জীবনে প্রথমবারের মতো কাইফেনের কাছে এরকম সুন্দর কোনো মহিলা তার জীবন বাঁচানোর সবিনয় প্রার্থনা করছে। এর আগে কেউ কখনো তার কাছে কিছুই চায়নি। নিজের ভিতরে একটা দায়িত্ববোধ অনুভব করলো। ও। মিসেস ফয়কে ওর বাঁচাতে হবে। আর সেজন্যে দরকার হলে সেই প্রাচীন আমলের নাইটদের মতো সর্বস্ব বিলিয়ে দেবে। আর এখন সে বিধবা-একজন অসম্ভব ধনী বিধবা-আর এই শোকের দিন পাড়ি দিতে তার একজন পুরুষের শক্ত হাত লাগবে। আর একসময়, তার কৃতজ্ঞতা… নাহ কাইফেন আর ভাবতে পারলো না।
কাইফেন মিসেস ফয়-এর কাঁধে হাত রাখলো। নিজের সাহসে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। “চিন্তা করবেন না,” শক্ত গলায় বললো ও। “এখন থেকে আমিই আপনাকে রক্ষা করবো।”
“আমাদেরকে পালাতে হবে,” মিসেস ফয় বললো। “নৌকাটা প্রস্তুত করুন।”
“মিস্টার উইল্ড বলেছেন-”
“মিস্টার উইল্ড এখানকার হুকুমদাতা না। আপনি।” মিসেস ফয় ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, চোখে অনুনয়। কাইফেন হঠাৎ পাওয়া এই ক্ষমতার উত্তেজনায় শিহরিত হয়ে উঠলো। মিসেস ফয় আবার বললো, “আমরা আপনার উপরেই ভরসা করে আছি।”
কাইফেন জড়ো হওয়া লোকগুলোর দিকে ফিরে নিজের গলা পরিষ্কার করে নিলো। “নৌকাটা প্রস্তুত করো। দরকারি রসদ, পাউডার আর গুলি নিয়ে নাও। এক ঘন্টার মাঝে রওনা দেবো আমরা।”
বৃদ্ধ লোকগুলো আর বাচ্চারা ওর আদেশ পালনে ছুটলো। কিন্তু আর এক কোণে আলফ উইলসন আর তার লোকেরা বুকে হাত ভাঁজ করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলো। কাইফেন ওদের দিকে অস্থির ভঙ্গিতে তাকাতে লাগলো। কেস্ট্রেল-এর মেট-এর চাউনিটা ভালো লাগছে না ওর। এখানে যদি ওর কর্তৃত্বকে নাকচ করার মতো কেউ থেকে থাকে তাহলে সেটা এই লোকই।
“তাড়াতাড়ি যান,” ধমকের সুরে বললো ও। “একবার ধরতে পারলে কিন্তু রানির লোকেরা শূলে চড়াবে।”
ওর কোথায় পাত্তা না দিয়ে আলফ অ্যাগনেস আর অ্যানার দিকে এগিয়ে গেলো। “আমাকে কি করতে বলেন? টম আর ফ্রান্সিসের কি বাঁচার কোনো সম্ভাবনা আছে?”
ক্রমাগত কান্নার কারণে অ্যাগনেস আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। অ্যানা কথা বললো। নিজের কণ্ঠের আত্মবিশ্বাসে ও নিজেই চমকে গেলো। “আপনার অর্ধেক লোক নিয়ে কেউ বেঁচে আছে কিনা খুঁজতে যান। কিন্তু কোনো ঝুঁকি নেবেন না। যদি রাস্তায় রানির সৈন্যদের দেখা পান তো সোজা পালিয়ে আসবেন। আর বাকি লোকেরা নাহয় নৌকাটা প্রস্তুত করতে সাহায্য করুক। টম আর ফ্রান্সিস বেঁচে থাক বা মারা যাক, আমার ধারণা, খুব শীঘ্রই নৌকাটা আমাদের কাজে লাগবে।”
অ্যানা অ্যাগনেসকে ধরে বাড়িতে নিয়ে গেলো। ও ভেবে পাচ্ছিলো না সারাহকে কিভাবে খবরটা দেবে। এখনো অসুস্থ্য হয়ে বিছানায় পড়ে আছে সে। ফ্রান্সিস আর টুম কি আসলেই মারা গিয়েছে? এতো প্রাণ প্রাচুর্য্যে ভরা দুটো মানুষ আর নেই, বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
এদিকে দুর্গে লিডিয়া ফয় তখনও কাইফেনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে ওকে আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। লিডিয়া একটা চোখ সামান্য খুলে দেখালো লোকজন সবাই যার যার কাজে বিদায় নিয়েছে।
“গোডাউন থেকে কিছু মালপত্র নিয়ে নিতে ভুলবেন না যেনো।”
কাইফেন হতভম্ব হয়ে গেলো। “এই পরিস্থিতিতেও আপনার মাথায় ব্যবসার কথা ঘুরছে?”।
“আমার প্রাণ প্রিয় স্বামী এই ব্যবসার জন্যে প্রাণ দিয়েছেন। তার কাছে এটাই ছিলো সবকিছু। ঐ খুনীগুলোর হাতে তার মালপত্র গুলো ছেড়ে দেওয়া মানে তার স্মৃতিকেই অসম্মান করা।”
মিসেস ফয় উঠে দাঁড়িয়ে চেহারা থেকে অশ্রু মুছে ফেললো। কাইফেনের চাইতেও তিন ইঞ্চি বেশি লম্বা সে। গভীর নীল চোখ জোড়া দিয়ে সে এমনভাবে কাইফেনের দিকে চেয়ে রইলো যে ওর মাথা চক্কর দিতে লাগলো।
“আমরা যদি পালানোর পরেও ঠিকমতো বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোর পর আমাদের ভরণপোষণের জন্যে কিছু জিনিস থাকা উচিত। আমি বুড়ো বয়সে ভিক্ষা করতে চাই না।”
“সেরকম কিছু হবে না, ম্যাডাম। আমি নিজে আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।”
মিসেস ফয় কাইফেনের হাত ধরলো। “ওহ মিস্টার কাইফেন, আপনি কতো ভালো। কিন্তু আমাদের হাতে কিন্তু নষ্ট করার মতো একদম সময় নেই।”
কাইফেন চারজন শক্তিশালী লোককে মিসেস ফয়-এর সাথে ভাড়ার ঘরে যেতে বললো। কোন প্রতিবাদ ছাড়াই সবাই ওরা আদেশ পালন করতে ছুটতেই ব্যাপারটায় খুব সন্তুষ্ট হলো কাইফেন। আদেশ পালন করেই অভ্যস্ত ও, দিয়ে না। আজকের আগ পর্যন্ত ও ছিলো এখানকার সবচে ছোট মুনশি, কোম্পানির ক্ষমতার মইয়ের সর্বনিম্ন ধাপে অবস্থান ওর। বাকিরা ওকে মাড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে আজ একেবারে ক্ষমতাবান হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর এই অনুভূতিটা দারুণ সুখানুভূতি দিচ্ছে ওকে।
কিছুক্ষণের মাঝেই নৌকাটা সুতি কাপড়ের গাটরি, ইংল্যান্ড থেকে আসা হাতের কাজ করা কিছু মালামাল, ওয়াইন আর ব্রান্ডির ঝুড়িতে ভরে গেলো। মিসেস ফয় কড়া নজরে সব মালপত্র ভোলা তদারক করলো। সব মালপত্র যাতে একদম ঠিকভাবে রাখা হয়, সেদিকে সতর্ক নজর রাখলো সে। কাজ শেষে সন্তুষ্ট হয়ে আবার কাইফেনকে খুঁজে বের করলো।
“আমার সাথে আসুন,” বললো সে। “আপনাকে একটা জিনিস দেখাবো।”
কাইফেন সাগ্রহে গভর্নরের বাড়িতে প্রবেশ করলো। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও, নানান চটকদার সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতে লাগলো ওর। কিন্তু মিসেস ফয় ওকে সরাসরি তার সদ্য প্রয়াত স্বামীর অফিসে নিয়ে গেলো।
