“বেশিক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যাবে না কিন্তু,” সাবধান করলো তামান্না। “একটা। শহরে পালিয়ে যেতে হবে, বড় কোনো শহরে। যেখানে আমাদেরকে কেউ খেয়াল করবে না বা চিনবেও না। ওখানে রসদপত্র কিনে বর্ষাটা কাটিয়ে দেবো। তারপর একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করে অপেক্ষা করতে থাকবো। আবার যখন লোকজন রাস্তাটা ব্যবহার শুরু করবে তখন কাজে নেমে পড়বো।”
বর্ষাকালের দীর্ঘ বৃষ্টিময় বিকেলগুলোর কথা মাথায় ঘুরতে লাগলো ক্রিস্টোফারের। ও আর তামান্না কিভাবে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পারবে সেটা জানা আছে ওর। ভাবনাটা মাথায় আসতেই পায়জামার ভিতরে একটা শিহরণ অনুভব করলো যেনো। তামান্নার হাতটা টেনে নিয়ে নিচের দিকে ঠেলে দিলো ও। তামান্নাও হেসে দুষ্টুমিভরা চোখে চাইলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্রিস্টোফারের হাত ধরে টেনে জঙ্গলের আরও ভিতরে একটা ঘাসে ছাওয়া জায়গায় নিয়ে এলো। পা দিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে ঘাস মাড়িয়ে দিলো যাতে সাপ খোপ থাকলে সরে যায়।
মুহূর্ত পরেই এই জগত ছেড়ে অন্য আর এক অলৌকিক জগতে হারিয়ে গেলো যেনো ওরা। যে জগতে কামনা আর সুখ বাদে আর কিছু নেই।
*
ওরা জেগে উঠে একজন আর একজনের বাহুডোরে শুয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কি জন্যে ঘুম ভেঙেছে বুঝতে পারছে না ক্রিস্টোফার। আশেপাশে টু শব্দটাও নেই, কেমন একটা অশুভ নীরবতায় ছেয়ে আছে চারপাশ। ভয়ানক আতংক ছড়িয়ে বুকের ওপর চেপে বসছে সেটা।
“কি হয়েছে?” তামান্না বলতে গিয়েও থেমে গেলো, কারণ দুজনেই কুকুরের ডাক শুনতে পেয়েছে। ওরা দ্রুত উঠে পড়ে ত্রস্ত হাতে কাপড় খুঁজতে লাগলো।
ক্রিস্টোফার তামান্নার হাত ধরলো। “ওরা শিকারে বেরিয়েছে, আর আমরা হচ্ছি শিকার।”
“স্বর্ণটা নিয়ে আসি চলো।”
“এখন ওসব নেওয়া যাবে না। ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারবো না। এক মাইল যাওয়ার আগেই কুকুর ধরে ফেলবে। তাড়াতাড়ি!” ওরা যেখানে ওদের সঙ্গীসাথী আর স্বর্ণে ভরা সিন্দুকটা রেখেছিলো সেখানে দৌড়ে গেলো।
লোকজন এলোমেলো ভাবে জায়গাটায় ছড়িয়ে শুয়ে আছে। বেশিরভাগই আরকের বোতল খুলে বসেছে। ক্রিস্টোফার গালাগাল করতে করতে সবচে কাছের লোকটার গায়ে লাথি ছুড়লো।
“ওঠ, শালা মাতালের দল।”
“ছাড়ো ওদের, যা আসছে তা ওদের প্রাপ্য, তামান্না আদেশ দিলো ক্রিস্টোফারকে। “পকেটে যতোটা সম্ভব স্বর্ণ নিয়ে নাও, তারপরেই আমরা পালাবো।”
সিন্দুকটা তখনও মাঝে রাখা। ওরা দৌড়ে গেলো ওটার দিকে। ক্রিস্টোফার ঢাকনা খুলে যতোগুলো পারলো স্বর্ণের প্যাগোড়া নিজের পকেটে ভরে নিলো।
“হয়েছে!” তামান্না দড়াম করে ঢাকনাটা লাগিয়ে দিলো। তারপর কান পেতে আশেপাশে শোনার চেষ্টা করলো। কুকুরের ডাক আরো জোরে শোনা গেলো, আর ক্রিস্টোফারের মনে হলো ওগুলোর পায়ের ধাক্কায় জমি থরথর করে কাঁপছে।
“ঘোড়া!” অবাক হলো ক্রিস্টোফার। “তার মানে ওরা আসলেই আমাদের পিছু নিয়েছে।” এতোগুলো মাস ধরে ওরা এসব রাস্তায় চরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়জনের বেশি ঘোড়সওয়ার চোখে পড়েনি। যার একটা ঘোড়া পালার সামর্থ্য আছে, তাকে ভয় না পেয়ে উপায় নেই। ক্রিস্টোফার আবার মাথা কাত করে শোনার চেষ্টা করলো। শুনে মনে হলো পুরো একটা অশ্বারোহী দল ওদেরকে ধরতে বেরিয়েছে।
তামান্নার হাত ধরে জঙ্গলের ভিতরের দিকে দৌড় দিলো ও। মাটি আগাছায় ভরে, আর ওগুলোর অনেকগুলোই কাঁটাওয়ালা। আধা মাইল যাওয়ার আগেই দুজনের হাত পা ছড়ে রক্ত ঝরতে লাগলো। পিছনে ঘোড়ার হ্রেষা ডাক আরো কাছিয়ে আসছে। মাতাল লোকগুলো আর স্বর্ণ ভরা সিন্দুকটা খুঁজে পাওয়া মাত্র ওদের ধাওয়াকারীদের উল্লাস ধ্বনিও কানে আসলো।
ক্রিস্টোফার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আশা করলো যাতে গাছের ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণটা চোখে পড়ে। কারণ রাতের অন্ধকারে ও কোনদিকে যে দৌড়াচ্ছে তার কিছুই ঠাহর করতে পারছে না। ওরা শুধু পিছনের ঘোড়ার শব্দের আগে আগে দৌড়ে চললো। সূর্য পুরোপুরি ওঠার আগ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যেও থামলো না।
আচমকা ওদের সামনে জঙ্গল শেষ হয়ে গেলো। ঝোঁপ জঙ্গল মাড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলো ওরা। তাই ব্যাপারটা প্রথমে খেয়াল করতে পারলো না। একেবারে শেষ মুহূর্তে ক্রিস্টোফারের চোখে পড়লো যে সামনে কিছুই নেই। ও তামান্নাকে টান দিয়ে একটা হাত দিয়ে কাঁধের পিছন দিকে জড়িয়ে ধরলো। একটুর জন্যে বেঁচে গেলো ওরা। নইলে দুজনেই একসাথে খাড়া খামায় পা হড়কে সোজা কয়েকশো ফুট নিচে এক শুকনো পাথুরে নদীবক্ষে গিয়ে পড়তো।
বর্ষাকালে নদীটা প্রমত্তা হয়ে ওঠে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন সেটা চোখা পাথরের ভরা একটা খাদ বাদে আর কিছু না।
কিছুক্ষণ ওটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তামান্না। তারপর মাথা ঘুরিয়ে পিছনের শব্দ শোনার চেষ্টা করলো। কুকুরগুলো খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। ওদের ঘ্রাণ কাছিয়ে আসায় উত্তেজনায় গরগর করছে।
“আমি এদের হাতে ধরা দেবো না।” তামান্না মন ঠিক করে ফেললো। তারপর ক্রিস্টোফারের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, “আমি লাফ দিচ্ছি।”
“না, আমি তা করতে দেবো না।” ক্রিস্টোফার আরো জোরে তামান্নার কবজি চেপে ধরলো। পিছনে ঘোড়া আর কুকুরের আগমন ও নিজেও টের পাচ্ছে। সেই সাথে এখন যোগ হয়েছে মানুষের পদশব্দ।
