অসহায় চোখে টম দেখলো একটা অবয়ব এসে উপস্থিত হয়েছে হিকসের পেছনে। সৈকতে দেখা সেই লোকটাই! এই লোকটাই একটু আগে ওর দিকে গুলি ছুঁড়েছে। আর আবারও টমের সেই আজব অনুভূতিটা হতে লাগলো। যেনো এক অমোঘ নিয়তি আজ পূরণ হচ্ছে।
টমের দিকে তাকিয়েই লোকটা তার ডান হাতটা নাড়লো। ক্যাপ্টেন হিকসের গলার ইস্পাতের বেড়িটা আরো কিছুটা এঁটে বসলো। তারপর চামড়া, মাংস, শিরা-ধমনী ভেদ করে অবশেষে তার মেরুদণ্ডের হাড় আর সুষুম্না কাণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে গেলো ওটা।
ধড় থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে গেলো হিকসের মাথা। মাথাটা কাঁধ থেকে গড়িয়ে পড়ে যেতেই কাটা জায়গাটা থেকে তীর বেগে ঝর্নার মতো রক্ত বের হতে লাগলো। নিষ্প্রাণ দেহটা সামনের দিকে ঝুঁকে ছাদের কোনার আর একদিকে গিয়ে পড়লো। টম আর দেখতে পেলো না সেটাকে। খুনীটা আবারও কবজি মোচড় দিতেই ধাতব সাপটা কুণ্ডলী পাকিয়ে তার ডান হাতের ভিতর ঢুকে গেলো।
টম ওর বন্দুক তুকে তাক করে গুলি করলো, কিন্তু নিশান ভুল হয়ে গেলো। খুনী ওর দিকে চেয়ে হো হো করে হাসতে লাগলো। ঠিক সেই মুহূর্তে টম ওর বৈশিষ্ট্যগুলো ধরতে পারলো। ওর হাসির মধ্যে মিশ্রিত ঘৃণার সুরটাও চিনে ফেললো ও। এই লোকটা হচ্ছে ওর ভাই গাই কোর্টনীর একটা প্রতিচ্ছবি। মানে বিশ বছর আগে ওদের যখন শেষ দেখা হয়, গাই তখন এরকমই ছিলো।
কবজির আর একটা মোচড়ে খুনীটা আবার ওর হাতের রুপালি ইস্পাতের সাপটা টমের দিকে ছুঁড়ে দিলো। ওটা বাতাসে শিষ বাজিয়ে কুণ্ডলী খুলে ছুটে এলো টমের দিকে। কিন্তু পুরোটা খোলার পরও টমের কাছে পৌঁছালো না। মুখের এক ফুট দূরে এসে থেমে গেলো। শিউরে উঠে খানকটা পিছিয়ে গেলো টম।
আবার যখন মুখ তুলে তাকালো, দেখতে পেলো খুনীটা নেই। তবে টম জানে যে ও কোনদিকে একে ভুলতে পারবে না।
মহলের দরজারে দিক থেকে সম্মিলিত চিৎকার ভেসে এলো। একদল কমলা কোমরবন্ধ পরা সৈন্য ধেয়ে এলো ওদের দিকে। তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হত্ৰ দৌড় দিলো টম। কানে খুনীর হাসিটা বাজছে।
মহলের দেয়ালের উপর দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস আর বাকি সিপাহীরা টমকে তাড়া দিতে লাগলো। কাছে পৌঁছাতেই টমকে টেনে তুললো ওরা। সাথে সাথেই কয়েকটা মাস্কেটের গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো। একটু আগে যেখানে টম ছিলো সেই বরাবর দেয়ালের প্লাস্টার আর ইট ভেঙে ছড়িয়ে গেলো চারপাশে।
ওরা সবাই দেয়ালের উপর কিন্তু নিরাপদ জায়গা থেক এখনো অনেক দূরে।
জোর করে হিকসের চেহারাটা মাথা থেকে সরিয়ে টম দ্রুত ওরা কয়জন সেটা গুনে নিলো। ফ্রান্সিস, হাবিলদার, পাঁচজন সিপাহী আর সেই যুবক ব্যাপারি। ছেলেটা এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে চেয়ে নিজের জামার বোতাম ধরে টানাটানি করছে। ওদের কাছে আছে মাত্র চারটা মাস্কেট।
“গুলি আর পাউডার কেমন আছে?”
“কয়েকটা মাত্র। আর এক কৌটা পাউডার।” ব্রিটিশ সেনাবাহিনির মতো, ভারতীয় দলগুলো এখনো গোল কান্ট্রিজ ব্যবহার শুরু করেনি। ওগুলোতে একটা কাগজের মোড়কের ভিতর গুলি আর সঠিক পরিমাণ পাউডার একসাথে ভরা থাকে।
দেয়ালের শেষ প্রান্ত থেকে রানির সেনাবাহিনির এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া গেলো। সদর দরজা খোলা রু হয়েছে। টম ব্যাপারি ছেলেটার কাধ ধরে দাঁড়। করালো।
“আমার দিকে তাকাও,” টম ঝাঁকি দিলো ওকে। “তাকাও আমার দিকে। নাম কি তোমার?”
“কা… কাইফেন, স্যার,” তোতলাতে তোতলাতে বললো ও।
“দৌড়াতে পারবে?”
কাইফেন মাথা ঝাঁকালো।
“তাহলে যতো জোরে পারো দৌড়ে কুঠিতে ফিরে যাও। ওদেরকে বলবে…” কি বলবে ভেবে পেলো না টম। ওরা আসার সময় যে কয়জনকে রেখে এসেছিলো তাদের কথা মনে পড়লো ওর; কয়েকজন মাত্র পুরুষ, মহিলা আর বাচ্চারা। কিভাবে ও এদেরকে নিয়ে দুর্গ রক্ষা করবে?
কিন্তু আর কি-ইবা করার আছে? ওদের একটা মাত্র ছোট নৌকা আছে, আর এই ঝড়ের মৌসুমে এই প্রমত্তা সাগরে ওটার উপর ভরসা করা হবে বড়সড় বোকামি। অন্যদিকে দুর্গের দেয়ালটা যথেষ্ট পুরু আর শক্ত। কেস্ট্রেল এর কামানগুলো উদ্ধার করতে পারলেও রানির সৈন্যদের কাছে খুব বেশি গোলাবারুদ নেই। তার মানে ওরা অবরোধ করে খুব বেশি সময় আটকে রাখতে পারবে না। সেই সাথে ভাগ্য যদি সহায়তা করে আর ঠিকঠাক কৌশল খাটানো যায়, তাহলে পাশার দান উল্টেও যেতে পারে। মাদ্রাজ থেকে সৈন্যদল এসে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব বলেই মনে হয়।
কাইফেন তখনও আদেশের অপেক্ষায় বসে। টম ওর আদেশের গুরুত্ব বুঝতে পারলো। ওর সিদ্ধান্তের উপরেই অনেকগুলো মানুষের জীবন নির্ভর করছে।
“ওদেরকে অবরোধের জন্যে প্রস্তুতি নিতে বলবে। আমরা রানির সৈন্যদেরকে যতোক্ষণ পারি আটকে রাখছি।”
কাইফেন এমনভাবে দৌড় দিলো যেনো ওর পায়ে আগুন ধরে গিয়েছে। বাকিরা গাছের আড়ালে গিয়ে লুকালো। টম ওদেরকে তিন জোড়ায় ভাগ করে দিয়েছে। প্রতি জোড়ায় একটা করে বন্দুক। আর একটা বন্দুক রাখলো নিজের কাছে।
“একজন একজন করে গুলি করবে,” আদেশ দিলো ও। “এক দল গুলি করার পর পরের দল গুলি করবে। তৃতীয় দল গুলি করতে করতে অন্য দল গুলি ভরে ফেলবে আবার। আর চেষ্টা করবে অফিসারগুলোকে তাক করতে। ওদের বিশৃঙ্খলা আর প্রশিক্ষণের অভাবই আমাদের একমাত্র ভরসা।”
*
এখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার চাইতে ফিরে গিয়ে কি করবে, সেই চিন্তাতেই টম আতংকে অবশ হয়ে যাচ্ছিলো। ওর নিজের জন্যে না। সারাহ আর অ্যাগনেসের জন্যে। ওরা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে ওদের ভাগ্যে কি ঘটবে সেটা ভেবে। ওরা দৌড়াতেই থাকলো, দৌড়াতেই থাকলো। মাঝে মাঝে থেমে গুলি করলো বা বন্দুকে গুলি ভরলো। কখনোই খুব বেশি জোরে দৌড়াতে পারছিলো না, নিজেদের ক্রমেই শেষ হয়ে আসতে থাকা গোলা বারুদ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। আর পিছনে রানির সৈন্যদল কুকুরের মতো তাড়া করলো ওদের।
