“কে তুই?” পানির গর্জনের ভিতর দিয়েই প্রশ্ন করলো টম।
অশ্বারোহী কোনো জবাব দিলো না। ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে ও আবার জঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।
*
ঝড়ের কারণে রাত নেমে এলো দ্রুত। এই অন্ধকার আর বৃষ্টির মাঝে খেই হারিয়ে ফেললো ওরা। একাধিকবার দেখা গেলো ওরা খাড়ির ভিতরে নেমে পড়ছে। কিন্তু টম বিরতি দেওয়ার সাহস করলো না। কারণ, ও খুব ভালোমতোই জানে যে অশ্বারোহী লোকটা ওদেরকে ধাওয়া করা থেকে বিরতি নেবে না।
একটু পরেই ওরা পুরোপুরি পথ হারিয়ে ফেললো। কিন্তু তবুও টম কাউকে থামতে দিলো না বরং জঙ্গলের ভিতরে দিয়ে দৌড় করিয়ে নিয়ে চললো। মাঝে একবার দম নেওয়ার জন্যে থামতেই ফ্রান্সিস এগিয়ে গেলো টমের দিকে।
“আমাদের থামা উচিত। এভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে ঘুরে ফিরে আবার রানির জেলখানায় গিয়ে হাজির হয়েছি।”
টম জানে যে ফ্রান্সিসের কথা ঠিক। কিন্তু এতো সহজে হাল ছেড়ে দিতে রাজি না ও।
“আর কয়েক মিনিট। এর পরেই-” বলে ও থেমে গেলো। বৃষ্টি আর বাতাস দুটোই কমেছে কিছুটা। ফলে এর ফাঁকে নতুন আর একটা শব্দ শোনা যেতে লাগলো। “শোনো।”
ওরা দুজনেই শুনতে পেলো সৈকতে ঢেউ আছড়ে পড়ার নরম ছন্দময় শব্দ। “সমুদ্র,” একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো দুজন।
হাতের ছুরি দিয়ে জঙ্গলের মাঝের পথ পরিষ্কার করতে করতে টম সমুদ্রের শব্দ অনুসরণ করে আগাতে লাগলো। আচমকা জঙ্গল শেষ হয়ে সামনেই দেখা গেলো বালিতে ভরা একটা সৈকত।
“কোনদিকে যাবো?” টম ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু জবাব দেওয়ার আগে টমই ওদের সামনেই জ্বলতে থাকা দুর্গের বাতিটা দেখতে পেলো। তার মানে কাইফেন সময়মতো বার্তাটা পৌঁছে দিতে পেরেছে, আর সবাই ওদের অপেক্ষাই করছে।
টম আর ফ্রান্সিস দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছে ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেললো। কাঁচকোচ শব্দ তুলে দরজাটা খুলে যেতেই দেখা গেলো সামনে দুজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে লণ্ঠন, ওদের দিকে মাস্কেট তাক করা।
“মেয়েরা সব কোথায়?” মাস্কেটের নল একদিকে সরিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো টম। “আমার বৌ কোথায়?”
*
উইলিয়াম কাইফেন ঝোঁপ জঙ্গল মাড়িয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগলো। আছাড় খেলো, উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটলো। জীবনে কখনো এতো ভয় পায়নি ও।
জীবনে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। কাইফেন। জীবনে প্রথম যখন কোম্পানির মুনশির নীল পোশাকটা পরেছিলো, তখন ওর কল্পনায় ছিলো এক গৌরবময় ভবিষ্যতের হাতছানি। স্বপ্ন ছিলো এদেশে এসে কনসোল জেনারেল হয়ে হাতীর পিঠে চড়ে দিল্লির রাজদরবারে যাবে, এমন সব দামী দামী মূল্যবান পাথর বা গয়না উপহার পাবে যেগুলোর একটার দাম-ই হবে ওর বাবার এক বছরের রোজগারের সমান। লিংকনশায়ারের এক গির্জার সহকারী যাজক ছিলো ওর বাবা। কিন্তু এখানে এসে নিজেকে আবিস্কার করলো এই পাণ্ডববর্জিত কুঠিতে। এমন একজন গভর্নরের অধীনে ওকে কাজ করতে হয় যে কিনা ওকে এখানকার স্থানীয় চাকরদের চাইতে বেশি পাত্তা দেয় না।
ঝড়ের গতি বেড়েই চললো। মটমট করে ডাল ভাঙছে নাহয় গাছ থেকে ফল পড়ছে, আর কাইফেনের কানে সেগুলো মনে হচ্ছে মাস্কেটের গুলির আওয়াজ। ব্রিঞ্জোয়ানে পৌঁছে সৈকতে দুর্গের বিশাল বপুটা দেখার পরেও ও জানতো যে এখনো দুর্দশার কিছুই শেষ হয়নি।
ও দরজার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সমস্ত লোক, মানে যারা ওদের সাথে যায়নি, তারা সবাই বেরিয়ে এলো ওর সাথে কথা বলার জন্যে। “টম আর ফ্রান্সিস কোথায়? মিস্টার ফয়? ক্যাপ্টেন হিকস?”
“মিস্টার ফয় আর ক্যাপ্টেন হিকস মারা গিয়েছেন। সবাইকেই মেরে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র আমিই পালিয়ে আসতে পেরেছি।”
শোনামাত্র অ্যাগনেসের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। অ্যানা তাড়াতাড়ি এগিয়ে ধরলো ওকে। নইলে পড়েই যেতো।
এর চাইতে মিসেস ফয় বরং তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আরো সংযমের সাথে গ্রহণ করলো। কাঁদলো না বা মূর্ছা গেলো না; এমনকি এক ফোঁটা চোখের জলও বের হলো না।
“তাহলে আমাদের এখুনি পালানোর ব্যবস্থা করা উচিত,” সাথে সাথে বললো সে।
কাইফেন একদিকে কাত হয়ে বসে ওর গায়ের ব্যথা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললো, “মিস্টার উইল্ড বলেছেন দুর্গকে অবরোধের জন্যে প্রস্তুত করতে।”
“তার মানে টম বেঁচে আছে?” অ্যানা জানতে চাইলো। “ফ্রান্সিস?
“আমি যখন রওনা দেই তখন পর্যন্ত দুজনেই বেঁচে ছিলো।”
“কিন্তু এতোক্ষণে মারা গিয়েছে নিশ্চিত, নির্বিকার গলায় বললো মিসেস ফয়। “দেরি করা যাবে না। একটা মিনিট দেরি করার মানে ওই অসভ্যগুলোর হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া। আমাদের মতো চারজন ভদ্রমহিলাকে পেলে ওরা যে কি করবে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে?”
কাইফেনও বুঝলো যে কি হতে পারে আসলে। কিন্তু ও ইতস্তত করতে লাগলো। কিন্তু মিস্টার উইল্ড বলেছেন
মিসেস ফয়-এর চেহারা পাল্টে গেলো। যেনো এততক্ষণে সে পুরো ঘটনাটা অনুধাবন করতে পেরেছে। তারপর হঠাৎ হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে হাত দিয়ে কাইফেনের কোমর জড়িয়ে ধরে ওর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো।
“আমার স্বামী আর নেই,” বিলাপ করে উঠলো সে। “মিস্টার কাইফেন, এখন আপনিই পারেন আমাদেরকে বাঁচাতে।”
কাইফেন চোখ নামিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখা মহিলাটার দিকে তাকালো। তারপরেই ও যে সোজা তার বুকের ভাজটার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। মিসেস ফয় ফোঁপাচ্ছেন আর তার স্তন ফুলে ফুলে উঠছে।
