অদলবদল করার কী কারণ ছিল? শিলারের চেহারায় অবিশ্বাস।
কুসংস্কার বা আধ্যাত্মিক কারণ থাকতে পারে, জাগতিক কোনো কারণ যদি না ও থাকে। টাইটা চেয়েছিল তার প্রিয় বন্ধু ট্যানাস ফারাও-এর গুপ্তধন মৃত্যুর পরও পাহারা দিবে এবং ব্যবহার করবে। বন্ধুর প্রতি এটা ছিল তার শেষ উপহার।
এ সব আপনি বিশ্বাস করেন?
অন্তত অবিশ্বাস করি না। এ ধারণার পক্ষে আরো যুক্তি আছে, হের ফন শিলার। এক্স-রে থেকে বোঝা যাচ্ছে যে মমির তুলনায় কফিনা আকারে অনেক বেশি বড়। আমার ধারণা, আরো দীর্ঘ কোনো মানুষের জন্য কফিনটা তৈরি করা হয়েছিল। জ্বী, হের ফন শিলার, প্রচুর সম্ভাবনা আছে যে এটা একটা রাজবংশীয় মমি।
শিলারের চেহারা পশুর মতো দেখাচ্ছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কথা বললেন
কর্কশ সুরে, হোয়াট! কোনো রাজার মমি?
সম্ভবত, তাই।
হ্যাঁ। কফিনের ডালায় ছবিতে স্বর্ণের ইউরিয়াস মুকুট দেখা যাচ্ছে!
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কফিনটার পাশে দাঁড়ালেন শিলার। খুলুন এটা। ফারাও মামোসের মমিটা আমাকে দেখান।
*
কাজটা অত্যন্ত কঠিন। প্রথমে নাহুতকে নিশ্চিত হতে হবে রঙের নিচে কোথায় রয়েছে ঢাকনির জয়েন্ট। সেটা জানার পরই কেবল বার্নিশ আর আঠা তোলার কাজে হাত দেওয়া যাবে। কাজগুলো শেষ করতে প্রায় সারাটা দিন লাগিয়ে দিলেন তিনি।
ঢাকনি মুক্ত হওয়ার পরও সেটা তোলা হলো না। হের ফন শিলার দুই ছেলের সঙ্গে মিটিংয়ে রয়েছেন, তাঁকে খবর পাঠানো হলো। জরুরি আলোচনা বাদ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভল্টে চলে এলেন তিনি, কুদে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে কফিনের দিকে তাকালেন। হ্যাঁ, তুলুন এবার ঢাকনি।
ঢাকনি তোলা হলো। ভেতরে তাকালেন হের ফন শিলার। তার চেহারায় বিস্ময় ফুটে উঠলো। ঐতিহ্যবাহী ভঙ্গিতে একটা লাশকে শুয়ে থাকতে দেখবেন বলে আশা করেছিলেন, তার বদলে কফিনের ভেতরটা এলোমেলো ও আলগা লিনের ব্যান্ডেজে ভর্তি দেখতে পাচ্ছেন। এ সব কি…. মনে হলো রেগে উঠবেন, ঝুঁকে বিবর্ণ ব্যান্ডেজ ধরতে গেলেন।
না! ছোঁবেন না! বাধা দিলেন নাহুত। চিৎকার করা হয়ে গেছে, বুজতে পেরে আড়ষ্টবোধ করলেন তিনি। মাফ করবেন, হের ফন শিলার। ব্যাপারটা সত্যি বিস্ময়কর। লাশ অদলবদল হবার সম্ভাবনাটা আরো বেড়ে গেল। আপনার অনুমতি পেলে ব্যান্ডেজ খোলার আগে আরো স্টাডি করতে চাই, হের ফন শিলার।
মঞ্চ থেকে নেমে পড়লেন হের ফন শিলার। গাঢ় নীল ডাবলব্রেস্টেড জ্যাকেটের ব্রেস্ট পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছলেন মুখের। ঠিক আছে। কিন্তু এ কি সম্ভব? সত্যি এটা ফারাও মামোসের মমি হতে পারে? আবার মুখ মুছলেন তিনি। আলগা বাধনগুলো ভোলা হোক।
তার আগে, হের ফন শিলার, ফটো তোলা দরকার।
হ্যাঁ, অবশ্যই, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন ফন শিলার। আমরা আর্কিওলকিস্ট, বিজ্ঞানী, সাধারণ লুটেরা নই। তুলুন ছবি।
আলগা বাধনও খুব সাবধানে, একটু একটু করে তুলতে হচ্ছে। এতো বেশি সময় লাগছে যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ার অবস্থা হলো শিলারের। পুরানো আলগা কাপড়ের শেষটুকু মমির গা থেকে সরিয়ে নিলেন নাহুত, সময় তখন রাত একটা। আলগা কাপড়ের পর নিখুঁতভাবে কয়েক স্তরে বাধা হয়েছে ব্যান্ডেজ, তবে সেগুলোর ফাঁক দিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মারছে চকচকে সোনা।
রাজকীয় কফিনে, কফিনের ভেতর আরো কয়েকটা কফিন থাকার কথা। এখানে সে সব দেখা যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে না মুখোশগুলোও। ওগুলো নিশ্চয়ই ফারাও-এর নিজস্ব কফিনে রয়ে গেছে। সেই কফিনে অবশ্যই ট্যানাসের মমি শুয়ে আছে, আবিষ্কারের অপেক্ষায়। এখানে আমরা শুধু রাজবংশীয় মমির ইনার ড্রেসিং দেখতে পাচ্ছি।
লম্বা ফরসেপ দিয়ে ব্যান্ডেজের ওপরের স্তরটা ছাড়ালেন নাহুত। ইতোমধ্যে আবার মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন হের ফন শিলার, ঝুঁকে কপিরে ভেতর তাকিয়ে আছেন।
এটা মামোস রাজপরিবারের বক্ষাবরণ বা বুকের বর্ম, রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করলেন নাহুত। স্পট লাইটের নিচে অলংকারটা ঝলমল করছে। বর্মটা সোনার তৈরি, বহুমুল্য রত্নখচিত, গোটা কুব জুড়ে আছে। মাঝখানে একটা শকুনের আকৃতি, সোনার উপর, বিশাল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে, বাঁকা নখে ধরে আছে রাজপরিবারের প্রতীক চিহ্ন, সোনার তৈরি সর্পিল অলংকরণ।
আর কোনো সন্দেহ নেই, হের ফন শিলারও ফিসফিস করলেন। ঐ প্রতীক চিহ্নই লাশের পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছে।
এরপর ওরা রাজার হাত মুক্ত করলেন, বক্ষাবরণের উপর ভাঁজ করা ছিল। আঙুলগুলো লম্বা, প্রতিটি আঙুলে একের পর এক আঙুটি পরানো, হাতের মুঠোয় রাজদণ্ড। রাজার প্রতীক চিহ্ন। এটাই আসল প্রমাণ। কথা বলার সময় হাঁপাচ্ছেন নাহুত। উনি অষ্টম মামোস, প্রাচীন মিশরের আপার ও লোয়ার কিংডমের শাসনকর্তা। রাজার মাথার দিকে এগুলেন তিনি, এখনো সেটা ব্যানডেজে মোড়া।
না, মাথা খুলবেন সবশেষে, বাধা দিলেন ফন শিলার। ফারাও-এর মুখ দেখার জন্য এখনো আমি প্রস্তুত নই।
কাজেই রাজার শরীরের নিচের দিকটায় কাজ শুরু করলেন নাহুত আর হের রিপার। ব্যান্ডেজের প্রতিটি স্তরের নিচ থেকে বের হলো মন্ত্রঃপূত কবচ, সবই সোনার তৈরি, বহুমূল্য রত্নখচিত। আকাশ, জমি আর পানিতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার নকশা খোদাই করা হয় নি কবচগুলোয়, সবই রঙিন। প্রতিটি কবচের ফটো তোলা হলো, তারপর কফিন থেকে তুলে রাখা হলো রুপোর ট্রেতে।
