“তাড়াতাড়ি মরবো এতে। ওরা যদি ধরতে পারে, তাহলে এতো অত্যাচার করবে যা সহ্য করার চেয়ে মরাই ভালো।”
“আই লাভ ইউ, ক্রিস্টোফার ওর মুখের সামনে বললো। “আর আমরা যতোক্ষণ বেঁচে আছি, ততোক্ষণ কোনো না কোনো উপায় বের হবেই।”
তামান্না হাত মুচড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। আমি একবার তোমার কথা শুনে এখন পস্তাচ্ছি। আর না। জীবন থাকতে আমি ওদের হাতে ধরা দেবো না।”
তামান্না মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে প্রায় ছাড়িয়েই নিয়েছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার আচমকা ওর উপর নিজের সমস্ত ভর চাপিয়ে দিয়ে জোর করে মাটিতে শুইয়ে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রথম কুকুরটা ওদের পিছনের আগাছার জঙ্গল থেকে লাফ দিয়ে সামনে বাড়লো। কুকুরগুলোর পরে উর্দিপরা লোকজন ছুটে এলো পিছনে। হাতে মুগুর। ওরা দৌড়াতে গিয়ে সোজা মাটিতে পড়ে থাকা ক্রিস্টোফার আর তামান্নার উপর হোঁচট খেলো। তখনও ধ্বস্তাধস্তি করে যাচ্ছে ওরা। সৈন্যরা হাতের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে অর্ধ অচেতন করে ফেললো ওদেরকে। তারপর ঝটপট হাতে হাতকড়া পরিয়ে গলায় শেকল বাঁধা। বেড়ি পরিয়ে দিলো। শেকলের অপর প্রান্ত দুটো ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা। ঘোড়া দিয়ে টেনে ওদেরকে আবার সেই ফাঁকা জায়গাটায় নিয়ে ব্রাসা হলো। যেখানে ওরা সিন্দুকটা আর মাতাল সঙ্গীদের ছেড়ে গিয়েছিলো।
সেখানে পৌঁছার পর ক্রিস্টোফার ওদের বন্দিকারীদের দেখতে পেলো। এরা সবাই নির্ভীক সৈনিক আর খুব ভালো ঘোড়সওয়ার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সবার পরনে একই রকম ভারী কাপড়ের উর্দি, ইস্পাতের শিরস্ত্রাণ, আর কোমরে কমলা রঙের একটা কাপড় বাধা। দেখেই বোঝা যায় এদের আত্মবিশ্বাস পাহাড় সমান। ক্রিস্টোফার ঠিক করলো যে ও মোটেও আগ্রাসী মনোভাব দেখাবে না, বা ও যে দক্ষ যোদ্ধা সেটাও প্রকাশ করবে না, বরং বিনয়ী আর ভদ্র ভাব দেখাবে। সেজন্যেই চোখ নিচু করে ওরা যা যা বললো তা শুনতে লাগলো।
ওদের সাবেক বন্দী, পুলা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে মাঝখানে। এইতো খানিকক্ষণ আগেও যে ও নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে তোতলাচ্ছিলো বারবার তা বোঝার কোনো উপায় এখন নেই। নতুন কাপড় পরেছে সে। চুল দাড়ি আচড়ে সোজা হয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রিস্টোফার আর তামান্নাকে দেখতে পেয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সে।
“বাতাস এখন উল্টোদিকে মনে হচ্ছে, কাষ্ঠ হাসি হেসে বললো ও।
“এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে খুঁজে পেলেন আমাদের?” কণ্ঠে যতোটা সম্ভব ভয় ঢেলে জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার।
“স্বর্ণের গন্ধ পাই আমি।” পুলা কাঠের সিন্দুকটায় লাথি মেরে বললো। তারপর ঢাকনা খুলে নাক টেনে লম্বা একটা দম নিলো। “এটা থেকে যে মৌরির ঘ্রাণ আসছে সেটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছিস? তোদের ধারণা আমার বাড়ির লোকজন মুক্তিপণের টাকা খামাখা এরকম একটা ভারি সিন্দুকে ভরে পাঠিয়েছে শুধু তোদেরকে একটু কষ্ট দেওয়ার জন্যে? প্রতিবার যখনই এটাকে মাটিতে নামিয়ে রেখেছিস, তখনি সেখানে একটা করে চিহ্ন থেকে গিয়েছে। আরো ভালো করে বললে গন্ধ থেকে গিয়েছে। টুঙ্গার আর ওর কুকুরগুলোর সেই গন্ধ শুঁকে পিছু নিতে তাই কোনো কষ্টই হয়নি।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে ইঙ্গিতে দেখালো পুলা। চলনে বলনে সব দিক থেকে পুলা-র উল্টো সে। পুলা হচ্ছে বেঁটে, মোটা আর চেহারা গোল আলুর মতো। টুঙ্গার লম্বা, দেখতে ভয়ঙ্কর। চেহারার মাঝ বরাবর একটা কাটা দাগ। এতো জোরে আঘাত পাওয়ার পরেও লোকটা বেঁচে আছে কিভাবে ভেবে পেলো না ক্রিস্টোফার। পাগড়িতে একটা হলুদ রঙের পাখির পালক আটকানো। লোকটাকে দেখেই বোঝা যায় হুকুম করার জন্যেই জন্ম হয়েছে তার।
“আর আপনি তাহলে আসলে কে?” ক্রিস্টোফার জিজ্ঞে করলো।
“আমি কোনো সওদাগর না,” পুলা জবাব দিলো। আমি মহামান্য চিত্তাত্তিস্কারার রানি-র একজন উপদেষ্টা। উনি তার প্রজাদের দুঃখ কষ্ট একদম পছন্দ করেন না। তাকে যারা অসন্তুষ্ট করে উনি তাদের কেমন শিক্ষা দেন তা তোরা একটু পরেই দেখতে পাবি।”
টুঙ্গারের লোকজন সাথে আনা একটা গাড়িতে সিন্দুকটা তুলে নিলো। তামান্নার দলের সবাইকেই ঘোড়ার পিছনে শেকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দলটা আগে বাড়লো।
ক্রিস্টোফার ঠিক জানে না যে কতোদূর হাঁটতে হলো ওদের। টুঙ্গার যখন থামার আদেশ দিলো তখন ওর পা এতো বেশি ব্যথা করে উঠলো যে মনে হলো আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না। বন্দীরা সবাই ধপ ধপ করে রাস্তার ধারে শুয়ে পড়লো। মাছি এসে বসতে লাগলো ক্রিস্টোফারের উপর; পিঁপড়া আর নানা পোকামাকড় ওর ছড়ে যাওয়া পায়ের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু হাত বাঁধা থাকায় ওগুলোকে তাড়িয়েও দিতে পারলো না।
কয়েকজন প্রহরী বনের ভিতরে চলে গেলো। এই ব্যথার ভিতরেও ক্রিস্টোফার কাঠ কাটার ছন্দময় কুড়ালের শব্দ শুনতে পেলো। সম্ভবত ওরা রান্না করার জন্যে লাকড়ি কাটছে। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও।
“আমাদেরকে কি করবেন?” পুলাকে জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার। ওর মাথায় একটা বুদ্ধির উদয় হয়েছে। “রানির কাছে নিয়ে যাবেন?”
পুলা অবজ্ঞাসূচক একটা শব্দ করলো। “তোর মতো একটা অসভ্য ইতরের জন্যে আমি মহামান্য রানির সময় নষ্ট করাবো না।”
“আমদেরকে ওনার কাছে নিয়ে যান, ক্রিস্টোফার অনুনয় করল। “আমার যে দক্ষতা তা ওনার ভালোই কাজে লাগবে।”
