। লাঠিটা এবার ফেলে দিলেই পারি। ইচ্ছে হলো, দুই হাতে নিকোলাসের গলা জড়িয়ে ধরে–এতো আনন্দ হচ্ছে। বদলে, শান্ত ভাবে ঠান্ডায় লালচে হয়ে আসা গালটা বাড়িয়ে ধরে রোয়েন। চুমো খেলো নিকি। পুরুষ পুরুষ গন্ধ–সম্ভবত আফটার শেভের রোয়েনের সমগ্র অস্তিত্বে ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়লো।
