তবে এখন লরেন্স ফয়-এর ঘ্যানঘ্যানানির হাত থেকে বাঁচতে পারছে ও। গভর্নর এখন প্রচণ্ড ব্যস্ত রানির দরবারে দেখা করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে। নিজের ইশতেহার আর বক্তৃতাটা বার বার ঘষে মেজে ঠিকঠাক করছে। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে দিনের পর দিন ওকে দেরি করতে হলো।
“আমার স্বামী রানির সামনে একটা ভেজা কাকের মতো তো আর গিয়ে দাঁড়াতে পারে না, তাই না?” ফয়-এর স্ত্রী ঘোষণা দিলো। সে একবার বেড়াতে এসেছিলো এই বাড়িতে। ভাব দেখাচ্ছিলো যে সারাহকে দেখতে এসেছে, কিন্তু টমের ধারণা আসলে এসেছিলো ওরা এখন কি করবে না করবে সেসব খোঁজ করতে। “মহিলা কিন্তু নিজের স্বামীর ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর,” অ্যাগনেস আগেই বলে রেখেছিলো টমকে। “আর ওনার ধারণা তুমি ওনার ক্ষতির কারণ হতে পারো।”
টম মহিলাকে আশ্বস্ত করার যথেষ্ট চেষ্টা করলো। ওরা যে যতো দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে যেতে উদগ্রীব সেটা জানালো। মহিলা যাতে ওর সম্পর্কে খুব বেশি প্রশ্ন করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখলো। কিন্তু তবুও দেখা গেলো ওর উত্তরে মহিলা সম্ভষ্ট হচ্ছে না। বেশ কয়েকবার টম খেয়াল করলো মহিলা তার পাখির মতো চোখগুলো দিয়ে ওকে খেয়াল করছে আর নাক সিটকে এমন ভাব করছে যেনো সে টমের কাজে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে। মহিলা এক আজব চিড়িয়াঃ স্বামীর চাইতে বিশ বছরের ছোট, মাত্র সতেরো বছর বয়স। কিন্তু চলাফেরা এমন যা তার চাইতে তিনগুণ বেশি বয়সী মহিলার মাঝেও দেখা যায় না।
“মেয়েটা এর মধ্যেই একবার বিধাব হয়েছে, চুপিচুপি বলেছে অ্যাগনেস। “ভারতে এসেছিলো ওর বাবার সাথে। কিন্তু জাহাজ থেকে নামতে না নামতেই তেল্লিচেরির প্রধান গোমস্তার সাথে বাগদান হয়ে যায়। ব্যাটা ছিলো ইয়া ভুড়িওয়ালা এক বুড়ো। নাম কুপার। আস্ত খাটাস একটা লোক। যখন প্রথম বোম্বে আসে তখন ডিনারের টেবিলের নিচ দিয়ে মহিলাদের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করতো। আর মেয়েটার বয়স তখন পনেরও হয়নি। কুপার এক বছরের মাঝে মারা পড়ে। তার সব সম্পত্তির মালিক হয় মেয়েটা। সেটা যৌতুক দিয়েই মিস্টার ফয়কে বিয়ে করেছে সে।”
এখন টম অ্যাগনেসের বসার ঘরে বসে আছে আর চেষ্টা করছে সবার সাথে তাল মেলাতে। ওর অবশ্য বেশি কিছু বলারও নেই। মিসেস ফয়-এর মাথায় হাজার হাজার বুদ্ধি। সে গড়গড় করে সব বলে গেলো; নিজের ব্যক্তিত্ব বা অন্য কোনো গুণ দিয়ে না, বরং বলা যায় জবরদস্তি করেই সে সবার উপর প্রভাব বিস্তারের আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলো। মেয়েটা খুব বেশি সুন্দর না। নাক চোখা, চোখা ড্যাবড্যাবে, মুখের কাটাও বেশি বড় গায়ে মাংস নেই কিন্তু স্তনের আকার বড় হওয়ায় গায়ের পোশাকটা ঠিকমতো আঁটেনি। কিন্তু তবুও এক অফুরন্ত শক্তির বলে সে ঘরের সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিলো। টম দেখলো ফ্রান্সিস হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অ্যানা চুপিসারে কনুই দিয়ে গুতো দেওয়ার পড়ে চোখ নামিয়ে নিলো।
“একবার আমার স্বামী এই হামবড়া কালা রানিটার সাথে সব ঠিকঠাক করে ফেলতে পারলেই আমি নিশ্চিত, গভর্নর কোর্টনী ওকে ভালো পুরস্কার দেবেন। আরো ভালো কোথাও পাঠাবেন,” একটা কাগজের পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললো মিসেস ফয়। “মাদ্রাজ বা ফোর্ট উইলিয়ামেও পাঠাতে পারেন।”
“কিন্তু মহলেই তো যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না,” ফয় বললো।
মিসেস ফয়ের চোখ ছোট ছোট হয়ে গেলো। “আশা করি কাল আবহাওয়ার উন্নতি হবে।”
*
সেটাই হলো। পরের সকালে উত্তাপ ছড়াতে ছড়াতে উদয় হলো সূর্য। যদিও মেঘ আছে আকাশে। উত্তাপে আরো বড় হচ্ছে আকারে, পুরো দুনিয়াই মনে হতে লাগলো জলীয় বাষ্পে উত্তপ্ত হয়ে আছে। বিছানা থেকে মাথা তুলতে না তুলতেই টমের সারা শরীর পাতলা ঘামের আস্তরণে ঢেকে গেলো। প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে গায়ে কোট চাপালো ও। কোটটা ক্যাপ্টেন হিকসের, অ্যাগনেস ওকে দিয়েছে। ফয় আদেশ জারি করেছে যেনো প্রতিটা লোককে একদম পরিপাটি দেখায়।
দুর্গের বাইরের বালুকাময় জায়গাটায় গিয়ে জড়ো হলো ওরা। ফয় প্রত্যেক সমর্থ পুরুষকে সাথে নিয়ে এসেছে। যাতে রানি ওকে দেখে সমীহ করে। এক কোম্পানি সৈন্যও আছে সাথে। আয়নার মতো চকচক করছে ওদের বুট। কোম্পানির মুনশি আর ব্যাপারীরা পরেছে নীল পোশাক; আরও আছে একগাদা বেয়ারা আর চাকর। চাকরদের হাতে রানির জন্যে উপহার সামগ্রী। বাকিরা সবাই এসেছে শুধুমাত্র ফয়ের ক্ষমতা দেখানোর অংশ হিসেবে।
যারা সাথে গেলো না তারা পাশেই দাঁড়িয়ে বিদায় দিলো ওদের কয়েকজন বৃদ্ধ লোক আর ছোট বাচ্চা, কেস্ট্রেল-এর নাবিকেরা আর মহিলারা।
*
ফয় দাঁড়িয়ে আছে সারির একদম সবার সামনে। একটা মেরুন রঙের কোট, লম্বা কোকড়ানো পরচুলা, উটপাখির পালক বসানো টুপি আর সোনার আঙটা বসানো জুতো পরে একবারে ফুলবাবু সেজে আছে। মনে হচ্ছে কূটনীতিতে না পারলেও, ওর পোশাকই রানির উপর ভালোই প্রভাব ফেলবে। চেহারা গরমে একেবারে টকটকে লাল হয়ে আছে। কোটের কাঁধের দিকটা ঘামে প্যাঁচপ্যাঁচে হয়ে গিয়েছে এরমধ্যেই। রানির মহল ওখান থেকে ছয় মাইল। টম ভাবতে লাগলো ফয় ততোক্ষণ টিকবে কিনা।
“ওনাকে খুবই ভালো লাগছে, তাই না?” অ্যানাকে বললো টম। ও ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো।
