“আমার সৈন্যদের উরুমি চালানো শেখাতে পারবি?”
টুঙ্গার প্রতিবাদ করতে গেলো কিন্তু রানি ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। ক্রিস্টোফারের উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছেন উনি।
“পারবো,” ঘোষণা দিলো ক্রিস্টোফার। কিন্তু রানি আরও কিছু শুনতে চাচ্ছিলেন। “আমি ওদেরকে রণকৌশল-ও শেখাতে পারবো, যেভাবে টুপিওয়ালারা যুদ্ধ করে। ওদেরকে আরো দ্রুত কামানের গোলা ছোঁড়া-ও শেখাতে পারবো। আমি ওদেরকে এমন এক সৈন্যদলে রূপান্তরিত করতে পারবো যা এদেশের কেউ কখনো দেখেনি।”
“এসবের কোনো দরকার নেই,” পুলা আপত্তি করলো। “ব্যবসা-ই হচ্ছে ক্ষমতার মূলমন্ত্র। যারা-ই যুদ্ধ করে, তারা না খেয়ে মরে।”
রানি ওর দিকে এমনভাবে তাকালেন যে সেই দৃষ্টিতে একটা হাতীও কুপোকাত হয়ে যেতো। “ঐ টুপিওয়ালাদের জন্যে আমার অনেক লোক আহত হয়েছে, রানি বললেন। “ওদেরও জানা দরকার যে আমরাও মাথা উঁচু করতে চলতে জানি। ওদের জাহাজ আর কামানের ভয় করি না। ওরা যদি আমার সামনে মাথা নত না করে, তাহলে এমন শিক্ষা দেবো যে সারা জীবনেও ভুলতে পারবে না।”
টুঙ্গার ওর গালে হাত বুলালো। মুখের ক্ষতটায় মালিশ করছে। “মহামান্য রানিই ভালো বোঝেন।”
“তবে তার আগে আমাকে এই জানোয়ারটার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।” রানি এমনভাবে কথা বললো যেনো ক্রিস্টোফার এখানে নেই। সবাই যখন ওর দিকে একযোগে তাকালো তখন ও কথাটার অর্থ ধরতে পারলো।
ও কুর্নিশ করে বললো, “আমি শুধু আপনার আনুগত্য করবো।”
রানি সিংহাসনে বসেই সামনে ঝুঁকে এলেন। “তুই আমার প্রজাদের লুট করেছিস, নিরীহ লোকজনকে খুন করেছিস, আমার উপদেষ্টাকে হেনস্থা করেছিস। তোর মতো লোকদেরকে আমরা কি শাস্তি দেই সেটা কি জানা আছে?
ক্রিস্টোফারের রাস্তার দুই ধারে শূলে চড়ানো লোকগুলোর কথা মনে এলো। এর মধ্যে প্রথমজন, মানে বিজয়ের এতোক্ষণে মারা যাওয়ার কথা। ও ভয়ার্ত মুখে মাথা ঝাঁকালো।
“তোর কি মনে হয় যে তোকে মাফ করে দেওয়া উচিত?”
“আমি মহানুভবের করুণা ভিক্ষা চাচ্ছি। সর্বস্ব দিয়ে আপনার সেবা করার সুযোগ দিয়ে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের একটা সুযোগ দিন।”
রানি ভাবতে লাগলেন। “তোর এক ডাকাত সহযোগী এখনো বেঁচে আছে,” বললেন উনি।
রানি আর কিছু না বলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন, সেই দৃষ্টি দেখেই ক্রিস্টোফার বুঝে গেলো উনি কি বোঝাচ্ছেন। এটাই ওর ছড়ান্ত পরীক্ষা-ওর আনুগত্য প্রমাণ করে, জীবন বাঁচিয়ে মুক্তি পাওয়ার এটাই সর্বশেষ উপায়। একজন সত্যিকার ক্ষমতাবানের মতো রানি ঠিকই টের পেয়েছেন দুনিয়াতে ওর কাছে মূল্যবান আর কি আছে। উনি চান ক্রিস্টোফার তামান্নাকে খুন করুক।
ক্রিস্টোফার কি তামান্নাকে জঙ্গলের ওই ঢালটা থেকে লাফ দিতে দেয়নি এভাবে মরার জন্যে? ও পারবে না। চোখের কোনা দিয়ে আরো একবার উরুমিটার দিকে তাকালো ও। একবার যদি জিনিসটা হাতে পান্তু তাহলে এদের সবাইকে খুন করতে পারবে; তারপর প্রহরীদেরকেও মেরে কয়েদখানায় গিয়ে তামান্নাকে মুক্ত করে পালিয়ে যাবে। এখানে নিশ্চয়ই আস্তাবল আছে। ঘোড়ায় চড়ে দরকার হলে চীন চলে যাবে। নতুন পরিচয়ে, নতুন করে শুরু করবে জীবন।
কিন্তু সকল কল্পনা এক আছাড়ে বাস্তবতায় নেমে এলো। ঘরে বিশজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। ও উরুমিটা ছোঁয়ার আগেই মারা পড়বে। অথবা আরো খারাপ কিছু হতে পারে, হয়তো ওকে না মেরে আবার কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হবে। শূলে বিদ্ধ হওয়ার তীব্র যন্ত্রণা মনে পড়লো ওর। কয়েদখানার নিঃসীম অন্ধকারের কথা মনে পড়লো। বুঝলো যে আর কোনো উপায় নেই।
“আমি ওকে খুন করবো,” রাজি হলো ক্রিস্টোফার। “আমাকে উরুমিটা দিন, ওকে মেরে ওর কাটা মুণ্ডু আপনার সামনে পেশ করবো।”
রানির মুখোভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হলো না। কিন্তু তার চোখের আড়ালে যেনো এক প্রেতাত্মার হাসি দেখা গেলো ক্রিস্টোফার।
“আমি চাই তুই শুধু ঐ ডাকাত মহিলাকে খুন কর। মহলের সবাইকে না।”
রানি তুড়ি বাজাতেই একজন চাকর এগিয়ে এসে রানির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে একটা আইভরির নকশা কাটা কাঠের বক্স সামনে তুলে ধরলো। রানি ঢাকনিটা তুলতেই দেখা গেলো ভিতরে রেশমি কাপড়ের উপর একটা ছোট ছুরি শুয়ে আছে। হাতলটা একটা স্বর্ণের আংটির মতো, ভাঁজ করা ফলাটা পালিশ করা ইস্পাতের তৈরি, সর্বোচ্চ দুই ইঞ্চি লম্বা। রানি ওটা বক্স থেকে বের করে, একটা বাচ্চার প্রিয় খেলনার মতো করে আদর করতে লাগলেন।
“এটার নাম বাঘের-নখ, ক্রিস্টোফারকে বললেন রানি। “আমার মনে হয় না কালারিতে এরকম কিছু ছিলো।”
ক্রিস্টোফার মাথা নাড়লো। “এটা খুবই সুন্দর,” ফিসফিসিয়ে বললো ও। ছুরিটার ফলায় উপরের জানালা থেকে আলোক রশ্মি এসে পড়তেই ওটার খোদাইগুলো থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। ক্রিস্টোফার বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো।
রানি তার ডান হাতের তর্জনীতে আংটিটা পরে নিলেন। ফলাটা ভাঁজ হয়ে তার হাতের তালুতে লুকিয়ে থাকলো। হাত মুঠ করতেই আর ওটা দেখা গেলো না।
“এটা নে। দেখা যাক তোর হাতে এটা মাপমতো হয় নাকি।”
ক্রিস্টোফার ওটাকে আঙুলে পরে হাত মুঠি করে স্বর্ণের নখরটাকে ঢেকে রাখলো। হাতটা খুলতেই ওটার ভাজ আপনা আপনিই খুলে ছুটে গেলো সামনে। ও হাতটা একবার ডানে আর একবার বামে চালালো, আর ছুরিটা হিসহিসিয়ে বাতাস কেটে দিলো।
