কাইফেন দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে লাগলো। মিস্টার ফয় হয়তো মারা গিয়েছেন, কিন্তু বহুদিনের চর্চিত অভ্যাস মারা যায়নি। মিসেস ফয়-এর অবশ্য এধরনের কোনো সংকোচ নেই। সে লম্বা পা ফেলে ডেস্কের দিকে এগিয়ে গিয়ে একগাদা চামড়ায় বাধানো হিসাবের খাতা জড়ো করে কাইফেনের হাতে ধরিয়ে দিলো।
“এগুলোর আবার কি দরকার?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো কাইফেন।
“নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, যা যা ক্ষয়-ক্ষতি হলো তাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদেরকেই দায়ী করবে। আমাদের কাছেও তাই ওদের দাবীর বিপক্ষের প্রমাণ থাকা দরকার।”
কাইফেন এই মহিলার মানসিক ক্ষমতায় অবাক হয়ে গেলো। এরকম অসহ্য পরিস্থিতিতেও পরিষ্কার চিন্তা করে চলেছে।
“তবে আরো একটা ব্যাপার আছে।”
মিসেস ফয় এক কোনার কাঠের তৈরি একটা দেরাজ খুললো। ভারী দরজাটা খুলতেই কাইফেন বুঝলো ওটা আসলে একটা দেরাজ না। দরজার পেছনেই দেয়ালের মাঝে একটা না, চার চারটা সিন্দুক। সবগুলো লোহার তৈরি। বিশাল আকৃতির তালা ঝোলানো সেগুলোতে।
মিসেস ফয়-এর প্রতি কাইফেনের মুগ্ধতা আরো খানিকটা বাড়লো।
“এগুলো নিতে তো লোক লাগবে,” কাইফেন বললো।
“সাবধানে আনবেন। প্রতিটা সিন্দুকে স্বর্ণে এক হাজার পাউন্ড করে আছে।”
কাইফেন ভেবে পেলো না এই দুর্যোগ কি ওর জন্যে শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদে পরিণত হতে যাচ্ছে নাকি।
“আমাদেরকে তাড়াতাড়ি নৌকা ছাড়তে হবে,” মিসেস ফয় বললো। “তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরে যেতে না পারলে আটকা পড়ে যাবো।”
কাইফেন ততোক্ষণে টমের নির্দেশ ভুলে গিয়েছে। সত্যি কথা হচ্ছে, ওর ধারণা টম মারা পড়েছে নাহয় রানির লোকদের হাতে বন্দি হয়েছে। কিন্তু তবুও ও থমকে গেলো।
“নৌকা এমনিতেই কানায় কানায় ভরে আছে; আর আমরা যদি সবাই ওটায় উঠি তাহলে নিশ্চিত ডুবে যাবে।”
“সেটাই,” মিসেস ফয় বললো। “কে কে নৌকায় যাবে সেটা ঠিক করে ফেলুন। বাকিরা এখানে থেকে আমরা ত্রাণ নিয়ে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত, যতোটা সম্ভব দুর্গ রক্ষা করার চেষ্টা করবে।”
স্বর্ণ ভরা সিন্দুকগুলো গালিভাত-এ তোলার পরে নৌকাটা পানিতে এতো বেশি ডেবে গেলো যে কাইফেনের মনে হলো ওটায় আর একজনের পক্ষেও ওঠা সম্ভব হবে না। সব লোকজন পানির ধারে জড়ো হয়েছে। সবাই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। আলফ উইলসন আর তার লোকেরা এখনো ফেরেনি।
অ্যানা নৌকাটার দিকে তাকিয়ে আছে। “এসব কি বলছেন? আপনারা যা পারেন নিয়ে ভেগে গিয়ে আমাদেরকে এখানে রেখে যাবেন? টম আর ফ্রান্সিস কিন্তু এখনো বেঁচে থাকতে পারে।”
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি,” কাইফেন বললো। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের চেষ্টা করছে। কোমরে গোজা পিস্তলের ওজন ওকে বেশ সাহস দিচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে সম্ভবত ওটা আর ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। “মহিলা আর বাচ্চাদেরকে আমরা নৌকায় করে পাঠিয়ে দেবো। বাকিরা এখানে থেকে লড়াই করবে, আর কেউ যদি পালিয়ে আসতে পাড়ে তার জন্যে অপেক্ষা করবে।”
“খুবই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত,” মিসেস ফয় বললো।
“আলফ উইলসন আর ওর লোকেদের ফিরে আসা পর্যন্ত অন্তত অপেক্ষা করুন। টম আর ফ্রান্সিস সম্পর্কে যদি কিছু জানা যায়, অনুনয় করলো অ্যানা।
কাইফেন মিসেস ফয় এর সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলো।
“এতোক্ষণেও যেহেতু ওরা আসেনি, তার মানে নিশ্চিত মারা পড়েছে, মন্তব্য করলো মিসেস ফয়। আমাদেরও সেই অবস্থাই হবে যদি এখুনি না পালাই। মিস্টার কাইফেন কিন্তু আপনাকে যথেষ্ট সমাদর করেছেন, মিস দুয়ার্তে। আপনি এই কুঠির কেউ না; এবং আপনার উদ্দেশ্যও সম্ভবত ছিলো আমাদের ব্যবসার ক্ষতি করা। তবুও মিস্টার কাইফেন আপনাকে পালানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ধন্যবাদের বদলে তার কপালে শুধু দোষারোপ-ই জুটছে।”
অ্যাগনেস সামনে এগিয়ে এলো। “আমি যাবো। কিন্তু সারাহ খুব দুর্বল। ওকে নিয়ে আসার জন্যে লোক দরকার আমার।”
অ্যানা অ্যাগনেসের জামার হাতা টেনে ধরলো। “দাঁড়ান। এদের সাথে আপনি যাবেন মানে?”
“মিস্টার হিকস মারা গিয়েছেন, তিক্ত কণ্ঠে বললো অ্যাগনেস। এখানে থাকার আর কোনো কারণ নেই?”
“টম আর ফ্রন্সিস তত আছে।”
অ্যাগনেস ভোঁতা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। “টম আমার স্বামী না, সম্ভবত ও-ও মারা গিয়েছে। এখন আমার বলতে থাকলো শুধু আমার বোন সারাহ।”
অ্যানা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তখন খেয়াল হলো মিসেস ফয় অ্যাগনেসের পিছনে দাঁড়িয়ে কান পেতে ওদের কথা শুনছে। অ্যানার মনে হলো টমের আসল পরিচয়টা এখনো জানানো ঠিক হবে না। এতো বেশি নাটকীয়তার পর ও আসলে কল্পনাও করতে পারছে না যে ভাগ্য ওদেরকে এরপরে কোথায় নিয়ে যাবে।
অ্যাগনেস নৌকায় চড়ে বসলো। তিনজন লোক সারাহকে ধরে এনে নৌকার সামনের দিকে কাপড়ের গাঁটরিগুলোর গায়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো। একটা অতিরিক্ত পাল ওর গায়ের উপর দিয়ে দেওয়া হলো। বাকিদের মধ্য কাইফেন দুটো ছেলে আর আটজন পুরুষকে বাছাই করলো। ও যেহেতু নৌকা বাওয়ার জন্যে লোক খুঁজছে, তাই দেখা গেলো কেস্ট্রেল-এর থেকে যাওয়া নাবিকদেরকেই নির্বাচন করেছে। এদের মাঝে সবচে প্রবীণ লোকটা হচ্ছে একজন সারেং, নাম হেল। ও চোখে প্রশ্ন নিয়ে অ্যানার দিকে তাকালো।
