দ্বিতীয় দিন বিকেলের শেষে ওরা মহলের সদর দরজায় গিয়ে পৌঁছালো। ওদের ঠিক উপরে আকাশে পাখিরা চক্কর দিচ্ছে। যেন ওরা আগেই টের পেয়েছে যে একটু পরেই ওদের ভোজের জন্যে পচা মাংস পাওয়া যাবে। মহলের ভিতরের লোকেরাও বেরিয়ে এলো কাহিনি দেখার জন্যে।
টুঙ্গারের লোকেরা জঙ্গলে থাকতেই গাছ কেটে, এক প্রান্ত চোখা বানিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছে। ক্রিস্টোফার আর তামান্নাকে উলঙ্গ করে রাস্তার মাঝে বসিয়ে দিলো সৈন্যরা। দুজনের মাঝে দূরত্ব কয়েক ফুট। পুলা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে সমাগত লোকজনের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে লাগলো। ওর উচ্চ কিন্তু আত্মম্ভরি গলায় ক্রিস্টোফার আর তামান্নার সকল অপরাধের গা শিউরানো বর্ণনা দিলো প্রথমে। দর্শকেরা সবাই আঁতকে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের ঘামে ভেজা চোখ দিয়েও ওদের চেহারা পড়তে পারলো ক্রিস্টোফার। ভয় পেলেও ওরা সবাই মজা দেখতে আগ্রহী।
পুলা তার বক্তব্য শেষ করলো রানির অকুণ্ঠ প্রশংসা করার মধ্য দিয়ে। ক্রিস্টোফার ইতিউতি তাকাতে লাগলো। রানি ওর শাস্তি দেখতে এসছেন কিনা দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাকে কোথাও দেখা গেলো না। পুলা টুঙ্গারের দিকে ইংগিত করতেই ও ওর একজন লোককে কিছু একটা আদেশ দিলো।
ওরা শূল দুটো নিয়ে এলো! উঁচিয়ে ধরে রেখেছে যাতে দর্শকেরা ওটার তীক্ষ্ণতা ভালোমতো দেখতে পায়। ওগুলো কিভাবে ওদের শরীরে ঢুকে যাবে সেটা ভেবে অনেকেই শিহরিত হলো। শূল দুটো দেখেই ক্রিস্টোফারের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়লো। উল্টোপাল্টা বকতে আরম্ভ করলো ও। ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিচু গলায় বিড়বিড় করতে লাগলো। “আমাকে মাফ করে দাও। আমি ভালো হয়ে যাবো। দরকার হলে জ্বলন্ত কয়লার উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে রানির পায়ে চুমু খাবো। আমি ওনার দাস হয়ে থাকবো। সারাজীবন ওনার সেবা করবো। ও ঈশ্বর, আমাকে বাঁচাও।”
দর্শকেরা মজা পেয়ে হাসতে লাগলো। ওকে নকল করে ভেংচি কাটতে লাগলো অনেকে। আতংকের চোটে না বুঝেই ক্রিস্টোফার ইংরেজিতে বকবক আরম্ভ করেছে। এমনকি তামান্নাও ওকে আগে কখনো ইংরেজিতে কথা বলতে শোনেনি।
“চোপ,” নিজের ভাষায় বললো তামান্না। “মরবি তো মাথা উঁচু করে মর।”
পুলা বিরক্ত হয়ে, ভ্রু কুঁচকে লোকদেরকে দ্রুত কাজ শেষ করতে বললো। শুলটা প্রস্তুত করে ফেললো সৈন্যরা। ডগা থেকে খাসীর চর্বি ঝরে পড়ছে।
কিন্তু টুঙ্গারের মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলছে। ও পুলাকে ডেকে নিয়ে ক্রিস্টোফারকে দেখিয়ে রেগেমেগে কিছু একটা বলা শুরু করলো। মাথা ঠিকমতো কাজ না করায় ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো না যে ওরা কি বলছে। তবে বোঝা গেলো যে ব্যাপারটা জরুরি। সম্ভবত ওদেরকে অত্যাচার করার নতুন কোনো পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করছে।
তবে নতুন কোনো আদেশ নিষেধ আসার আগেই ওর নিতম্বের ভিতর দিয়ে ঢুকে গেলো শূল। টানা দুই দিন ধরে দেখতে থাকা ভয়ানক দৃশ্যগুলোর কারণে শূলটা শরীর স্পর্শ করা মাত্র চেঁচিয়ে উঠলো ক্রিস্টোফার। উপুড় হয়ে ধুলোর মধ্যে শুয়ে ও তামান্নার চোখের দিকে তাকালো। ও একদম সোজা হয়ে আছে। একটু শব্দ করছে না।
“ভালোবাসি তোমাকে,” ঠোঁট নেড়ে বললো তামান্না।
ওর মনের জোর দেখে লজ্জা লাগলো ক্রিস্টোফারের। ও-ও ঠোঁট কামড়ে পড়ে রইলো যতোক্ষণ না রক্ত বের হয়। শূলটা. প্রবেশের ব্যথা গিলে নেওয়ার চেষ্টা করলো পুরোটা। প্রহরীরা ওর সাথে শয়তানী করছিলো আরো বেশি। সামান্য একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে নিচ্ছিলো। প্রতিটা কাতর ধ্বনিতে মজা পাচ্ছিলো ওরা। মারা পড়তে কতোক্ষণ লাগবে সেটাই ভাবছিলো ক্রিস্টোফার।
আবার ওটাকে বের করে নেওয়া হলো। একেবারে পুরোটা। ক্রিস্টোফার নিজেকে শক্ত করে নিলো। ওরা নিশ্চিত এবার এক ধাক্কায় পুরোটা একবারে সেঁধিয়ে দেবে। ওকে চিরে একেবার শরীরের ভিতরটা পর্যন্ত চলে যাবে শূল।
কিন্তু আর খোঁচা দিলো না কেউ। টুঙ্গার ওর লোকদেরকে চিৎকার করে কিছু একটা বললো। আর পুলা টুঙ্গারের সাথে রাগারাগি করতে লাগলো। ক্রিস্টোফার তার এক বর্ণও বুঝলো না। দর্শকেরা দুয়ো ধ্বনি দিতে শুরু করলো। তবে টুঙ্গার একবার চোখ গরম করে তাকাতেই পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো ভীড়ের মাঝে। আস্তে আস্তে ভীড় পাতলা হয়ে এলো।
প্রহরীরা ক্রিস্টোফার আর তামান্নাকে টেনে দাঁড় করিয়ে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ভিতরে নিয়ে গেলো।
*
মহলের ভিতরের কয়েদখানায় প্রবেশের পর ওদের দুজনকে দুই জায়গায় নিয়ে গেলো প্রহরীরা। ক্রিস্টোফারকে একটা খুপরির ভিতর ঢুকিয়ে বেঁধে রাখা হলো। তবে তামান্নাকে কি করা হলো তা ও জানে না। কয়েদখানার পাথরের দেয়ালের সাথে শেকল দিয়ে ওকে বেঁধে রেখে চলে গেলো সবাই।
ওখানে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব ভুলে গেলো ক্রিস্টোফার। এই নিঃসীম অন্ধকারে একাকী থাকতে থাকতে ওর মনে হতে বোধহয় কবরে শুয়ে আছে। শুধু গায়ের ব্যথাটা মনে করিয়ে দিতো যে ও বেঁচে আছে। ওর কবজি আর ঘাড় শেকলে ঘষা খেয়ে ছুলে গিয়েছে, সেখানে ব্যথা করে। পায়ুপথে রক্ত আর পায়খানা শক্ত হয়ে জমে আছে। ভয়ানক ক্ষুধায় থেকে থেকে মোচড় দিয়ে উঠছে পেট। মেঝের একটা গর্ত থেকে পানি প্রবাহের শব্দ শোনা যায়। কয়েদখানার নিচ দিয়ে একটা নদী চলে গিয়েছে সম্ভবত। এদিকে পিপাসায় ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। তাই ব্যথার চাইতে ওর জন্যে এটাই সবচে বড় অত্যাচার। শুধু মনে হয় পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ ভরে ঠাণ্ডা পানি খাবে।
