বড় হোক আর বাচ্চা হোক, ওদেরকে দেখামাত্র সবাই কাজ ফেলে রেখে ছুটে এসে জুলজুল করে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু টমের কেনো যেনো মনে হলো এদের এই অবার দৃষ্টির পেছনে শুধু কৌতূহল না, আরো কিছু আছে। গ্রাম ছাড়িয়ে বহুদূর চলে আসার পরেও ও ঝোঁপঝাড়ে নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো, কয়েকবার দেখলো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কালো রঙের কিছু অবয়ব ওদের আগে আগে দৌড়ে যাচ্ছে। ও জীবনে যথেষ্ট বিপদ মোকাবেলা করেছে, নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের উপর তাই ওর যথেষ্ট আস্থা। নিজেকে এখন ফাঁদের দিকে এগিয়ে যাওয়া পশুর মতো মনে হচ্ছে ওর।
ওরা একটা চৌরাস্তা পেরিয়ে এসে দেখে একটা খাড়ির উপর কাঠ দিয়ে একটা সাঁকো বানানো। পাশেই বানর দেবতা হনুমানের একটা মন্দির। মন্দিরের চারপাশে হলুদ রঙের জংলী ফুল ফুটে আছে। তার পাশেই একটা কুয়ো।
ফয় সবাইকে থামতে বলে দৌড়ে গেলো কুয়োর দিকে। কিন্তু ভেতরে তাকিয়েই আর্তনাদ করে উঠলো।
“শুকিয়ে গিয়েছে।”
টম ওর কাছে এগিয়ে নিচে তাকালো। পাথর আর নুড়ি ফেলে রাখা হয়েছে ভেতরে। কিন্তু ওটা এতোই গভীর যে এই ভয়ানক বৃষ্টিপাতের পরেও পানি উপরে ওঠেনি।
“ব্যাপার না,” খিটিমিট করে বললো ফয়। গরমে ওর চেহারার লাল রঙ সরে এখন সাদাটে হওয়া শুরু করেছে। আমরা মহলে পৌঁছালেই রানি আমাদেরকে আপ্যায়ন করবেন।”
টম ওর কাছে এসে অন্য কেউ যাতে শুনতে না পায় এমনভাবে বললো, “আমার কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না। কেউ ইচ্ছে করে কুয়োটা বন্ধ করে রেখেছে। ওরা ভালোমতোই জানে গরমের আমাদের অবস্থা কেমন হয়। ওরা চায় আমরা যাতে মহলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ি। আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।”
“ফিরে যাবো?” প্রায় চিৎকার করে উঠলো ফয়। “পাগল নাকি? আমাদের সাথে প্রায় একশো শোক আছে। রানি আর ওর অশিক্ষিত লোকগুলো আমাদের কি-ইবা এমন করতে পারবে? বিপদের আঁচ পেলেই পালিয়ে যাওয়া একজন ইন্টারলেপারের স্বভাব হতে পারে, কিন্তু কোম্পানির কাজ করে যেসব লোক তাদের সাহস অন্যরকম।”
ফয়কে কুয়োর ভেতর ফেলে দিলে ঠিক কি কি হতে পারে সেটা নিয়ে টম এক মুহূর্ত ভাবলো। শেষে কি ভেবে বাদ দিলো চিন্তাটা। ওর সমস্ত ইন্দ্রিয় ওকে বলছে ফিরে যেতে। কিন্তু তরবারিটা যেনো সাইরেনের (পৌরাণিক দানব, যারা গান গেয়ে নাবিকদের পথভ্রষ্ট করতো) মতো করে ওকে সামনের দিকে ডাকছে।
রাস্তাটা এরপর একটা লাল পাহাড়ে উঠে গিয়েছে। পশ্চিম ঘাটের প্রথম পাহাড় এটা। ওটার ঢাল ধান ক্ষেত আর নারিকেল গাছ দিয়ে ভরা। সামনেই গাছে ভরা পর্বতগাত্রের মাঝে একটা উপত্যকা মতো জায়গায় মহলটা সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
দুর্গ ছেড়ে আসার পর এটাই প্রথম পাথরের বাড়ি চোখে পড়লো টমের। মানে অন্তত এটার কিছুটা অংশ হলেও পাথরের। পুরো প্রাসাদটা আসলে গত এক যুগ ধরে এলোমেলো ভাবে বানানো অনেকগুলো ভবনের সমাহার। সুন্দর একটা বাগানের মাঝে আগাছার মতো। যখন যে-ই এই মহলে থেকেছে তার ইচ্ছে মতো যেদিকে খুশি নতুন নতুন চত্বর বা ভবন বানানো হয়েছে। বাইরে একটা লম্বা কাঠের দেয়াল। রানি আর তার প্রজাদেরকে আলাদা করেছে ওটা।
ফয় লোকের সারিটাকে নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। এক ডজন প্রহরী কুঁচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। পরনে মোটা কাপড়ের উর্দি। তার উপরে লম্বা সাদা কোটি, আর কোমরে কমলা কোমরবন্ধ। সবার পরনে রুপালি শিরস্ত্রাণ। সেগুলো নাক ছাড়িয়ে চেহারার এতো নিচে নেমে এসেছে যে সৈনিকদের আর চেনা যাচ্ছে না। হাতের বন্দুকগুলো খাড়া করে দুই ফাইলে এগিয়ে এলো ওরা। একজন লোক দুই ফাইলের মাঝে এগিয়ে আসছে।
তাকে দেখে শক্ত হয়ে গেলো টম। হাত আপনাআপনি চলে গেলো কোমরের পিস্তলে। লোকটা টুঙ্গার। নিজের সৈনিকের পোশাক ছেড়ে আজ পরেছে রেশমি কাপড়ের জোব্বা। পাড়ে নকশা করা। শিরস্ত্রাণের জায়গায় পরেছে পাগড়ি। কিন্তু তাতেও ওর ফাটা চেহারার শয়তানি একটুও কমেনি।
হিকস টমের হাতের উপর হাত রাখলো। “এখন না,” ফিসফিস করে বললো ও।
টুঙ্গার ওদেরকে মালায়ালাম ভাষায় স্বাগত জানালো। অতিরিক্ত বিনয়ে গলে হাসছে হে হে করে। তাতে ওর কালচে দাঁতই দেখা হলো শুধু। একজন কমবয়সী ভারতীয় ছেলে সামনে এগিয়ে এসে দোভাষীর কাজ করতে লাগলো।
“উনি বলছেন রানির শরীর খারাপ। গরমে কাহিল হয়ে পড়েছেন। আপনারা অপেক্ষা করুন।”
“শুনুন,” কপালের গাম মুছতে মুছতে কড়া গলায় বললো ফয়। “আমরা অনেক দূর থেকে নানা জিনিসপত্র উপহার নিয়ে এসেছি আপনাদের ঐ উঁইফোড় রানির জন্যে। আমরা এভাবে বাইরে অপেক্ষা করতে পারবো না।”
তোষামদের ভঙ্গিতে টুঙ্গারের হাসি আরো চওড়া হলো। তারপর বললো কিছু একটা।
“অপেক্ষা করুন, দোভাষী বললো।
“রাখ তোর অপেক্ষা। আমি-”
টুঙ্গার ঘুরে অলস পায়ে ফিরে যেতে লাগলো। ফয় পিছু পিছু যেতে গেলে কিন্তু রানির প্রহরীরা সামনে এগিয়ে এসে ওর পথ রোধ করে দাঁড়ালো। ভিতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হলো সদর দরজা।
“আমরা তাহলে এখন কি করবো?” জানতে চাইলো ফয়।
“অপেক্ষা করুন,” আবার বললো দোভাষী।
*
ঘন্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে লাগলো। এই তীব্র গরমের মধ্যেও সবাইকে সাবধান অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখলো ফয়। যখন হিকস পরামর্শ দিলো সবাইকে বিশ্রাম নিতে দেওয়ার জন্যে, ফয় প্রচণ্ড রেগেমেগে ওকে তাড়িয়ে দিলো। “রানির সামনে আমাকে অপদস্থ করতে চান? আমি নিশ্চিত যে কোনো মুহূর্তে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হবে।”
