টম হামাগুড়ি দিয়ে নিচু একটা দেয়াল পার হয়ে খিলানে ঘেরা জায়গাটায় এসে পৌঁছালো। কামানগুলো এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমবার গোলা ছোঁড়ার পর এখন আর ওগুলোর কাছে কেউ নেই। ওগুলোর পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার সময় নলের উপরের জোড়া তরবারির ছাপগুলো নজরে এলো টমের। যে ঢালাইখানায় ওগুলো বানানো হয়েছিলো সেটার প্রতীক। ও চিনলো ছাপটা, যা আশংকা করেছিলো তাই। এটা কেস্ট্রেল-এর একটা কামান। উদ্ধার করে, পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন ওগুলো টম আর ওর বন্ধুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। সব দেখে ও রাগে কাঁপতে লাগলো।
কিন্তু এখন এসব নিয়ে কিছু করার সময় নেই। রানির প্রহরীরা আবার জড়ো হচ্ছে। ওর সামনে একটা দরজা খুলে গেলো, কিন্তু সেটা যে কোথায় গিয়েছে সেই চিন্তা ভাবনা না করেই টম ঢুকে গেলো সেদিক দিয়ে। দৌড়াতে দৌড়াতে করিডোর ধরে কয়েকটা খোলা ঘরের পাশ কাটিয়ে এলো ও। তারপরেই গাছপালা আর কৃত্রিম ঝর্ণায় ভরা একটা বাগানে এসে উপস্থিত হলো। বাগানটার উপরে অনেকগুলো বন্ধ জানালা। এক কোনায় সিঁড়ি দেখা গেলো। ওটা দিয়ে প্রাসাদের উপরের তলায় যাওয়া যাবে।
পিছু পিছু আসা লোকগুলোর সংখ্যা গুনে নিলো টম। ফ্রান্সিস আছে, সাথে একটা যুবক সওদাগর। ফয়-এর সহকারীদের একজনকে দেখা গেলো। যুবক ছেলেটা বাচ্চাদের মতো চোখের পানি নাকের পানি এক করে ফেলেছে। জামায় অন্য কারো রক্ত মাখা। টম হিকসকে ফেলে এসেছে কোথাও। তবে হাবিলদার আর ছয়জন সেপাই এসেছে। এর মধ্যে চারজনের হাতে মাস্কেট আছে।
পিছনে ত্বরিত পদক্ষেপ শোনা গেলো। টম ওর তরবারিটা উঁচু করে ধরলো। হিকস ছুটে এলো করিডোর ধরে। পিছনে খঞ্জর হাতে ধাওয়া করছে এক সৈন্য। হিকস ঘুরে গিয়ে সোজা সৈন্যটার বুক বরাবর গুলি করলো। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলো সৈন্যটা। আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার আগেই ফ্রান্সিস বুদ্ধি করে সামনে এগিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিলো তাকে।
“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আপনি ঠিক আছেন,” টম বললো। “আপনাকে আস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরিয়ে নিতে না পারলে আমার শ্যালিকা জীবনেও আমাকে ক্ষমা করতো না।”
“আমার শ্যালিকাও কিন্তু আমাকে ছাড়বে না,” পিস্তলে গুলি ভরতে ভরতে বললো হিকস। “শালা গাধার বাচ্চা, ফয়।”
“কোথায় সে?”
“শেষ দেখছি ও ঐ কুত্তী রানিটার সাথে হে হে করে হাত মেলাচ্ছে।”
“সম্ভবত মারা পড়েছে এতোক্ষণে।” কিন্তু কেউই ফিরে গিয়ে ওকে উদ্ধারে আগ্রহ দেখালো না।
ফ্রান্সিস দ্রুত বাগানটা এক পাক ঘুরে এসেছে। ও গোমড়া মুখে হিকসের কাছে ছুটে এলো।
“বের হওয়ার কোনো দরজা নেই। আমরা আটকা পড়েছি এখানে।”
যেনো ওর কথা প্রমাণ করতেই করিডোরের মাথায় চিৎকার শোনা গেলো।
“এখান থেকে পালাতে হবে,” বললো হিকস। “আমার পিছু পিছু আসো।”
হিকস সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলো। এরকম গুরুতর পরিস্থিতিতেও বিন্দুমাত্র আতংকিত হচ্ছে না। এমন ঠাণ্ডা মাথা দেখে টম আলাদা একটা সম্মান বোধ করলো ওর প্রতি। অ্যাগনেস নিজের জন্যে ঠিক মানুষটাই বেছে নিয়েছে।
ওরা সিঁড়ির শেষ বাকটা ঘুরতেই একটা বারান্দায় উঠে এলো। খোলা দরজা দিয়ে টম দেখতে পেলো সবগুলো ঘরই দামি আসবাবপত্রে ভরা। ওরা দৌড়ে চললো। কোনোদিকে যাচ্ছে ঠিক নেই। এখন গতিই আসল ব্যাপার, থেমে ভাবনা চিন্তার সময় নেই। পিছনের ধাওয়াকারী দলটা ওদেরকে না ধরতে পারলেই হবে।
আর একটা ঘরে ঢুকতেই নিচের লড়াইয়ের শব্দ আবার শোনা যেতে লাগলো। টম গালাগাল করে উঠলো। এতো কষ্টের পরে আবার সেই বটতলাতেই ফিরে এসেছে চত্বরের উপরের বারান্দায়। কাঠের কপাটের ফাঁক দিয়ে ধোয়া ঢুকছে ঘরে। নিচে তাকিয়ে টম গণহত্যার ভয়াবহতাটা একসাথে দেখতে পেলো। পুরো জায়গাটা জুড়ে শুধু লাশ আর লাশ। কয়েক জায়গায় স্তূপ হয়ে আছে; দেয়ালে আর পাথরের উপর রক্ত জমে পুকুরের সৃষ্টি হয়েছে। ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সব জায়গায়।
আর এই তাণ্ডবের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিন সৈকতে দেখা সেই লোকটা। কেস্ট্রেল-এর জিনিসপত্র উদ্ধার করছিলো যে। টম যেদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেদিক থেকে লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তবুও টম শুধু ওর দৈহিক গঠন দেখেই এক নিমিষেই চিনে ফেলেছে। এতে লাশের মাঝেও শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, আর সৈন্যদের দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। তখনও যারা বেঁচে আছে তাদেরকে যমের দুয়ারে পাঠাচ্ছে এরা। এই লোকটাই টমের কামান চুরি করে টমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে।
টম পিস্তল তুললো। কিন্তু জানালার ঝাজরির ছিদ্রগুলো এতো ছোট যে এর ভিতর দিয়ে গুলি করা সম্ভব না। তারপর সম্ভবত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের তাড়নাতেই, লোকটা এদিকে ঘুরে টমের দিকে তাকিয়ে রইলো। যদিও টম ওর কাছে পর্দার আড়ালের একটা অবয়ব হিসেবে ধরা দিচ্ছে শুধু। আবারও টমের মনে হলো যেনো ও নিজের প্রেতাত্মার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। লোকটা একজন প্রহরীকে কিছু একটা নির্দেশ দিলো। প্রহরী ওর হাতে একটা বন্দুক ধরিয়ে দিলো। তারপর হ্যাঁমার টেন টমের দিকে তাক করলো সে।
সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেললো টম। সামনের পর্দাটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। টম সদ্য সৃষ্ট ছিদ্রটা দিয়ে নিজের পিস্তলের নলটা ঢুকিয়ে লোকটাকে খুঁজতে লাগলো।
