স্ত্রীর সঙ্গে এক ঘণ্টা কাটিয়ে নিজের বেডরুমে চলে এলেন তিনি, ঘুমালেন চার ঘণ্টা। যতই ক্লান্ত হোন, এর বেশি ঘুম তার দরকার হয় না। দুপুর পর্যন্ত ব্যবসার কাগজপত্র দেখলেন তিনি। তারপর তত্ত্বাবধায়ক রিপার ইন্টারকমে জানালেন, তাঁরা সবাই তার জন্যে ভল্টে অপেক্ষা করছেন।
প্রাইভেট সেক্রেটারি কেম্পারকে সঙ্গে নিয়ে এলিভেটরে চড়লেন ফন শিলার। এলিভেটরে দরজা খোলার পর দেখা গেল হের রিপার ও নাহুত অপেক্ষা করছেন। একবার চোখ বুলাতেই ফন শিলার বুঝতে পারলেন দু জনেই উত্তেজনায় অস্থির হয়ে আছেন। এক্স-রে শেষ হয়েছে? আন্ডারগ্রাউন্ড প্যাসেজ ধরে ভল্টের দিকে যাবার সময় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
জ্বী, হের ফন শিলার! হের রিপার জবাব দিলেন। বয়েসে তিনি প্রৌঢ়, আর্কিওলজি নিয়ে অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করেছেন, মুখে ফ্রেঞ্জকাট দাড়ি। টেকনিশিয়ানরা দারুণ কাজ দেখিয়েছেন। প্লেটগুলো ভারি চমৎকার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে নিয়মিত চাঁদা দেন ফন শিলার, কাজেই তাঁর যে কোনো অনুরোধ রাজকীয় আদেশ বলে গণ্য করা হয়। ক্লিনিকের ডিরেক্টর তাঁর সবচেয়ে আধুনিক পোর্টেবল এক্স-রে ইকুইপমেন্টসহ দু জন টেকনিশিয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, সঙ্গে একজন সিনিয়ন রেডিওলজিস্ট। লর্ড হারাব-এর ছবি ভোলা হয়েছে। প্লেটগুলো স্টাডি করে রিপোর্ট তৈরি করেছেন রেডিওলজিস্ট।
স্টীল ভল্টের তালায় প্লাস্টিক পাস কার্ড ঢোকালেন হের রিপার, হিস হিস শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। সবার আগে ভেতরে ঢুকলেন ফন শিলার। ভেতরে ঢুকে ভল্টের চারদিকে চোখ বুলালেন তিনি। বরাবরের মতো উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে এলো তার।
ভল্টের দেয়াল দুই মিটার পুরু, ইস্পাত আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি। ভল্টটা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে সুরক্ষিত। আরো ভেতরে চলে এলেন ফন শিলার, থামলেন মেইন ডিসপ্লে রুমে। ইউরোপের বিখ্যাত ডিজাইনার এ কামরার প্ল্যান ও ডিজাইন তৈরি করেছেন। প্রধান রঙ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে নীল। কালেকশনে প্রতিটি আইটেম আলাদা কেসে রাখা হয়েছে।
মিডনাইট-ব্লু ভেলভেট কুশনে রাকা হয়েছে স্বর্ণালংকার আর মূল্যবান রত্ন, কামরার ভেতর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে ওগুলো নেই। সুকৌশলে লুকানো স্পটলাইটের আলো এসে পড়েছে আইভরি আর অবসিডিয়ান-এর উপর। প্রাচীন দেব-দেবীর অসংখ্য মূর্তি শোভা পাচ্ছে উঁচু মঞ্চের উপর-তথ, আনুবিস, হাপি আর সেথ আছেন, আছেন ওসিরিস, আইসিস আর হোরাস।
কামরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে টাইটার স্টোন টেস্টামেন্ট। পাশে দাঁড়িয়ে ওটার মসৃণ গায়ে হাত বুলালেন ফন শিলার, তারপর পাশের কামরায় চলে এলেন।
এখানে কাঠের জোড়া সেতুর উপর রাখা হয়েছে ট্যানাস, লড হেরাব-এর কফিন। সাদা কোট পরা একজন রেডিওলজিস্ট আলোকিত ডিসপ্লে বোর্ডে সামনে ঝুঁকে রয়েছেন, বোর্ডে আটকানো রয়েছে কয়েকটা এক্স-রে প্লেট। পাশে এসে সেগুলোর দিকে তাকালেন ফন শিলার। কাঠের কফিনে আউটলাইনের ভেতর কোঁকড়ানো মানুষের আকৃতি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, হাত দুটো বুকের উপর ভাজ করা। এই বডি সম্পর্কে আমাকে আপনার কি বলার আছে? মহিলা রেডিওলজিস্টের দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ফন শিলার।
পুরুষ, বললেন মহিলা। মধ্যবয়স্ক, মৃত্যুর সময় বয়েস ছিল পঞ্চাশের উপর, তবে ষাটের নিচে। ছোটখাট আকৃতি। উপস্থিত সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। পাঁচটা দাঁত নেই….
একটানা পাঁচ মিনিট লাশের বর্ণনা দিলেন রেডিওলজিস্ট, তারপর বললেন, মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ বুক ভেদ করা জখম। জখমের জন্য দায়ী হতে পারে বল্লম বা বর্শা। অস্ত্রটা কোনাকুনি ঢোকে, বাম ফুসফুস ফুটো করে ফেলে।
আর কিছু?
হের ফন শিলার, রেডিওলজিস্ট এক সেকেন্ড ইতস্তত করে বললেন, আপনার আরো অনেক মমি পরীক্ষা করেছি আমি। কিন্তু এরকম আগে কখনো দেখিনি। পেটের ভিসেরা বের করার জন্য যেভাবে পেট কাটা হয়েছে, বোঝাই যায় অত্যন্ত দক্ষ কোনো ফিজিশিয়ানের কাজ।
ধন্যবাদ, বললেন ফন শিলার, তাকালেন নাহুতের দিকে। এ পর্যায়ে কোনো মন্তব্য?
ট্যানাস, লর্ড হেরাব-এর যে বর্ণনা সপ্তম স্ক্রোলে দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে এ সব মেলে না।
কোথায় মেলে না?
ট্যানাস ছিলেন দীর্ঘদেহী। বয়েস আরো কম। কফিনের ঢাকনিতে তার ছবি দেখুন, হের ফন শিলার।
বলে যান।
এক্স-রে প্লেটের ডিসপ্লের সামনে এসে দাঁড়ালেন নাহুত, হাত তুলে গাঢ় ও নিরেট কয়েকটা দাগের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। জুয়েলারি, বললেন তিনি।
কবচ। বাজুবন্ধ। বুকের আচ্ছাদন বা বর্ম। কিছু নেকলেস। আঙটি আর কানে রিঙ। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো মুকুটটা, মুকুটে বসানো গোক্ষুর সাপের ফণা। ওটা শুধু রাজপরিবারের সদস্যরা পরেন।
এ সব কিসের ইঙ্গিত দেয়? ফন শিলারকে হতভম্ব দেখালো।
এটা সাধারণ কোনো মানুষের বডি নয়, কিংবা শুধু অভিজাত কারো বডিও নয়। অলংকারের পরিমাণ খুব বেশি। আমার বিশ্বাস এটা আসলে একটা রাজকীয় মমি।
অসম্ভব, ধমক দিলেন ফন শিলার। কফিনে কি লেখা রয়েছে পড়ন। পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে এটা মিশরীয় একজন সেনাপতির মমি।
ক্ষমা করবেন, হের ফন শিলার, সবিনয়ে বললেন নাহুত। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একটা নিশ্চয়ই আছে। রিভার গড বইটায় আভাস দেওয়া হয়েছে টাইটা নাকি দুটো মমি অদলবদল করে-একটা ছিল ফারাও মামোসের মমি, অপরটা ছিল তার সুহৃদ ট্যানাসের।
