“টুপিওয়ালাদের কি করেছো? সবাইকে খুন করে রেখে এসেছেন?” যতোটা পারলো আগ্রহ গোপন করে জানতে চাইলো ক্রিস্টোফার।
“একটা শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। মহামান্য রানি এখনো ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে প্রস্তুত না।” তারপর টুঙ্গার আহত সৈন্যদের দিকে ইংগিত করে বললো, “আর এভাবে চলতে থাকলে কোনোদিন হবেনও না। তাড়াতাড়ি পরিষ্কার কর সব। নইলে তোকে দিয়েই সব চাটিয়ে পরিষ্কার করাবো।”
*
টুঙ্গার যাওয়া মাত্র ক্রিস্টোফার আস্তাবল থেকে একটা ঘোড়া আনিয়ে সৈকতের দিকে ছুটলো। গ্রামের মাতবর ওকে দেখে ভয় খেয়ে গেলো। অবশ্য স্বীকার করলো যে টুপিওয়ালারা এসেছিলো এখানে। তবে এখন তারা ব্রিঞ্জোয়ানের দুর্গের দিকে চলে গিয়েছে। মাতবর চাচ্ছিলো না যে এইসব বাইরের অপবিত্র লোক তার গ্রামে থাকুক। ওরা যা কিছু ছুঁয়ে দেখেছে তার সবকিছু খুব ভালো মতো ধুয়ে গোবর দিয়ে ঘষে পবিত্র করে নেওয়া হয়েছে।
ক্রিস্টোফার ওখান থেকে চলে এলো। ও জানে যে ওর মহলে ফিরে যাওয়া উচিত, তবে আগে সৈকতটা দেখতে গেলো। ঝড় থেমে গিয়েছে ততোক্ষণে, ডুবে যাওয়া জাহাজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। ওটা মাস্তুলের ভাঙা অংশটা ঢেউয়ের তালে ডুবছে আর ভাসছে। আর সাগরও এতো পরিষ্কার ছিলো যে ওটার কালো রঙের খোলটাও পানির ভিতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছিলো। ইন্ডিয়াম্যান না জাহাজটা। ও বোম্বেতে ইন্ডিয়াম্যান এতো এতো দেখেছে যে দেখা মাত্র এধরনের জাহাজ চিনতে পারে। কোনো আরব দস্যুদের জাহাজও না-এটা একটা ইউরোপিয়ান জাহাজ। কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন জাহাজ ছিলো সম্ভবত, আরো ভালো করে বললে একজন ইন্টারলোপারের জাহাজ।
ওর মনে অনেকগুলো সম্ভাবনা এসে ভীড় করলো। যদি এটা ইংল্যান্ড থেকে এসে থাকে তাহলে নিশ্চিত কেপ টাউনে থেমেছিলো। সম্ভবত তরবারিটা তখনই জাহাজের কেউ কিনেছে। হয়তো এরা আফ্রিকার উপকূলের সব গোত্রে মালপত্র কেনাবেচা করে কেপটাউন থেকে এই দুর্ভাগ্যের যাত্রা শুরু করেছিলো। তরবারিটার দাম কত ছিলো? নাকি বাজি ধরে জিতেছে? কে জানে কাউকে খুন করে ছিনিয়ে নিয়েছে কিনা।
এসব কোনো ব্যাপার না। উত্তরাধিকার সূত্রেই নেপচুন তরবারিটা ওর। আর সমুদ্রই ওটা ওর কাছে এনে দিয়েছে। এখন ওর কাজ হচ্ছে টুঙ্গারকে শেষ করে তরবারিটা কেড়ে নেওয়া। আর কালারিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া একজন লোকের কাছে সেটা পানিভাতের মতোই।
এরপরেও ও জাহাজটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ঝড় ওটাকে পাড়ের কাছেই এনে ফেলেছে। এতো কাছে যে ওর মনে হলো ও হেঁটেই ওটার কাছে চলে যেতে পারবে। ওটার উপর ঢেউ এসে পড়ছে, আর ওটার ভাঙ্গা তক্তাগুলো দোলনার মতো দুলছে।
চোখের উপর হাত চাপা দিয়ে দেখতে লাগলো ক্রিস্টোফার। ঢেউ সরে যেতেই জাহাজের পাশ দিয়ে একটা লম্বা সরু জিনিস বের হয়ে থাকতে দেখা গেলো।
ওটা কি একটা কামান নাকি! নিজের সৌভাগ্যে নিজেই অবাক হয়ে গেলো ও জাহাজটায় কামান ছিলো। তার মানে নিশ্চয়ই আরো কামান আছে। সম্ভবত এখনো জাহাজে আটকে আছে, নইলে পড়ে আছে আশেপাশেই। একটা লম্বা দড়ি আর টানতে পারে এমন কিছু জানোয়ার পেলেই তুলে আনা যাবে।
ও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো সবকিছু। কামানগুলো উদ্ধারের সমস্যা আর সম্ভাবনাগুলো যাচাই করে দেখছে। সবশেষে কাঁঠাল গাছে বাঁধা ওর ঘোড়াটার কাছে এগিয়ে লাফ দিয়ে উঠে মহলের দিকে ছুটলো।
অনুমতি ছাড়া মহলের বাইরে আসায় টুঙ্গার নিশ্চিত ওকে শাস্তি দিতে চাইবে, কিন্তু ক্রিস্টোফার কি পেয়েছে সেটা জানা মাত্রই পরিস্থিতি ঘুরে যাবে নিশ্চিত। ওর বিশ্বস্ততা নিয়ে তখন আর কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকবে না।
*
তিন দিন পর, ক্রিস্টোফার আবারও একই সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে। সৈকতের যেদিক দিয়ে কামানের নলটা টেনে নেওয়া হয়েছে সেদিকে বালিতে গভীর গর্ত হয়ে গিয়েছে। ভালোই কাজ হয়েছে আজ, রানি খুব খুশি হবেন। কিন্তু কেন যেনো ওর মনটা খচখচ করছে।
আবারও দূর দিয়ে ভেসে যাওয়া নৌকাটার দিকে তাকালো ও। আজ প্রায় সারাদিনই ওটাকে দেখা গিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে উদ্দেশ্যহীনভাবে ভেসে চলেছে। কাছে আসার কোনো চেষ্টাই করছে না। সম্ভবত জেলে নৌকা। কিন্তু তবুও কেনো যেনো কেমন কেমন লাগছে ওর। কেন যেনো মনে হচ্ছে কেউ ওর উপর নজর রাখছে। ঝড়ের আগে যেরকম বাতাসে স্থির বিদ্যুতের আভাস পাওয়া যায়, সেরকম লাগছে ওর কাছে।
খামাখা ভাবছি আমি, নিজেকে বললো ও। কামানগুলো রানির কাছে নিয়ে যাওয়ার পর রানি নিশ্চয়ই ওকে পুরষ্কার দিতে চাইবেন। এমনকি ওকে টুঙ্গার এর উপরেও পদোন্নতি দিয়ে দিতে পারেন।
*
ধ্বংসাবশেষের কাছ থেকে ঘুরে চলে আসার পরদিন থেকে আবার ঝড় শুরু হলো। পুরো এক সপ্তাহ থাকলো এবার। টম আর বাকিরা অ্যাগনেসের বাংলোতেই থাকলো। বসে বসে ভাবনা চিন্তা করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই ওদের। সারাহের জ্বর কমেছে খানিকটা; যদিও এখনো অনেক দুর্বল, আর যথেষ্ট পীড়াপাড়ি করে খাবার খাওয়াতে হয়। ব্রিঞ্জোয়ানে কোনো ডাক্তার নেই, তাই অ্যানা আর অ্যাগনেসই যতোটা পারে ওর যত্ন নিচ্ছে।
টম বেশিরভাগ সময়েই জানালার ধারে বসে বসে বৃষ্টি দেখে কাটিয়ে দিলো। বসে বসে হয় সারাহের কথা ভাবে, নয়তো নেপচুন তরবারিটার কথা ভাবে।
