“একেবারে ময়ূর পক্ষী, মুচকি হেসে বললো অ্যানা। “সাথে ঘিলুও সেই পরিমাণ। রানির কথা এ বুঝবে কিনা সেটাই সন্দেহ আমার।”
“তুমি কিন্তু দোভাষীর কাজ করতে পারো।” বলে টম এগিয়ে গিয়ে ফয়কে কথাটা বললো। শুনে ফয় হতভম্ব হয়ে গেলো।
“আপনার মাথা খারাপ? এসব কোনো হালকা বিষয় না-পুরো কোম্পানির ব্যবসা নির্ভর করছে এর উপর। একজন মহিলার মাধ্যমে সেটা চালানো সম্ভব না।” মহিলা শব্দটায় ফয় বিশেষ জোর দিলো। “আমার সম্মানহানি হবে তাতে।”
“আমার মনে হয় না রানি এই কথার সাথে একমত হবে,” টমের কানে কানে বললো ফ্রান্সিস।
টম দেখলো অ্যানা আরো একবার যাওয়ার জন্যে জেদ করতে যাচ্ছে। ও ওকে হটিয়ে দিলো।
“তুমি এখানেই থাকো। সারাহকে দেখাশোনা করতে হবে। আমাদের যদি কিছু হয় তাহলে ওর যত্ন নেওয়ার জন্যে তোমাকে থাকতে হবে।”
অ্যানার রাগ মুহূর্তে উদ্বেগে রূপান্তরিত হলো। “আপনাদের বিপদ হতে পারে?”
“রানির কর্মচারীরা কেমন আচরণ করে তা তো দেখেছোই।”
“তাহলে আপনার যাওয়ার দরকার নেই,” মিনতি করলো অ্যানা। “ফ্রান্সিসও থাক। মিস্টার ফয়-এর ব্যাপার স্যাপারে আপনারা না গেলেও হবে।”
“না, যাওয়া লাগবে। বদমাইশ টুঙ্গারের কাছ থেকে তরবারিটা ফেরত আনতে হবে। এটাই সবচে ভালো সুযোগ। আর ফ্রান্সিস চাইলে থেকে যেতে পারে। কিন্তু ওর যা বয়স তাতে বিপদের কথায় ও আরো নেচে উঠবে যাওয়ার জন্যে। আমি তাই পারলেও ওকে বারণ করবো না। তবে আলফ উইলসন আর বাকিরা আছে তোমাদেরকে রক্ষা করার জন্যে।”
ওরা ফয়-এর পিছু পিছু রওনা দিলো। টম হাটছে ক্যাপ্টেন হিকসের পাশে। উনিই সৈন্যদলের দায়িত্বে আছেন। টম খেয়াল করলো ফয় এমনকি একজন প্রহরীও রেখে যায়নি দুর্গে। একটা অমঙ্গলের চিন্তা ওর মনে খেলে গেলো। ওর কি আসলেই সারাহ, অ্যানা আর অ্যাগনেসকে এভাবে অরক্ষিত রেখে চলে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে?
নেপচুন তরবারি, নিজেকে মনে করিয়ে দিলো।
মানুষের সারিটা আস্তে আস্তে সামনে আগাতে লাগলো। কমপক্ষে একশো লোক যাচ্ছে একসাথে। বৃষ্টির কারণে সব রাস্তাঘাট একেকটা ছোটোখাটো জলায় পরিণত হয়েছে। একটু পরেই দেখা গেলো কাদার প্রলেপ পড়ে যায় এর সোনার আঙটার জুতো আর চেনা যাচ্ছে না। আর সিপাহিদের উর্দির প্রায় কোমর পর্যন্ত কাদার ছিটেয় ভরে গিয়েছে। এক ঘণ্টা পরে দেখা গেলো ওরা মাত্র এক মাইল পার হয়েছে।
টম স্থানীয় কুলিদের মাথার বস্তা আর ব্যাগগুলোর দিখে খেয়াল করলো। “ফয় কার বুদ্ধিতে রানির জন্যে এতো দিলখোলা আচরণ করছে? ওনার স্বভাবতো এরকম না।”
হিকস হেসে দিলো। “ফয় দরকার ছাড়া নিজের এক ফোঁটা প্রস্রাবও খরচ করবে না। ওগুলো হচ্ছে পাউডার আর গুলির বস্তা।”
“সৈন্যরা নিজেরা নিজেদেরটা নেয় না?”
“মিস্টার ফয় আমাদের স্থানীয় সৈন্যদেরকে বিশ্বাস করেন না। ওনার দুশ্চিন্তা যে ওরা আমাদের বিরুদ্ধে না আবার লেগে যায়। রাস্তার একটা নুড়ি পাথরে লাথি দিলো হিকস। “শালা খালি গায়ের চামড়ার রঙ দেখে, বিশ্বস্ততা দেখে না।”
টমের মনের দুশ্চিন্তা আরো বাড়লো। নিজের পিস্তলের ঘোড়া ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিলো ও হিকসের কাছ থেকে ধার নিয়েছে এটা। একটা ছুরি আর একটা কাজ চালানোর মতো সেনাবাহিনির কোমরবন্ধনীও দিয়েছে। ওটা পরার পর থেকে নেপচুন তরবারিটার জন্যে আরো বেশি চুলকনি উঠে গিয়েছে ওর।
ওরা কষ্টে সৃষ্টে এগিয়ে চললো। পুরো দেশটা মনে হচ্ছে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। টমের মনে হলো নূহের নৌকার অধিবাসীরা নৌকা থেকে নেমে আসার পর, তাদের কাছে সম্ভবত পুরো দুনিয়াটা এরকম লেগেছিলো। গাছপালা ঘাড় ভেঙে পড়ে আছে, রাস্তা ভরে গর্ত। আর গাছের ফাঁক দিয়ে সমুদ্র থেকে উঠে আসা পানি এদিকে সেদিকে নালা সৃষ্টি করে ধাঁধার মতো ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এই অনন্ত পানির মধ্যে চলতে চলতেও ওদের সবচে বড় কষ্টের নাম হচ্ছে তৃষ্ণা। কাদা ভাঙতে ভাঙতে ওদের উলের কোট আর টুপির ওজন আস্তে আস্তে বেড়েই চলেছে বলে মনে হতে লাগলো। এতো গরম যে মনে হচ্ছে ওরা কোন যুদ্ধক্ষেত্রে কামান ছুড়ছে। টমের মনে হচ্ছে যেনো ওর শরীরের সমস্ত তরল পদার্থ নিংড়ে ওর কাপড়ের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে।
“সামনের বাকটা পার হলেই একটা কুয়ো আছে,” হিকস বললো। “ওখানে পানি খেয়ে নেওয়া যাবে।”
টম মনোযোগ সরাতে রাস্তার দু’ধারের দৃশ্য দেখায় মন দিলো। ও আফ্রিকার বনভূমিতে প্রচুর সময় কাটিয়েছে, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ আলাদা। এতো এতো অদ্ভুত সব গাছ আর ফুল ফুটে আছে চারপাশে যেগুলো ও জীবনেও দেখেনি। চোখা মাথার পাইন গাছ, এক পা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আতা, পেয়ারা, পেপে গাছ; জামপাতার মতো দেখতে পাতাওয়ালা একটা ঝোঁপ গাছ, উজ্জ্বল বেগুনি ফুল ফুটে আছে তাতে।
“এতো দেখি স্বর্গের বাগান,” ফ্রান্সিস বিস্মিত কণ্ঠে বললো।
“দুই সপ্তাহ আগেও ছিলো খরায় পোড়া, হিকস বললো। “নদীগুলো ছিলো নালার মতো সরু, গাছগুলো সব অর্ধেক মরে ছিলো। বৃষ্টি হওয়ার পর এক রাতের মাঝেই পুরো পাল্টে গিয়েছে।”
কয়েকটা গ্রাম পেরিয়ে এলো ওরা। জাহাজডুবির পর যেরকম গ্রামে গিয়েছিলো, এগুলোও সেরকমই। তাল পাতায় ছাওয়া ঘর সব, বাঁশের মাচায় মাছ ধরার জাল শুকোচ্ছে। নদী থেক ছোট ছোট নালা বেরিয়ে এখানে সেখানে পুকুর তৈরি করেছে, সেগুলোতে বাদামী রঙের শাঁসালো জিনিস দিয়ে ভরা। হিকস জানালো যে এগুলোতা নারিকেলের ছোবড়া জাগ দেওয়া হয়েছে। এভাবে ছোবড়া কয়েক মাস পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়, তারপর নরম হলে সেগুলো দিয়ে সুতা বানানো হয়। সেটা দিয়েই পরবর্তীতে তৈরি হয় জাহাজের কাছি। কয়েক জায়গায় টম দেখলো মহিলারা ছোট লাঠি দিয়ে ছোবড়াগুলো পিটাচ্ছে।
