টম গুলি করে আবার দৌড় দিলো। আবার গুলি ভরার জন্যে পকেটে হাত দিলো কিন্তু ওটা শূন্য। ফ্রান্সিসকে দেখতে পেলো পাশে, একটা গাছের পাশে গুড়ি মেরে বসে আছে আর ওর সঙ্গী গুলি ভরছে বন্দুকে।
“তোমাদের কাছে আর গুলি আছে?”
“দুটো,” ফ্রান্সিস কাষ্ঠ হাসি হেসে বললো। “মিস করবেন না কথা দিলে একটা দিতে পারি।”
“তোমার ঋণ কোনোদিনও শোধ করতে পারবো না!” টমও হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
তখনও দুই কি তিন মাইলের বেশি ওরা পার হতে পারেনি। দিনের আলো আর বেশি বাকি নেই, আর সামনের রাস্তায় যে পরিমাণ কাদা, তাতে মনে হয় না ওরা শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। রানির ঘোড়া আছে। যদি অশ্বারোহী সৈন্যরা বের হয়, তাহলে রাত নামার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে।
“কাইফেনের জন্যে আরো কিছু সময় বের করতে হবে।”
একটা বিস্ফোরণে কেঁপে গেলো আশপাশ। এতো জোরে যে ধাক্কায় সামনের গাছের পাতায় জমে থাকা পানি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়লো ওদের গায়ে। টম ফিরে তাকালো, আশংকা করছে যে রানির সৈন্যরা হয়তো ওদের সেই বড় বন্দুকগুলো নিয়ে বের হয়েছে। কিন্তু ও কাউকে ধেয়ে আসতে দেখলো না। সাথে সাথে আবারও কানে তালা লাগানো শব্দ হলো আর একটা।
“বজ্রপাত!” টম আর ফ্রান্সিস দুজনেই খুশি হয়ে গেলো।
একটা বড়সড় বৃষ্টির ফোঁটা এসে টমের হাতের উল্টো পিঠে পড়লো। তারপর আর একটা, আরও একটা। একটু পরেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হলো। এতো জোরে বৃষ্টি পড়তে লাগলো যে এতো ঘন জঙ্গল ভেদ করেও নিচের মানুষজন ভিজে যেতে লাগলো। বৃষ্টির বেগের চোটে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো ওদের। সামনে কয়েক হাতের বেশি কিছুই যাচ্ছে না।
“ওরা এর মধ্যে আর আগাতে পারবে না, আমরাও অবশ্য কিছু করতে পারবো না,” টম খুশি হয়ে গেলো। “তবে ওদের গান পাউডার ভিজে হালুয়া হয়ে যাবে, আর এর মধ্যে পাথর ঘষেও আগুন জ্বালানো সম্ভব না।” ও হাতের অদরকারী বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলে সবাইকে জড়ো করলো। তারপর আবার পালানো শুরু করলো। বারবার কাদায় আছাড় খেয়ে পিছলে গেলো। কিন্তু থামলো না কোথাও। দুর্গে পৌঁছাতে হবে যে করেই হোক।
তবে রানির লোকজনও পুরোপুরি হাল ছেড়ে দেয়নি। টম যতোবারই থেমে পিছনের তাকালো, ততোবারই দেখলো বৃষ্টির মাঝেও কিছু আবছায়া এগিয়ে আসছে।
সকাল বেলা হনুমানের মন্দিরের পাশের যে সাঁকোটা পার হয়েছিলো সেটার কাছে এসে পৌঁছালো টমের দল। যাওয়ার সময় যতোটা দেখেছিল তার চাইতে এখন পানি আরো পাঁচ ফুট বেশি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চকলেট রঙের পানি সঁকোর বাশের নিচটা ছুঁই ছুঁই করছে প্রায়।
পিছনে ধাওয়াকারীরা এতো দ্রুত এগিয়ে আসছিলো যে টম চিন্তা ভাবনা ছাড়াই ওর দলটাকে সাঁকোর উপর তুলে দিচ্ছিলো প্রায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে ওর খেয়াল হলো কি সুবর্ণ সুযোগ ওর সামনে। ও ঘুরে নিজের বাঁকা ছোরাটা বের করলো।
সৈন্যগুলো একদম সাঁকোর গোড়ায় পৌঁছে দেখতে পেলো যে অন্য পাড়ে টম ছোরা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা থেমে গেলো, ভাবছে এটা কোনো ফাঁদ কিনা, কিন্তু ওদের প্রতিপক্ষের সংখ্যাটা নজরে আসতেই হাসি ফুটে উঠলো মুখে। ওরাও অস্ত্র বের করে সামনে বাড়লো।
সৈন্যগুলো সাঁকোর অর্ধেক আসার আগে টম এক চুলও নড়লো না। তারপর আচমকা নিজের ছুরিটা বের করে সাঁকোর গোড়ার নারিকেলের ছোবড়ার কাছি বরাবর পোচ দিলো। তিন পোচেই হয়ে গেলো কাজ। বন্দুকের গুলির মতো শব্দ করে কাছি আলগা হয়ে সাঁকোটা একদিকে কাত হয়ে গেলো। সাথে সাথে বুপ অরে নিচের পানিতে পড়ে গেলো পাঁচ ছয়জন ধাওয়াকারী, সাথে সাথেই স্রোত টেনে নিয়ে গেলো তাদেরকে। বাকিরা মরিয়া হয়ে সাঁকোর পাশের সঁড়ি চেপে ধরলো। কিন্তু ওদের পা ঠিকই পানিতে ডুবে গিয়েছে। টম বাকি যে দড়িটা ছিলো সেদিকে মনোযোগ দিলো এবার। ঝটপট কয়েকটা পোচ বসাতেই আলগা হয়ে গেলো সেটা-ও। যে কয়জন সাঁকো ধরে ঝুলে ছিলো তারাও পড়ে গেলো পানিতে। গায়ের বর্মের ওজনের কারণে ডুবে যেতে সময় লাগলো না মোটেও।
বাকি যেসব সৈন্য তখনও সাঁকোর কাছে এসে পৌঁছেনি তারা দূর থেকেই। তাদের সঙ্গীদের সলিল সমাধির ব্যাপারটা দেখতে পেলো। পানির ধারে এসে তারা আতংক আর বিভ্রান্তিতে পিছিয়ে গেলো কিছুটা।
ঠিক সেই মুহূর্তে কালো ঘোড়ায় চলে এক অশ্বারোহী পিছনের বন থেকে বেরিয়ে এলো। পানির ধারে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলো সে, তারপর পিঠ থেকে না নেমেই অপর পাড়ে দাঁড়ানো টম আর ওর সঙ্গীদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চোখাচোখি হতেই টমের চেহারা গম্ভীর হয়ে গেলো। এই সেই কামান চোর লোকটা। একটু আগে, এ-ই ইস্পাতের সাপ দিয়ে হিকসের মুণ্ডচ্ছেদ করেছে।
একদৃষ্টিতে ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো, আর নদীটাও এতো বেশি চওড়া না যে দুরত্বের কারণে ওদের প্রতিহিংসা কমে যাবে। অশ্বারোহী চোখ নামিয়ে পানির দিকে তাকালো। হিসেব করছে যে লাফ দেওয়ার একটা চেষ্টা করবে কি-না। তারপর ঘোড়া নিয়ে একদম পানির কিনারে এগিয়ে এলো।
“পালিয়ে কোথায় আর কতোদূর যাবি?” বললো লোকটা। “আমি তোকে ধরবোই।”
অবাক বিস্ময়ে টম খেয়াল করলো লোকটা ইংরেজিতে কথা বলছে। একটুও আটকাচ্ছে না, বা উচ্চারণে কোনো টানও নেই। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আর বেড়ে ওঠা এক লোকের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ।
