টুঙ্গার মুচড়ে সরে গেলো। টমের ছুরি ওর বর্মে আঘাত করে আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে পিছলে তো গেলোই, সেই সাথে টমের হাত থেকে ফসকে আর একদিকে ছুটে গেলো। মরিয়া হয়ে টম টুঙ্গারের কবজি চেপে ধরে মেঝেতে পেড়ে ফেললো। তারপর দুজনেই মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। টম ওর বুট পরা দুটো পা-ই টুঙ্গারের বুকের উপর তুলে দিয়ে ওকে চেপে ধরে রেখে ওর ছুরিটার জন্যে হাতড়াতে লাগলো, কিন্তু ওটা তখনও কয়েক ফুট দূরে পড়ে আছে। ও হাত বাড়িয়ে ছুরিটার হাতল নাগালে পেতেই টান দিলো। কিন্তু বেশি তাড়াহুড়া করে ফেলায় ছুরিটার ফলা গেলো বাঘটার খিঁচিয়ে থাকা দাঁতের ফাঁকে আটকে। টম আবার টান দিলো কিন্তু ছুটলো না।
টমের অবস্থা দেখে টুঙ্গার আবার উঠে দাঁড়িয়ে নেপচুন তরবারিটা উঁচিয়ে ধরলো। আবারও ও ডগার বদলে ফলা ব্যবহার করছে। মালায়ালাম ভাষায় কয়েকটা অশ্রাব্য গালি দিলো ও। অর্থ না বুঝলেও ভাবার্থ ঠিকই বুঝলো টম।
সমস্ত শক্তি দিয়ে তরবারিটা সোজা নামিয়ে আনলো টুঙ্গার। টম ওর বুট পরা পা চালালো। সেটা গিয়ে লাগলো টুঙ্গারের হাঁটুর মালাই চাকিতে। ওর গালিগালাজ আচমকা আর্তনাদের আড়ালে চাপা পড়ে গেলো। হিস করে বাতাস কেটে টমের মাথার পাশ দিয়ে সরে গেলো তরবারিটা। কিন্তু যতো ব্যথাই পাক না কেন, টুঙ্গার তরবারির হাতলটা ছাড়েনি। ও টলতে টলতে আবারও উঠে দাঁড়ালো। ব্যথা পাওয়া পা-টা খোঁড়াচ্ছে। টম-ও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওর দিকে ছুটে গেলো।
আরো একবার টুঙ্গারকে চেপে ধরলো ও। তবে এবার পেছন থেক বগলের নিচ দিয়ে। যাতে করে টুঙ্গার তরবারির ফলাটা এদিকে ঘোরাতে না পারে। টম ওকে ঠেলে চত্বরের উপরের ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে এলো। ভাঙা মালাই চাকের কারণে টুঙ্গার বাধা দিতে পারলো না। টম ওকে কাঠের রেলিং-এর গায়ে নিয়ে ঠেসে ধরলো। চেষ্টা করছে ওকে নেপচুন তরবারিটা ফেলে দিতে বাধ্য করতে।
কিন্তু এরকম দুজন বলশালী লোকের ধ্বস্তাধস্তির অভিঘাত নেওয়ার মতো সামর্থ্য কাঠের রেলিংটার ছিলো না। হয়তো যুদ্ধের সময়ের গোলাগুলিতে ওটা দুর্বল হয়ে গিয়ে হোক বা টমের ধাক্কার জোরে হোক, রেলিংটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো। টুঙ্গার ভাঙা জায়গাটা দিয়ে নিচে পড়ে গেলো। এক মুহূর্ত মনে হলো ও দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে কিনারে ঝুলে আছে বোধহয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই ঝপ করে নিচে পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেলো।
জড়তার কারণে টমও প্রায় পড়েই গিয়েছিলো, কিন্তু একটা শক্ত হাত ওর ঘাড়ে কাপড় ধরে টান দিয়ে ওকে কিনার থেক সরিয়ে নিয়ে এলো।
টম ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নিলো, তারপর পিছনে ফিরলো। হিকস দাঁড়িয়ে আছে পিছনে, কাঁধে একটা মাস্কেট। কিন্তু টম ওকে কিছু না বলে রেলিং-এর ভাঙা জায়গাটা দিয়ে নিচে উঁকি দিলো।
একগাদা লাশের উপর পড়ে আছে টুঙ্গার। ডান হাতটা একটা ভাঙা ডানার মতো একদিকে বেঁকে আছে। কিন্তু তখনও হাতের মুঠিতে নেপচুন তরবারিটা ধরা। পতনের ফলে তরবারিটার কোনো ক্ষতি হয়নি, অক্ষতই আছে।
টম হিসেবি চোখে উচ্চতাটা মেপে দেখলো, তারপর সোজা হয়ে লাফ দেওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ালো। কিন্তু হিকস ওকে ধরে ফেললো আবার। “বোকামি কোরো না, টম! তোমার হাত পা সৰ ছাতু হয়ে যাবে। ঘাড়টাও মটকাতে পারে। একটা তরবারিই তো, হলি গ্রেইল তো আর না।” ওরা আরো কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করলো।
কিন্তু এতোক্ষণ যারা এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা লাশগুলো থেকে জিনিসপত্র লুট করছিলো তারা টুঙ্গারের কাছে ছুটে এলো। কয়েকজন উপরে তাকিয়ে ব্যালকনিতে ওদের দুজনকে দেখতে পেয়ে চিৎকার জুড়ে দিলো। একই সাথে পিস্তল বের করে তাক করলো ওদের দিকে।
তা দেখে টম জোর খাটানো বন্ধ করে দিতেই হিকস ওকে টেনে আবার দরবার কক্ষে টেনে নিয়ে এলো।
“আমি আপনাকে ফিরে আসতে নিষেধ করেছিলাম,” রাগ ঝাড়লো টম।
“এসেই যখন গিয়েছি, কি আর করা,” শুষ্ক কণ্ঠে হিকস বললো। “তবে এখন মনে হয় আমাদের বাড়ির দিকে পালানোর চেষ্টা করাই ভালো। রানি আর তার সৈন্যদল আমাদেরকে ধাওয়া করার আগেই।” টম বুঝতে পারল ও আসলে ওর নিজেদের লোকেরই জীবনবিপন্ন করে দিচ্ছিলো। এবার আর হিকসের কথা অমান্য করলো না ও।
আবার হিকস টমকে নিয়ে শিক বসানো জানালাওয়ালা একটা ঘরে এলো। একটা শিক খুলে ফেলা হয়েছে। ওটার পরেই একটা বাইরের ভবনের ইটের ছাদ দেখা যাচ্ছে। হিকস টমকে সেদিকে দিয়ে ঠেলে দিলো আগে, তারপর নিজেও লাফ দিলো সেদিক দিয়ে। ছাদের কিনারা ধরে দৌড়ে ওরা শেষ মাথায় চলে এলো। ওখান থেকে মহলের দেয়ালটা পার হলেই ভোলা প্রান্তর। ফ্রান্সিস আর বাকিরা ওখানে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে।
লাফ দেওয়াটা ছিলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। টম একদম নিচু হয়ে তারপর সব শক্তি এক করে দিলো লাফ। কাদায় ভরা একটা নরম জায়গায় গিয়ে পড়লো ও। তারপর হিকসকে ইশারা করলো লাফ দেওয়ার জন্যে। হিকস নিজের মাস্কেটটা টমের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো।
কিন্তু আচমকা বাতাস ফুড়ে যেনো একটা ইস্পাতের সাপ উড়ে এসে হিকসের গোলা পেঁচিয়ে ধরলো। হিকস দুই হাতে ধরে ওটা খোলার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। আরো জোরে ওর গলায় এটে বসলো ওটা; থাকতে না পেরে পিছনে উল্টে বসে পড়লো। চেহারা ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে। চিৎকার করার জন্যে মুখ খুললো কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। ইস্পাতের বেড়িটা ধরে কেউ টান দিলো। টানে চিত হয়ে পড়ে যেতে গেলো হিকস। সাথে সাথেই দেখা গেলো গলা জুড়ে একটা একটা লাল রেখা আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে।
