অনেক রাত হয়েছে, হের ফন শিলার, এ সময় বললেন নাহুত। আপনি যদি বিশ্রাম নিতে চান….
না!
এরপর রাজার আঙুল থেকে আঙটিগুলো ভোলা হলো এক এক করে। সবশেষে নাহুত আর হের রিপার এসে দাঁড়ালেন মাথার দু পাশে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে ফারাও-এর মুখ আর মাথা, প্রায় চার হাজার বছর পর এ প্রথম। চুল খুব পাতলা, হেনা দিয়ে রাঙানো। চামড়ায় সুগন্ধী লাক্ষার প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, পালিশ করা অম্বরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। নাকটা বড়, টিকালো। ঠোঁট জোড়া পেছন দিকে সামান্য ঢুকে আছে, যেনো স্বপ্নের ভেতর হাসছেন। চোখের পাতায় রেজিন বা লাক্ষার প্রলেপ থাকায় অশ্রুতে ভেজা মনে হলো, পাতাগুলো আধবোজা। ফারাও তার কপালে রাজকীয় মুকুট পরে আছেন। গোক্ষুরের মাথার প্রতিটি বৈশিষ্ট্য এখনো নিখুঁত ও স্পষ্ট। লম্বা জিভ মাঝখানে চেরা। চোখগুলো চকচকে নীল কাঁচ। ফণার পেছনে রাজপরিবারের প্রতীক চিহ্ন।
ওই মুকুট আমার চাই, আবেগে কেঁপে গেল শিলারের কণ্ঠস্বর। তুলুন ওটা, আমার হাতে দিন।
কিন্তু তুলতে গেলে মমির ক্ষতি হতে পারে…
নাহুতকে ধমক দিলেন ফন শিলার। আবার তর্ক করেন!
এখুনি তুলছি, হের ফন শিলার, তাড়াতাড়ি বললেন নাহুত। তবে সময় লাগবে। হের ফন শিলার যদি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন, তোলার পর আমরা খবর পাঠাব…।
রেজিন মোড়া কপালের চামড়ার সঙ্গে সোনার বৃত্তটা শক্তভাবে আটকে আছে। কপাল থেকে ওটাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কফিন থেকে গোটা মমিটা তুলতে হলো প্রথমে। তোলার পর স্টেইনরেস স্টীলের স্ট্রেচারে শোয়ানো হলো। বিশেষভাবে তৈরি সলভেন্টের সাহায্যে নরম করা হলো রেজিন। কাজটা শেষ করতে প্রচুর সময় লাগলো।
মুকুটটা আলাদ করে রাখা হলো নীল ভেলভেট কুশনে। ভল্টের সমস্ত আলো নিস্তেজ করে দিয়ে একটা মাত্র স্পট লাইটের আলো সরাসরি ফেলা হলো ওটার উপর। তারপর নাহুত আর হের রিপার উপরতলায় গেল ফন শিলারকে খবর দিতে।
মুকুট দেখার জন্য ভল্টে যখন আবার নামলেন ফন শিলার, সঙ্গে ওদের কাউকে রাখলেন না, ওদের বদলে পাশে থাকলেন প্রাইভেট সেক্রেটারি উতে কেম্পার। ভারী ভল্টের দরজা আটকে দিলেন জার্মান ধনকুবের।
মুকুটটা দেখামাত্র হাঁপাতে শুরু করলেন তিনি, হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস টানতে লাগলেন। এতো জোরে চাপ দিয়ে ধরলেন উতের কোমড়, ব্যাথায় ঝাঁকিয়ে উঠলো মহিলা। কিন্তু এ ব্যাথাই যেনো জাগিয়ে তুললাম উতেকে। ফন শিলার সমস্ত কাপড় খুলে ফেললেন তার দেহ থেকে। সোনালী মুকুটটা পড়িয়ে দিলেন উতের মাথায়, এরপর নগ্ন শরীরে শুইয়ে দিলেন খোলা কফিনের ভেতর।
আমি জীবনের চাবিকাঠি, প্রাচীন কফিনের মধ্য থেকে ফিসফিস করে বলে উঠলো উতে। আমার মুখ অমরত্মের ছোঁয়ায় চিরউজ্জ্বল।
নগ্ন শিলার দাঁড়িয়ে রইলেন কফিনের সামনে। তার পুরুষাঙ্গ ফুলে-ফেঁপে বিশাল আকার নিল, দপ দপ করে কাঁপছে ওটা–যেনো নিজস্ব কোনো জীবন আছে তার।
নিজের শরীরে ধীরে হাত বোলাচ্ছে উতে, আঙ্গুলগুলো যখন যোনর স্পর্শকাতর অঙ্গ ছুঁলো, কেঁপে উঠে সে বলল, আপনি চিরজীবী হোন!
ফারাও মামোসের মুকুটের প্রভাব হলো অবিশ্বাস্য। আগে কোনোদিনও গুগোল্ড ফন শিলারের এমন হয় নি। উতের কথা শেষ হতে না হতেই তার পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ নিজে থেকেই উগড়ে দিল রুপালি বীজের ধারা–আঠালো তরল লেপ্টে গেল উতের সাদাটে, নরম পেটে।
ওদিকে, ভোলা কফিনে উতে কেম্পার চরম পুলকে কেঁপে কেঁপে উঠছে; পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে অসহ্য সুখে, যেনো খিচুনি ধরেছে তার।
*
রোয়েনের মনে হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ নয়, বহু বছর ধরে মিশরের বাইরে ছিল সে। শহরতলীর জ্যাম, লোকের ভিড়, বাজারের মশলা আর ধূলোর মিলিত গন্ধ, মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি–সবকিছু কতকাল ধরে যেনো শোনে নি।
প্রথম দিনে অন্ধকার থাকতেই নিজের গির্জার ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পরলো রোয়েন। নীল নদের তীর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চললো। হাঁটুটা এখনো উঠলো, লাঠি ব্যবহার করতে হচ্ছে হাঁটার জন্য। দূরের পানিতে ফেলুচ্চার তেকোণা পাল দেখে কেমন আনমনা হয়ে গেল রোয়েন। মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁপছে নীলের জল।
ইথিওপিয়ায় যে নীল নদ দেখে এসেছে ও, তার থেকে এটা কত আলাদা। এ। যে অ্যাবি নয়–সত্যিকারের নীল নদ। অনেক চওড়া, ধীর, বাতাসে সোঁদা একটা গন্ধ–রোয়েনের অত্যন্ত প্রিয়। এটা তার নদী, তার স্বদেশ। যা করতে এখানে সে এসেছে, মনে মনে তার সপক্ষে জোর পেল রোয়েন। সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝরে গেল, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হাঁটতে লাগলো ও।
ডুরেঈদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়ার জন্য তারা নিশ্চই খুব চিন্তায় আছে। প্রথমে ডুরেঈদের ভাই কিছুটা শীতল আচরণ করছিল ওর সাথে; পরে তার স্ত্রী যখন রোয়েনকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো, আর বাচ্চারে এসে জড়ো হলো তার পাশে, একটু সহজ হয়ে উঠলেন ভাইজান। বাচ্চাগুলো সবাই রোয়েনকে আম্মা বলে ডাকে। শেষমেষ, ভাইজান নিজেই ওকে মরুদ্যানে পৌঁছে দেওয়ার কথা জানালেন। কিন্তু রোয়েন বিনীত কণ্ঠে জানালো, সমাধিতে ও একা যেতে যায়। অতুক্তি না করে নিজের প্রিয় সিত্রো : গাড়িটা ধার দিতে রাজি হলেন তিনি।
ডুরেঈদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মরুর বাতাসে চুলগুলো সামলাতে হিমশিম খেয়ে গেল রোয়েন। এ মরু দুরেঈদের জীবনভর প্রিয় ছিল। ভালোই হলো–আর কখনোই মরু থেকে দূরে থাকতে হবে না তাকে। খুব সাধাসিধে কবরের ফলকে শুধু নাম আর তারিখ লেখা। একটু নিচু হয়ে কবরের উপর থেকে শুকনো ফুল আর পাতা সরিয়ে পরিষ্কার করে দিল রোয়েন।
