এক মুহূর্তে চত্বরটা একটা কসাইখানায় পরিণত হলো। শুধু যারা পেছনে ছিলো তারা বেঁচে গেলো, কারণ সামনের লোকগুলোর শরীর ওদের জন্যে ঢালের কাজ করেছে। যারা সরাসরি সামনে পড়েছে তাদেরকে আর মানুষ বলে চেনা যাচ্ছে না। আহতদের আর্তনাদ আর সাথে বাকিদের চিৎকার চেঁচামেচিতে নরক গুলজার হয়ে গেলো জায়গাটায়। সৈন্যদের মাস্কেট সব রানিকে অভিবাদন জানাতে গিয়ে খালি হয়ে গিয়েছে। ওরা কি করবে বুঝে না পেয়ে যারা জীবিত আছে তাদেরকে একসাথে জড়ো করতে লাগলো। কিন্তু তখনি চতুরের চারিধারের ব্যালকনিগুলো থেকে লুকানো আততায়ীরা গুলি ছুঁড়তে লাগলো। উদ্ৰান্ত সেপাহীরা টপাটপ পড়ে যেতে লাগলো তাতে। বল্লমধারী পাহারাদারেরা আক্রমণ চালালো এবার। কামানের লোকেরাও তাদের তরবারি তুলে নিয়ে যোগ দিলো ওদের সাথে।
এই তুমুল হট্টগোলের মাঝেই কোথাও আছে ফ্রান্সিস। টম ওকে দেখতে পাচ্ছে না। তবে ও নিশ্চিত রানির ব্যালকনির নিচে মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। যে লোকগুলো তাদের মাঝে ও আছে। আততায়ীর গুলি ওখানে পৌঁছাবে না। টম, হিকস আর ওর মোচওয়াল হাবিলদারকে দেখতে পেলো। বেঁচে থাকা সিপাহীরা ওদের চারপাশ ঘিরে একটা চক্র তৈরি করেছে। মরিয়া হয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করছে সবাই। কিন্তু রানিকে স্যালুট দিতে গিয়ে ওরা অস্ত্র খালি করে ফেলেছে। আর ওদের অতিরিক্ত পুলি আর পাউডার রয়ে গিয়েছে দরজার বাইরে-যেসব কুলিকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাদের কাছে। কয়েকজন অবশ্য বেয়নেট জুড়ে নিতে পেরেছে; আর বাকিরা তাদের বন্দুকটা মুগুরের মতো ব্যবহার করছে।
টম নিজের তরবারি বের করলো। যুদ্ধ শুরুর উত্তেজনায় টম যে দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে সেটা কেউ খেয়াল করেনি। বর্ম আর দীর্ঘ শিরস্ত্রাণের কারণে রানির সৈন্যদের গলা আর পিঠ সুরক্ষিত থাকছে। কিন্তু ওদের পা পুরো অরক্ষিত। টম একজনের হ্যামস্ট্রিং পেশি দুই ভাগ করে দিলো। লোকটা পড়ে যেতেই টম তার শিরস্ত্রাণটা খুলে নিয়ে নিজের মাথায় গলিয়ে নিলো। তারপর তার পরে থাকা বল্লমটা তুলে নিয়ে ক্ষ্যাপা শুয়োরের মতো পাশের আর একজনকে আক্রমণ করলো।
লোকটা চেঁচিয়ে উঠতেই, সবার দৃষ্টি ঘুরে গেলো টমের দিকে। একজন দৌড়ে এলো ওর দিকে, হাতে খোলা তরবারি। টম প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই লোকটা পিঠে গুলি খেয়ে হাঁটু মুড়ে পড়ে গেলো। পিঠের ক্ষত থেকে ফোয়ারার মতো রক্ত বের হচ্ছে। উল্টোপাশের একটা ব্যালকনিতে, ধোয়ার আড়ালে একজন আততায়ীকে দেখতে পেলো টম। গুলিটা আসলে ওকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছিলো।
সেই মুহূর্তেই ফ্রান্সিসকে চোখে পড়লো ওর। ব্যালকনির নিচে যারা প্রতিরোধ গড়েছে তাদের মধ্যে সামনের সারিতেই আছে। টম ওর দিকে এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে সামনে যাকেই পেলো তাকে বল্লমের আঘাতে শুইয়ে দিতে লাগলো। একজন কুড়াল হাতে আক্রমণ করলো ওকে, মাথা নিচু করে এড়ালো আঘাতটা। তারপর বল্লমের খোঁচায় তার ভুড়ি ফাঁসিয়ে দিলো। ব্যালকনির নিচে পৌঁছে গেলো টম। রানির একজন প্রহরী চক্রটা ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলো প্রায়। হিকস এগিয়ে এসে হাতের পিস্তলটা খালি করলো তার চেহারা বরাবর।
“এখানে থাকা যাবে না,” চেঁচিয়ে বললো টম। আক্ষরিক অর্থেই দেয়ালে পিঠ ঠেকা এখন ওদের। লড়াই করার মতো বন্দুক, বা জনবল কোনটাই নেই। কিছুক্ষণের মাঝেই যারা বেঁচে আছে তারাও কচুকাটা হবে। এখন উপায় একটাই যেভাবেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে কোম্পানির কুঠিতে পালিয়ে যাওয়া।
“আপনাকে যে পিস্তলগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলো আছে?” হিকস জানতে চাইলো।
টম মাথা ঝাঁকালো। ও একটা বের করে কক করলো। হিকস হাতেরটায় গুলি ভরলো আবার।
“আমার সাথে সাথে… এখন।”
সবাই একসাথে গুলি ছুড়লো ওরা, ওদেরকে ঘিরে থাকা সৈন্যগুলোর মাঝে একটু জায়গা ফাঁকা হলো তাতে। আক্রমণকারীরা পিছু হটলো। টম ওর তরবারি বাগিয়ে আক্রমণ করলো। হিকস ওর ডানে, আর ফ্রান্সিস বামে।
“একসাথে থাকবেন!,” চিৎকার করে বললো ও। একবার ব্যালকনি নিচ থেকে বের হতেই ওরা আবার আততায়ীর গুলির আওতায় চলে এলো। প্রমাণ স্বরূপ সাথে সাথেই মাস্কেটের গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো আর সেটা টমের মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে গিয়ে পাশের দেওয়ালের খানিকটা প্লাস্টার উড়িয়ে দিলো। একটা টুকরো ছুটে এসে গালে বিধলো ওর। টম পিস্তল ধরা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে রক্তটা মুছে, ঐ অবস্থাতেই তাক করে গুলি ছুড়লো। যে লোকটা ওর দিকে গুলি ছুঁড়েছিলো তার একেবারে কপালে গিয়ে লাগলো গুলিটা। ব্যালকনির রেলিং থেকে গড়ান দিয়ে নিচে ধপাস করে এসে পড়লো সে। টম লাশটা থেকে বন্দুকটা আর কোমর থেকে গোলার বেল্টটা টান দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে, দুটোই ফ্রান্সিসের দিকে ছুঁড়ে দিলো।
“আততায়ীগুলো যেনো মাথা বের করতে না পারে।”
ফ্রান্সিস হাঁটু মুড়ে বসে গুলি ভরে গুলি ছুড়লো। ব্যালকনিতে একজন পেট চেপে ধরে টলতে টলতে পিছিয়ে গেলো। বাকিরাও ভিতরে ঢুকে গেলো সাথে সাথে। ওদের প্রতিরোধে ভয় পাচ্ছে।
“তাড়াতাড়ি,” চেঁচালো টম। যুদ্ধে ভাটা পড়ায় সামনে একটা ফাঁকা জায়গা বেরিয়ে পড়েছে। এখন আর অতো চিন্তা ভাবনা করার সময় নেই, টম সেদিকে দৌড় দিলো। প্রথমবার কামানের গোলায় যারা মারা পড়েছিলো তাদের লাশগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে পার হচ্ছে। পাথরের চতুরটা রক্তে পিচ্ছিল হয়ে আছে, টম একবার পা পিছলে পড়তে পড়তে পড়লো না। আবার ব্যালকনি থেক গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো। ওর পাশের দুজন লোক পড়ে গেলো। একজন সৈন্য এখান থেকে বের হওয়ার জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়েছে, হাতে লম্বা একটা বল্লম। হাবিলদার তার বেয়নেট পরানো মাস্কেটটা একটা জ্যভেলিনের মতো করে ধরে ছুঁড়ে দিলো। সৈন্যটার গলা ফাঁক হয়ে গেলো তাতে। ওদের পায়ের সামনে পড়ে গেলো সে।
