কিন্তু সে উধাও হয়ে গিয়েছে।
“তাড়াতাড়ি,” ডাকলো হিকস। টম ঘুরে ওর পিছু নিতে গেলো-কিন্তু সাথে সাথে হিকস মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় একটুর জন্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়া থেকে বেঁচে গেলো।
“সৈন্য,” সাবধান করলো হিকস। অর্ধ ডজন সোনার কাজ করা শিরস্ত্রাণ পরা প্রহরী এগিয়ে আসছে এদিকে। আর ওদের মাঝখানে আছে টুঙ্গার। এখন ওর মাথায় কিছু নেই, ফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাটা দাগটা। নেপচুন তরবারিটা ওর হাতে; হাতলের নীলাটা আলো পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে। টম, হিকসের দেওয়া ছুরিটা হাতে তুলে নিলো।
সৈন্যরা হাঁটু মুড়ে বসে ওদের দিকে মাস্কেট তাক করলো। ওদের লম্বা নলের মাস্কেটগুলো চালানো বেশ কষ্টকর। এতো ভারী যে নলের মাথায় তেপায়া লাগিয়ে নিতে হয়েছে। কোনো বদ্ধ জায়গায়, লড়াইয়ের উপযুক্ত না এগুলো। টম আর বাকিরা বারান্দার দেয়ালের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। গুলিগুলো ওদের কোনো ক্ষতি না করেই ছুটে গেলো পাশ দিয়ে। কিন্তু আবার গুলি ভরার আগেই টম আর বাকিরা আক্রমণ করলো।
মাস্কেট ফেলে তরবারির দিকে হাত বাড়ালো সৈন্যরা, কিন্তু তার আগেই সিপাহীরা ওদের কাছে পৌঁছে গেল। বিন্দুমাত্র দয়া দেখালো না কেউ। ওরা ওদেরকে বেয়নেটে বিদ্ধ করলো, নয়তো বন্দুকের বাট দিয়ে পিটিয়ে ছাতু বানালো। টুঙ্গারের টমের মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই। উল্টো ঘুরে পালিয়ে গেলো ও। বাকি সৈন্যরাও গেল সাথে।
“এই মরণ ফাঁদ থেকে বের হওয়ার এটাই সুযোগ!” চেঁচিয়ে বললো হিকস। একটা খোলা জানালার দিকে ইংগিত করছে ও। ইট বসানো ছাদে নামা যায় ওটা দিয়ে। এদিক দিয়ে বের হওয়া যাবে।”
কিন্তু টম জানে যে ও নেপচুন তরবারিটা ছাড়া এখান থেকে যেতে পারবে না। ওটার টান সাইরেনের সঙ্গীতের মতো আবার ওর মাথার ভিতর বাজতে লাগলো।
“আপনারা আগান। আমি আসছি।”
হিকসের প্রতিবাদের জন্যে অপেক্ষা না করে টম টুঙ্গারের পিছে ধাওয়া করলো। প্রথম মোড়টা ঘুরতেই এক আতংকিত কাজের মেয়েকে প্রায় খুন। করেই ফেলেছিলো। মেয়েটা ভয় পেয়ে দৌড়ে আসছিলো এদিকে। টম, মেয়েটাকে একদিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো। একটা ছোট করিডোর আর কয়েকটা খোলা পিতলের দরজা পেরিয়ে এলো ও।
টম থেমে আশেপাশে খুঁজতে লাগলো। বিশাল একটা ঘরে চলে এসেছে, এতো বড় ঘর ও এর আগে কখনো দেখেনি। দামি পর্দা ঝুলছে জানালায়, এক প্রান্তে একটা বেদির উপর স্বর্ণখচিত মেহগনি কাঠের একটা সিংহাসন দেখা যাচ্ছে; ওটার দুই দিকে দুটো ব্যালকনির দরজা। ওখানে লুকিয়েই আততায়ীরা গণহত্যা চালিয়েছে। সিংহাসনের সামনে একটা বাঘের ছাল বিধানো; মাথাটা সোজা করে রাখা, যেনো নীরব গর্জনে ফেটে পড়ছে।
টম একটা ব্যালকনি পরীক্ষা করে দেখলো, কিন্তু সেটা খালি। অন্য দরজাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু তখনি পিছনে কাঠের মেঝেটা ক্যাচকোচ করে উঠলো। সাই করে ঘুরে গেল টম। ঘুরেই দেখে টুঙ্গার সিংহাসনের পেছন থেকে নেপচুন তরবারিটা হাতে ছুটে আসছে ওর দিকে। টমও ওর ছুরিটা বাগিয়ে সময় মতো সরে গেল। একটুর জন্য তরবারির আঘাত লাগলো না গায়ে। প্রতি আক্রমণ করতে গেল টম, কিন্তু আগে কখনো এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার না করায়, ঠিকমতো আক্রমণ করতে পারলো না। ফলে টুঙ্গার আবার পিছিয়ে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
টম, টুঙ্গারের হাতের তরবারিটা দিয়ে জীবনে অসংখ্য লড়াই করেছে। কিন্তু আজ ও তরবারির বিপরীত পার্শ্বে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওটা হাতে থাকায় সারাজীবন কতোটা সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু এখন ঐ নিষ্ঠুর ফলাটা ওর দিকেই তাক করা। ওটার চকচকে অশুভ ফলাটার সামনে টমের সাহস টলে গেলো। খানিকটা।
টুঙ্গার দ্রুত হাতে টমের দিকে কয়েকটা কোপ বসালো। টম মরতে মরতে বেঁচে গেলো বলা যায়। টুঙ্গারের চাপে আবার ব্যালকনির দরজার কাছে পিছিয়ে গেলো ও। হারানো সাহস আবার ফিরে এলো ওর। খুব সাবধানে খেয়াল করতে লাগলো টুঙ্গারের নাড়াচাড়া।
ও তরবারির ডগার চাইতে ধার দিয়ে মারতে পছন্দ করে। টম জানে যে এই জ্ঞানটা কাজে লাগবে ওর।
টম এক পাশে সরে গেলো, চেষ্টা করছে টুঙ্গারকে ওর বাম হাতের দিকে নিয়ে আসতে। টুঙ্গার সেটা ধরতে পেরে ওকে আবার পিছনের দিকে ঠেলে দিলো। টুঙ্গার চেষ্টা করছে টমকে ব্যালকনির রেলিং-এর কাছে ঠেলে দিতে, যাতে ও নিচে দাঁড়ানো কারো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। টম চরকি কেটে ঘুরে গিয়ে আবার ঘরের মাঝে চলে এলো। তাতে অল্পই সুবিধা হলো ওর। টমের মনে হচ্ছে সীসা নির্মিত কোনো তরবারি দিয়ে লড়াই করছে। প্রতিটা আঘাত টলে যাচ্ছে, নয়তো নির্দিষ্ট সময়ের চাইতে সামান্য হলেও পরে হচ্ছে। হয়তো সেকেন্ডের ভগ্নাংশ, কিন্তু মোট যোগ করলে বেড়ে যাচ্ছিলো অনেক।
টম বাম দিকে আক্রমণের ভাব করলো, তাতে করে খুব ছোট একটু ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হলো। কিন্তু টুঙ্গারও সেটা ধরে ফেললো সাথে সাথে। এই পরিস্থিতিতে তরবারির ডগা দিয়ে খোঁচা মারাটাই স্বাভাবিক ছিলো, কিন্তু প্রবৃত্তি বশত ও কোপ মারতে গেলো। ঠিক টম যেরকমটা ভেবেছিলো, সেই মতো টুঙ্গার হাত উঁচু করলো কোপ দেবে বলে। কিন্তু তরবারিটা নেমে আসার আগেই টম ঝাঁপ দিলো সামনে। ওর সমস্ত ওজন এক করে ধাক্কাটা দিলো ও, যাতে টুঙ্গারের বর্মটা ভেদ করতে পারে।
