“মেয়েটাকে নিয়ে আসুন,” নিরাসক্ত গলায় বললো ক্রিস্টোফার। রানি মাথা ঝাঁকাতেই টুঙ্গার এক প্রহরীকে আদেশ দিলো।
চুপচাপ দরবারে বসে রইলো ওরা। টু শব্দটিও করলো না কেউ। এমনকি রানিও না।
অবশেষে নিচের ঘর থেকে উপরে আসার সিঁড়িতে পদশব্দ পাওয়া গেলো। একটু পরেই রানির চারজন প্রহরী আবার দরবারে প্রবেশ করলো।
ওদের মাঝখানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসছে তামান্না। এটা যে তামান্না তা চেনাই যাচ্ছে না। চামড়া ফেটে রক্ত বের হওয়ার আগ পর্যন্ত ওর পায়ের পাতায় চাবুক মারা হয়েছে। গায়ে একটা সূতাও নেই। কবজি শরীরের সামনের একসাথে বাঁধা। সারা পিঠে জুড়ে চাবুকের দাগ লাল হয়ে ফুটে আছে। চুল আলুথালু হয়ে কোমর পর্যন্ত ঝুলছে, ঘাম আর রক্তে ভিজে সপসপে। চোখ টকটকে লাল, কোটরের গভীরে ঢুকে গিয়েছে। চোখের পাতে ফুলে আছে, খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে ওর। ঘুষি মেরে ওর প্রায় সবগুলো দাঁতই ফেলে দেওয়া হয়েছে, চোয়ালটাও ভেঙে গিয়েছে, ফলে ওর রক্তাক্ত, ফুলে ঢোল ঠোঁট দুটো বন্ধ করতে পারছে না।
ও অনিশ্চিত ভঙ্গিতে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। ফুলে ওঠা পায়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে কষ্ট হচ্ছে। ওর চোখ ক্রিস্টোফারের উপর দিয়ে ঘুরে গেলো কিন্তু তাতে পরিচিতির কোনো আভাস পাওয়া গেলো না। ভাঙা নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় শিষের মতো শব্দ হচ্ছে।
“তামান্না!” প্রায় কেঁদে উঠলো ক্রিস্টোফার। তামান্না উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। পরিচিত কণ্ঠটা কোত্থেকে আসছে ধরতে পারছে না।
“ওরা আমাদেরকে ছেড়ে দিচ্ছে!” তামান্নাকে বললো ক্রিস্টোফার। তামান্না নীরবে কাঁদতে শুরু করতেই ওর চেহারা আরো বিকৃত হয়ে গেলো। ওর বুক ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। সারা শরীর কাঁপছে।
“ছে…ড়ে… দেবে,” ওর ঠোঁট নড়লো কিন্তু শব্দটা শোনা গেলো না। ক্রিস্টোফার ওর দিকে এগিয়ে গেলো। প্রহরীদের ইশারা করলো ওকে ছেড়ে দিতে। ওরা পিছিয়ে গেলো।
“হ্যাঁ, এখান থেকে আমরা আরো সুন্দর, আরো অনেক ভালো একটা জায়গায় যাবো। আমরা পাখির মতো যেখানে খুশি উড়ে যাবো।”
“পাখি…” আবার বললো তামান্না। ক্রিস্টোফারকে চিনতে পেরে ফোঁপাতে শুরু করেছে। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে টলতে টলতে ওর দিকে আগাতে লাগলো। ক্রিস্টোফারও এগিয়ে গেলো। ডান হাতে বাঘের নখর খুলে রেখেছে।
“আর কোনো বাধা থাকবে না,” নরম সুরে বললো ক্রিস্টোফার। ও তামান্নার হাতের বাঁধন কেটে দিতেই ও ক্রিস্টোফারের উপর ঢলে পড়লো। ওর ফোলা ঠোঁটে চুমু খেলো ক্রিস্টোফার। তামান্না মরিয়া হয়ে ক্রিস্টোফারকে জড়িয়ে ধরতেই ও বাঘের নখটার ডগাটা তামান্নার ডান কানের নিচ বরাবর ঢুকিয়ে দিলো। তারপর এক পোচে ক্যারটিড ধমনী সহ সবগুলো প্রধান রক্তবাহিকা দিলো কেটে। গলগল করে বেরিয়ে এলো রক্ত। দুজনেই ভিজে গেলো তাতে। তামান্না খুব দুর্বলভাবে বাধা দিতে চাইলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার ওকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে ওর কানে বিড়বিড় করে নরম সুরে কথা বলতে লাগলো। আস্তে আস্তে প্রাণ বায়ু বেরিয়ে গেলো তামান্নার।
রানি নিজের সিংহাসনে সামনের দিকে ঝুঁকে আগ্রহ নিয়ে সবকিছু দেখছেন। তামান্নার মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে যথেষ্ট আমোদ পেয়েছেন বোঝা যাচ্ছে। দরবারের কেউ এক চুল নড়লো না বা কোনো কথা বললো না।
আচমকা তামান্না ওর কাটা শ্বাসনালী দিয়ে ঘড়ঘড় করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে স্থির হয়ে গেলো। ক্রিস্টোফারের কোলে আরাম করে ঘুমাচ্ছে যেনো। একটু পরেই ওর মাথা কাত হয়ে ক্রিস্টোফারের কাঁধে ঢলে পড়লো। পা শরীরের ভার ছেড়ে দিলো। ক্রিস্টোফার আলতো করে লাশটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।
“সাবাস!” হাতে তালি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠলেন রানি। ক্রিস্টোফার হতবাক হয়ে দেখলো রানি কাঁদছেন। “জীবনে এরচে সুন্দর আর মর্মস্পর্শী কিছু দেখিনি আমি।”
৫. ওয়ার্ম অ্যান্ড স্পঞ্জ
“ওয়ার্ম অ্যান্ড স্পঞ্জ!”
ক্রিস্টোফার মহলের উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রানির সৈন্যদের কামান দাগানো অনুশীলন করাচ্ছে। এখন আর ওকে সেই হতভাগ্য বন্দীর সাথে মেলানো যাবে না-যে কিনা একমাস আগেও কয়েদখানায় পচে মরার জোগাড় হয়েছিলো। পরিপাটি করে দাড়ি আঁচড়ানো, মাথার চুল পাগড়িতে ঢাকা। পরিষ্কার পোশাক পরনে এখন। তার উপর একটা কোট পরা।
তামান্নাকে হারানোর ক্ষত এখনো ওর মনে দগদগে ঘা হয়ে আছে, কিন্তু ক্রিস্টোফার কালারিতে থাকতেই নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। তবে এটা ও কোনোদিনও ভুলবে না, ঠিক সময়ে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে। ওর কোমরের কমলা কোমরবন্ধ থেকে একটা বাকানো ছুরি আর ধারালো তরবারি ঝুলছে। রানির সেনাবাহিনিতে ও কতোদূর এসেছে এটা দিয়ে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে এক মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে নিরাপদ মনে করে না ও। খুব দ্রুতই ধরে ফেলেছে যে দরবারের লোকজন দুই ভাগে বিভক্ত : একদল হচ্ছে পুলা-র দলে। এরা ইংরেজদের সাথে ব্যবসা করে লাভ করতে চায়। আর এক দলের সর্দার হচ্ছে টুঙ্গার। ও চায় লড়াই করতে। ক্রিস্টোফার বেঁচে আছে শুধু রানির বদৌলতে। রানি ঘুরে ফিরে একদলকে দিয়ে অন্য দলকে খেলিয়ে নেয়, ফলে দুই দলই সামলে থাকে। ক্রিস্টোফার না চাইতেও এই খেলার একটা ঘুটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ও ভালোমতোই জানে যে। যখন সময় আসবে তখন সবার আগে ওকেই বলির পাঠা বানানো হবে। আর এই প্রাসাদে শুধুমাত্র ক্রিস্টোফার একাই প্রতিশোধের নেশায় দিন গুনছে না।
