কিন্তু দরজা বন্ধই থাকলো।
টমের মনে হলো ওর গালের ভিতর ওটা জিহ্বা না, ইটের টুকরো। যাত্রাটা বেশি দূর হবে না মনে করে ওরা সাথে করে খাবার পানি কিছুই আনননি। বিকেল গড়িয়ে গেলে ক্ষুধায় সবার অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হলো। কুলিদের মধ্যে এগারো বারো বছরের এক হ্যাংলা ছেলে ছিলো, অজ্ঞান হয়ে পড়েই গেলো সে। ওর বন্ধুরা ওকে তুলতে গেলো কিন্তু ফয় আদেশ দিলো ও যেখানে আছে সেখানেই যেনো পড়ে থাকে।
নেপচুন তরবারির ব্যাপারটা না থাকলে টম বহু আগেই ফ্রান্সিসকে সাথে নিয়ে কুঠিতে ফিরে যেতো। কিন্তু এখন আর ফিরে যাওয়ার মতো দিনের আলো অবশিষ্ট আছে কিনা এ ব্যাপারে ও সন্দিহান।
“রানির সাথে দেখা হওয়ার পর আমার তরবারিটার খোঁজ করতে ভুলবেন না,” ফয়কে মনে করিয়ে দিলো টম।
ফয় অবজ্ঞা মিশ্রিত একটা হাসি দিলো। কিন্তু ওর গলা এতোটা শুকিয়ে আছে যে শুনে মনে হলো, ভেতর ব্যাঙ ঢুকেছে। “আমরা এসেছি কূটনৈতিক কাজে। আপনার ঐ তুচ্ছ খেলনার জন্যে পুরো প্রদেশে ব্যবসার সম্ভাবনার ঝুঁকি নিতে পারবো না।”
টম কিছু বলার আগেই দরজা খুলে গেলো। আবারও হাজির হলো টুঙ্গার। আবারও বেরিয়ে এলো ওর কালো দাঁতের সারি।
“রানি আপনাদের সাথে দেখে করতে সম্মত হয়েছেন।”
“দেখেছেন,” ফয় বললো। “বলেছিলাম না যে সব ঠিকই হবে।”
টুঙ্গারের সৈন্যরা পথে দেখিয়ে ওদেরকে ভিতরে নিয়ে গেলো। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে পড়লো একটা চত্বর। সেটা পেরিয়ে আর একটা নিচু খিলানে ঢাকা পথে আগালো ওরা। টম ইতস্তত করতে লাগলো। সবকিছুই কেমন গোলমেলে ঠেকছে। কিন্তু ফ্রান্সিস আর হিকস এর মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। আর পিছনের সিপাহীর দলও ঠেলা দিচ্ছে আগাতে। আর উপায় না দেখে সামনেই বাড়লো ও।
চত্বরটা পেরিয়ে আসতেই পিছনে সদর দরজার কাছে একটা সংঘর্ষের আওয়াজ পেলো টম। দেখা গেলো যে সব কয়জন চাকরকে না ঢুকিয়েই সদর দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মাথা উঁচিয়ে কি হচ্ছে দেখার চেষ্টা করলো টম। কিন্তু লোকজনের চাপে খিলানের ভিতরে ঢুকে পড়লো।
সামনে আর একটা চতুর। অনেকগুলো বাঁকানো তোরণ দেখা গেলো সেখানে। বেশিরভাগ তোরণই নারিকেলের ছোবড়ার পাটি দিয়ে ঢাকা, ফলে ওগুলোর ভিতরে কি আছে তা দেখার উপয়া নেই। লম্বা লম্বা বর্শা হাতে প্রহরীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে আশেপাশে। সামনের উঁচু দেয়ালগুলোর গায়ে গাছপালা আর পশুপাখির নকশা কাটা। জানালা ঢেকে রাখা জালিগুলোর পেছনে নাড়াচাড়া দেখা গেলো। কিন্তু টম সেগুলোকে ঠিকমতো দেখার সুযোগ পেলো না।
ঠিক ওর উল্টোদিকে, দ্বিতীয় তলা থেকে একটা ব্যালকনি চতুরের উপর বেরিয়ে এসেছে। মহলের দরজায় আরো ছয়জন প্রহরী দাঁড়ানো। এদের শিরস্ত্রাণ সোনা দিয়ে বাধাই করা, হাতে পিতলের বন্দুক। কাছে যেতেই ওরা দরজাটা খুলে ধরলো।
চত্বরে সব লোক আটছিলো না। যেসব কুলিরা ভিতরে ঢুকতে পেরেছিলো, ওরা ফয়-এর পাশে ওদের পিঠের মালপত্র নামিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়ে গেলো। টম ভীড়ের ভিতরে টুঙ্গারকে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও দেখতে পেলো না।
ওরা অপেক্ষা করতে লাগলো। দোভাষীটা ফিরে এলো আবার।
“টুঙ্গার বলেছেন যখন রানি আসবে, তখন যেনো আপনার লোকেরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সম্ভাষণ জানায়।”
“অবশ্যই,” বলে ও ছেলেটাকে বিদায় জানালো ফয়। “ব্যাটা কি মনে করে যে আমি আদব কায়দা কিছুই জানি না? এসব কালাগুলো একটু শব্দ টক শুনলেই গলে যায়।”
টম গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ভিতর দিয়ে কসরত করে এগিয়ে চত্বরটার এক পাশে চলে এলো। তোরণগুলোকে ঢকে রাখা পাটিগুলো দেখে ওর মনটা খচখচ করছে। তোরণের খুটির গায়ে হেলান দিয়ে পাটিটার কোনা ধরে সামান্য সরিয়ে ভিতর উঁকি দিলো ও। ভিতরের আবছায়ার ভিতর অনেক লোকজন আর সৈন্য দেখা গেলো। ধীরে ধীরে জ্বলে এমন একটা বাতি জ্বালা ভেতরে। আর লোকগুলোর মাঝে বড়সড় কিছু একটা তেরপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
একটা শক্ত হাত ওর কাধ চেপে ওখান থেকে সরিয়ে দিলো। ঘুরে তাকিয়ে দেখে একজন প্রহরী চোখ গরম করে তাকিয়ে মাথা নাড়ছে ওর দিকে। সে ব্যালকনির দিকে দেখালো, দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে সেদিকে। তারপর নিজের ঠোঁটের উপর একটা আঙুল রেখে চুপ করে থাকার ইশারা করলো।
টম ঝাড়ি মেরে প্রহরীর হাত ছুটিয়ে দিলো। ওকে ফয়কে সাবধান করতে হবে যে রানির লোকজন নিশ্চিত কোনো কুমতলব আটছে।
কিন্তু সেই মুহূর্তে রানি নিজে ব্যালকনিতে এসে উপস্থিত হলেন। পরনে মূল্যবান সব পাথর খচিত পাটের তৈরি মিহি কাপড়। চল্লিশজন সিপাহী তাকে স্বসস্ত্র সালাম জানাতে মাস্কেটগুলো আকাশের দিকে তুলে ধরলো।
“থামো,” মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো টম। কিন্তু কথাটা ফয়-এর কানে যাওয়ার আগেই সিপাহীদের ফাঁকা গুলির বুম বুম আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেলো।
প্রত্যুত্তরে রানি ব্যালকনি থেকে মুচকি হেসে, অলস ভঙ্গিতে হাতটা উপরে তুলে আবার ছেড়ে দিলেন। টম বুঝতে পারলো এটা কোনো একটা সংকেত। চত্বরের চারপাশের তোরণগুলোর সামনের পাটিগুলো পড়ে গেলো। আর ভিতরে দেখা গেলো কালো রঙের সব কামান নল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওদের দিকে।
টম দেয়ালের দিকে ঝাঁপ দিলো, সাথে সাথে সবগুলো কামান গর্জে উঠলো একত্রে। মনে হলো একসাথে অনেকগুলো বজ্রপাত হলো। ধোয়ায় ভরে গেলো চারপাশ। মাস্কেটের গুলি, ভাঙ্গা ধাতুর টুকরা, মরচে পড়া পেরেকের একটা ঝড় ছুটে এলো গাদাগাদি করে চতুরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে। মহলের দেয়ালগুলো কেপে উঠলো বিস্ফোরণের ধাক্কায়।
