ক্রিস্টোফারের জীবন মরণ এখন নির্ভর করছে রানি ওকে যে দায়িত্ব দেয় সেটা হুবহু পালনের মধ্যে। বোম্বের গভর্নর হিসেবে ওর বাবাও আনুষ্ঠানিকভাবে বোম্বে আর্মির সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। প্রতি রবিবার দুপুরে উনি সমস্ত সৈন্যকে কুঁচকাওয়াজ করাতেন। নানা পদের মহড়া দেওয়াতেন। সত্যিকার সেনা কর্মকর্তারা রোদে ঘামতে ঘামতে তাকে গালাগাল দিতে দিতে আদেশ পালন করতো। ক্রিস্টোফারকেও জোর করে ধরে নিয়ে যেতেন। পরনে থাকতে পুরু একটা সানডে স্যুট, যেটা কিনা ইংল্যান্ডের শীতে ঘরের ভিতর পরা যায় কিন্তু এই ভারতীয় গরমে মোটেও না। কিন্তু এখন ব্যাপারটার জন্যে মনে মনে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিচ্ছে ও।
“গোলা ভরো।”
কামানের ক্রু-রা জায়গা মতো দাঁড়িয়ে গেলো। কিন্তু এতো আস্তে যে ওর মনে চাইলে চাবকে সবকটার পাছের চামড়া তুলে দিতে। কিন্তু সেটা পছন্দ করবেন না-অন্তত এখনি না। ক্রিস্টোফারকে তাই গালাগালি চিৎকার করেই মনের ঝাল মেটাতে হচ্ছে। এরা ক্রমাগত প্রতিটা তালগোল পাকিয়ে ফেলছে, বারুদ ঠাসার কাঠিটা ভুল ভাবে ঠেসে দিয়ে পাউডারের বস্তা খুলে ছড়িয়ে ফেলছে বা গোলাটাই হাত থেকে ফেলে দিচ্ছে।
“ও ঈশ্বর! যদি একজন ইংরেজ এভাবে কামান দাগার চেষ্টা করে তাহলে মুঘল সম্রাটেরাই বরং এখন লন্ডনে গিয়ে বাড়ি বানিয়ে থাকতো। আমি তখন তোদের চাকরের কাজ করতাম আর সকাল বিকাল পাছায় খেতাম।”
বিস্ফোরণের শব্দে ওর আওয়াজ চাপা পড়ে গেলো। কামানের গোলা বিস্ফোরিত হয়েছে। কামানের আশেপাশের লোকেরা সাথে সাথে ছিন্নভিন্ন হয়ে মাংসের স্তূপে পরিণত হলো। আহতদের চিৎকারে কান পাতা দায়। যে সুবলদারটা কার্তুজ ঠাসার কাঠিটা ধরে ছিলো সে শখানেক ফুট দূরে গিয়ে পড়েছে। পেট চেপে ধরে পড়ে আছে সে। হাতের কাঠিটা ওদিক দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে, এখন খোলা পেট দিয়ে নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছে সব।
“শালা নরকের কীট,” ক্রিস্টোফার মৃতপ্রায় লোকটার উপরেই ঝাড়লো। “তুই নিশ্চয়ই ঠিকমতো কামানটা মুছিসনি।” এই ভেজা স্পর্শের কাজ হচ্ছে একবার গোলা ছোঁড়ার পর যদি ভিতরে কোনো ফুলকি থেকে যায় তাহলে সেটাকে নিভিয়ে ফেলা। এতে করে নতুন করে বারুদ ঠেসে দিলেও আর বিস্ফোরণের সম্ভাবনা থাকে না।
কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই মুহূর্তেই টুঙ্গার ওর একদল সৈন্য কোথাও থেকে আসছিলো। ও ঘোড়া থেক নেমে ভাঙা কামানটা দেখে তারপর লম্বা পা ফেলে সামনে এগিয়ে এলো।
“তোর কাজ রানির সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদেরকে ধ্বংস করা না।
ক্রিস্টোফার চুপচাপ খোঁচাটা হজম করলো। কামান, চিৎকাররত লোকজন, রানির অসন্তুস্তি-সব বেমালুম ভুলে গিয়ে এক দৃষ্টিতে টুঙ্গার কোমরে বাঁধা তরবারিটার দিকে তাকিয়ে আছে ও। এক অনিন্দ্য তরবারি, হাতলে একটা বড়সড় নীলা পাথর বসানো।
তরবারিটাকে চেনে ও, বোম্বেতে ওর বাবার অফিসে স্যার ফ্রান্সিসকে ছবিতে বহুবার দেখেছে। ছোট থাকতে ও ছবিটার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতো। এমনকি হয়তো কোনো জরুরি কাজ পড়ে আছে, তবু দেখা যেতো ও ঘুরে ফিরে এসে ছবিটা দেখছে। দেখতো আর কল্পনা করত এই অনিন্দ্য সুন্দর অস্ত্রটা ওর কোমরে ঝুলছে বা ডান হাতে আঁকড়ে আছে। এভাবে বসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখার জন্যে ও গাই-এর হাতে অসংখ্য পিটুনি খেয়েছে। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি ক্রিস্টোফার। ওর বাবাকে ক্রুরা বিরক্ত করতেই থাকে। তারপর একদিন ওর বাবা ওকে নেপচুন তরবারিটার কাহিনি খুলে বলে। স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক, চার্লস কোর্টনী–ওর দাদা বা পরদাদাদের নামগুলো শুনলেই ওর ভিতর কেমন একটা সম্ভ্রম ভাব জেগে উঠতে ওর ভিতর।
“তরবারিটা এখন কোথায়?” প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে জানতে চেয়েছিলো ক্রিস্টোফার।
“তোমার টম চাচা ওটা হাই উইল্ড থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। উইলিয়ামকে খুন করার কয়েকদিন আগে,” গাই বলেছিলো ওকে। ক্রিস্টোফার তখন ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলো। গাই টম সম্পর্কে একটা কথাও বলত না। আর ভুলেও যদি কখনো তার নাম উচ্চারিত হতো, তাহলে ক্ষেপে যেতো। “যখন ও আফ্রিকায় মারা যায় তখন ওটা ওর সাথেই ছিলো সম্ভবত। এখন হয়তো কোনো দস্যু বা ডাকাতের হাতে পড়েছে।”
ক্রিস্টোফার কল্পনাও করতে পারছে না যে কিভাবে এটা মালাবার উপকূলে এসে পৌঁছেছে; আর কিভাবেই বা টুঙ্গারের মতো শয়তানের হাতে পড়েছে।
টুঙ্গারও ক্রিস্টোফারের হতবাক অবস্থাটা খেয়াল করলো। ও তরবারিটা খাপ থেকে বের করে ডানে বামে বাতাসে কয়েকটা কোপ দিলো। ক্রিস্টোফারের মুখের ঠিক সামনে থেকে বাতাস কেটে সাই করে সরে গেলো চকচকে ফলাটা।
“কয়েকদিন আগে টুপিওয়ালাদের একটা জাহাজ ডুবি হয়েছে উপকূলে। ওখানকার বেঁচে যাওয়া একজনের কাছ থেকে নিয়েছি এটা।” ক্রিস্টোফার পিঠের পিছনে হাত নিয়ে মুঠি পাকিয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে রাখলো। ওর প্রচণ্ডত্ম ইচ্ছে করছিলো তরবারিটী কেড়ে নিয়ে সোজা টুঙ্গারের গলায় ঢুকিয়ে দিতে। তরবারিটা ওর সম্পত্তি। ও হচ্ছে বেঁচে থাকা ভাইদের মধ্যে সবচে বড় জনের বড় ছেলে, কোর্টনীদের উত্তরাধিকারি। এটা এমনিতেই ওর হবে : নইলে ভাগ্যের ফেরে ওর কাছেই বা কেন এটা চলে আসবে। ইতোমধ্যেই ও মনে মনে হিসেব করা শুরু করেছে কিভাবে ও তরবারিটা হস্তগত করতে পারবে। টুঙ্গারকে একা পাওয়াটা শক্ত। কারণ ও লোকজন নিয়ে একটা কুকুরের পালের মতো ঘোরে সবসময়। যেখানে যায় সাথে এরা থাকে। কিন্তু একটা না একটা উপায় বের করতেই হবে।
