অবশেষে প্রহরীরা এলো। তবে কেউই ওকে সামান্যতম দয়াও দেখালো না। বাধন খুলে টানতে টানতে নিয়ে গেলো মহলের ভিতর দিয়ে। তখনও উলঙ্গ ও। মহলের ভিতরের দুই ধার সুদৃশ্য ভাস্কর্য দিয়ে ভরা, দেয়াল জুড়ে বিশাল বিশাল কাঠের জানালা। কোনদিকে যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার কিছুই টের পেলো না ক্রিস্টোফার। অনেকবার দিক বদলের পর একটা ভারি পিতলের দরজার সামনে এসে উপস্থিত হলো ওরা। ওখানকার দরজার পাহারাদার ক্রিস্টোফারকে দেখে নাক সিটকে ওখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করলো। কিন্তু ওকে ধরে আনা প্রহরীরা ধমক দিলো তাকে।
“রানির আদেশ।”
দরজা খুলে গেলো। ভিতরের ঘরটা বোম্বের দুর্গের বিশাল পার্টি রুমটার চাইতেও বড়। সুদৃশ্য পর্দা আর দামী চিত্রকর্ম ঝুলছে দেয়ালে। প্রহরীরা ঘরের শেষ মাথার বাঘের ছালের তৈরি কার্পেটের উপর নিয়ে দাঁড় করালো ওকে। পুলা আর টুঙ্গার ওখানে একটা সুন্দর নকশা কাটা মেহগনী কাঠের সিংহাসনের সামনে মাথা নত করে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। আর সিংহাসনে বসে আছে একজন কম বয়সী সুন্দরি মহিলা। চোখ নিচু করে রাখায় ক্রিস্টোফার অবশ্য ভালো করে তার চেহারাটা দেখতে পেলো না। প্রহরীরা ওকে ধাক্কা দিয়ে হাঁটু ভেঙে বসিয়ে দিলো। তবে মেয়েটার অপার্থিব সৌন্দর্য, তার পরনের আড়ম্বর পোশাক আর মাথার মুকুটটা দেখে ক্রিস্টোফারের বুঝতে বাকি রইলো না যে ইনিই হচ্ছেন চিত্তাত্তিঙ্কারার রানি।
পুলা আর টুঙ্গার কিছু একটা নিয়ে তর্ক করছিলো। রাগে লাল হয়ে আছে। পুলার চেহারা। আর টুঙ্গারের কাটা দাগটা মনে হলো দপদপ করছে। ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে রাগ সামলাতে যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে তাদের।
“ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই,” পুলা বললো। “আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই ওদের উপর নির্ভরশীল।”
“আমরা না, আপনি ওদের উপর নির্ভরশীল,” টুঙ্গার জবাব দিলো।
“রানিকে ওদের একচেটিয়া ব্যবসার পক্ষে রাখার জন্যে ইংরেজরা আপনাকে কতে দেয়?”
“আমি শুধু চাই আমাদের কাপড়গুলোর জন্যে একটা লাভজনক বাজার। ইংরেজরা ছাড়া সেগুলো আর কেউ কিনবে না।”
“টুপিওয়ালা আরো আছে। ওরা আমাদেরকে এর চাইতে বেশি টাকা দেবে।”
ক্রিস্টোফারের আগমনে কোনো ভাবান্তরই হলো না ওদের। ও জবুথবু হয়ে মেঝেতে বসে বসে কেনো ওকে কয়েদখানা থেকে এখানে আনা হলো সেটা ভাবতে লাগলো।
সিংহাসনে বসা মহিলাটা তার হাত তুললেন। হাতের সোনার বালাগুলো শব্দ করে উঠলো তাতে। সাথে সাথে লোক দুজন চুপ করে গিয়ে একান্ত বাধ্যগতের মতো মাথা নিচু করে রইলো।
“ব্রিঞ্জোয়ানের ইংরেজগুলো একেকটা পাতি শেয়াল। ওরা আমাদের লোকজনকে চুষে খাচ্ছে,” ঘোষণা দিলেন মহিলা। “এতোবার সাবধান করার পরেও ওরা আমাদেরকে কাঁচকলা দেখিয়েই চলেছে।”
টুঙ্গার খোঁচা মারা হাসি হাসলো একটা। পুলা মাথা নিচু করে রানির কথাই মেনে নিলো। “জ্বী, মহামান্য।”
“যাই হোক। আমরা প্রতিহিংসাপরায়ণ নই। আর কোনো উপায় না থাকলে শুধুমাত্র তখনই যুদ্ধ হবে।” রানি বললেন।
এখন পুলা-ও সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালো।
“তুই কি টুপিওয়ালা নাকি?” রানি জিজ্ঞেস করলেন।
মেঝেতে মাথা নামিয়ে বসে থাকায় ক্রিস্টোফার বুঝতে পারেনি যে ওকেই করা হয়েছে প্রশ্নটা। টুঙ্গার ওর পাজরে একটা লাথি কষিয়ে ওর সম্বিত ফেরালো। “মহামান্য রানি তোকে কি জিজ্ঞেস করেছে শুনতে পাসনি?”
ক্রিস্টোফার শশব্যস্ত হয়ে হাঁটুর উপর ভর করে বসে রানির দিকে তাকালো। ঠিক একজন হিন্দু দেবীর সৌন্দর্য নিয়ে তার সিংহাসনে বসে আছেন রানি। সারা বাহুতে স্বর্ণ আর আইভরির বালা; কাপড় সেলানো হয়েছে সোনার সুতা দিয়ে। তাতে মুক্তা বসানো। মাথায় একটা রাজমুকুট, ওটা থেকে একটা টকটকে লাল চুনি নেমে এসে ঠিক তার দুই চোখের মাঝখানে ঝুলছে। কালারিতে পড়াশোনার সুবাদে ক্রিস্টোফার জানে যে ওটা দিয়ে আসলে ষষ্ঠ চক্রকে বোঝানো হয়। জিনিসটা হচ্ছে নিগঢ় জ্ঞানের আধার। আলমন্ডের মতো দেখতে চোখ দুটো ওর দিকেই তাক করা, সে চোখের ভাষা পড়ার সাধ্য কারো নেই।
“জ্বী,” মাথা ঝাঁকালো ক্রিস্টোফার। “আমি টুপিওয়ালা।”
“তাহলে এর মানে কি?”
রানি চোখ দিয়ে এক চাকরকে ইশারা করলেন। লোকটার হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ। রানির প্রতিটা নাড়াচাড়া সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করতে করতে সে সামনে এসে হাতের ব্যাগটা উপুড় করে দিলো। উরুমিটা বেরিয়ে এসে থ্যাপ করে পড়লোমেঝের উপর। ক্রিস্টোফার ওটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠিক যেরকম করে একটা বিড়াল পাখির দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে হিসেব কষছে ওটা কতো দূরে, আর ওর ঐ পর্যন্ত পৌঁছাতে কতো সময় লাগতে পারে।
টুঙ্গার পা দিয়ে উরুমিটা চেপে ধরে নিজের তরবারির হাতলে হাত রাখলো। যা বোঝার বুঝে নিলো ক্রিস্টোফার।
“আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি,” ক্রিস্টোফার ব্যাখ্যা করলো। “একজন আসান আমাকে তার কালারিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ওখানেই আমি কালারিপায়াত্ত শিখেছি।”
“মিথ্যে বলছে ও,” পুলা বললো।
“একজন ইংরেজকে ডেকে আনুন। আমার কথা শুনলেই উনি বুঝবেন যে আমি কোন দেশের মানুষ,” ক্রিস্টোফার অনুরোধ করলো। কারণটা জানে না, তবে এটা বুঝতে পারছে ওর জীবন মরণ এখন ওর জাতীয়তার উপর নির্ভর করছে।
