কুলিগুলো যাওয়ার পরেও ক্রিস্টোফার আর তামান্না নড়লো না। গুহার মাঝখানে একটা প্যাগান বেদীর মতো বসে আছে সিন্দুকটা। হাতের তালু চুলকাতে লাগলো ক্রিস্টোফার। সিন্দুকটা খুলতে আর তর সইছে না। কিন্তু প্রহরী এসে সব ঠিক আছে সেই সংকেত দেওয়ার আগ পর্যন্ত ওঠার উপায় নেই।
“ওরা একারাই এসেছিলো,” নিশ্চিত করলো লোকটা। “এমনভাবে পালিয়েছে যেনো বাঘে তাড়া করছে।”
ক্রিস্টোফার সিন্দুকটার দিকে এগিয়ে গেলো। ভারি মেহগনী কাঠ দিয়ে বানানো ওটা। গায়ে চমৎকার নকশা। জিনিসটা সম্ভবত মশলা অথবা ওষুধ রাখার কাজে ব্যবহার হতো। কারণ ভিতর থেকে মৌরির সুঘ্রাণ ভেসে আসছে।
টান দিয়ে ঢাকনাটা খুললো ও। এই মরা চাঁদের আলোতেও ঝিকমিকিয়ে উঠলো ভিতরটা।
এক হাতা মুদ্রা তুলে নিলো ক্রিস্টোফার। ধাতুগুলো আঙুলের ফাঁক দিয়ে নাড়াচাড়া করতেই অন্যরকম একটা অনুভূতি হতে লাগলো ওর। তামান্না সেগুলো ওর হাত থেকে ফেলে আবার ঢাকনাটা বন্ধ করে দিলো।
“পরে। আগে এখান থেকে ভাগতে হবে। ওই কুলিগুলো লোকজন নিয়ে ফিরে আসতে পারে আবার।”
“আর পুলা?”
তামান্নার চোখের জ্বলজ্বলে ভাব দেখেই ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো ওর মনের ভিতর কি চলছে। ও নিজের আঙুলে একটা ছুরির ধার পরীক্ষা করলো।
ক্রিস্টোফার সিন্দুকটায় লাথি মেরে বললো, “একবার ডাকাতি করে যতো টাকা পাওয়া যায় তার চাইতে বহু গুণ এর ভিতর আছে।”
“ওর জিভটা কেটে দেওয়া যায় যাতে আর আমাদের কথা কাউকে বলতে না পারে, তামান্না জবাব দিলো।
“ও কিন্তু লিখতে পারবে,” ক্রিস্টোফার ধরিয়ে দিলো।
“তাহলেতো হাতটাও কেটে ফেলতে হবে।”
“ওর পরিবার কিন্তু ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেবে না,” ক্রিস্টোফার বোঝানোর চেষ্টা করলো। এরকম জরুরি অবস্থায় তামান্না কি ওর সাথে মজা করছে নাকি আসলেই এসব বলছে তা ও ধরতে পারছে না।
কোনো জবাব না দিয়ে তামান্না ওর লোকদের শিষ দিয়ে পুলাকে আনতে বললো। ওরা ঠেলতে ঠেলতে পুলাকে গুহার ভিতরে নিয়ে এলো। পুলার চোখ বাধা, হাতও পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে। আর এই ভ্যাপসা গরম রাতেও ও ঠকঠক করে কাঁপছে সে।
ক্রিস্টোফার তামান্নার মুখোভঙ্গি পড়ার চেষ্টা করছে। তবে অনেক চেষ্টা করেও ওর উদ্দেশ্যটা ধরতে পারছে না।
“আচ্ছা টাকাই যদি আসল না হয়, তাহলে আমরা এসব করছি কেনো?” ক্রিস্টোফার শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
তামান্না ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে ছুরিটা ওর বেল্টের খাপে ঢুকিয়ে রেখে দিলো। চুপিসারে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ক্রিস্টোফার। পুলার জন্যে ওর বিন্দুমাত্র দরদ নেই। লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও নিজেই খুশি মনে পুলার উপর যতো ইচ্ছা অত্যাচার করতো। কিন্তু এখন ওকে অক্ষত ছেড়ে দেওয়াই লাভ বেশি।
“তুই এখানেই থাক,” তামান্না পুলাকে বললো। “আর মনে মনে ভগবানকে ডাক যাতে সাপ আর হায়েনার আগেই তোকে অন্য কেউ যেনো খুঁজে পায়।”
“দয়া করে বাঁধন খুলে দিয়ে একটা তরবারি রেখে যান,” অনুনয় করলো পুলা।
“ভালোমতো টানাটানি করলে বাধন এমনিই খুলে যাবে,” তামান্না বললো। “আর তোর বাড়ির লোকেরাও খুঁজতে খুঁজতে চলে আসবে।”
কথাটা বলে যাওয়ার জন্যে ঘুরলো তামান্না।
“আগে টাকাটা গুনে নিলে ভালো হতো না?” ক্রিস্টোফার বললো। “যদি ওরা কম দেয়?”
“তাহলে ওরা দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, সেখানে গিয়ে ওদের খুন করে আসবো। ওদের বৌ বাচ্চা সবগুলোকে মারবো। এমনকি ভাই, বোন, চাকরবাকর সব। আর সবার শেষে মারবো একে।” বলে পুলার গায়ে একটা লাথি হাকালো। “বুঝতে পেরেছিস?”
“হ্যাঁ,” গোঙাতে গোঙাতে বললো পুলা। “ওরা একটা পয়সাও কম দেবে না। ভগবানের কসম।”
“এখানে দেরি করা মানেই ধরা পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া-আর সাথেও কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ও থাকলে আমাদের ঝামেলা বাড়বে। আর তুমি যেহেতু একে বাঁচিয়ে রাখতে এতো বেশি আগ্রহী…” বলে ও কাঠের সিন্দুকটার দিকে ইঙ্গিত করলো। “তুমিই তাহলে নাও ওটা।”
ক্রিস্টোফার সিন্দুকটা তুলতে গিয়ে বুঝতে পারলো যে কুলিগুলো এটার ওজন সম্পর্কে বাড়িয়ে বলেনি কিছু। ও অনেক শক্তিশালী, তবুও ওটাকে কাঁধ পর্যন্ত তুলতে পারলো না। ব্যথায় কাতরে উঠতেই দুজন লোক দৌড়ে এলো সাহায্য করতে। দুজনে দুপাশের দুটো হাতল ধরলো কিন্তু জায়গাটা সমতল না হওয়ায় হোঁচট খেয়ে গেলো পড়ে। তামান্না এগিয়ে গিয়ে ওদেরকে বকতে লাগলো।
পাহাড় থেকে নেমে এসে নিচের ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেলো ওরা। এখানে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। শুধু বন্য প্রাণী আর ডাকাতেরা ঘরে এদিক দিয়ে। ক্রিস্টোফারের হাতের ব্যথা বাড়তেই লাগলো। পুলার প্রতি প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা জন্ম নিলো ওর। শেষে মনে মনে কিভাবে পুলাকে মারা যায় সেসব কল্পনা করে ব্যথাটা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগলো।
অবশেষে একটা ফাঁকামতো জায়গায় এসে তামান্না থামার আদেশ দিলো। ক্রিস্টোফার যেইমাত্র সিন্দুকটা খুলে স্বর্ণমুদ্রাগুলো গোনা শুরু করলো তখনি যাদুমন্ত্রের মতো ওর হাতের ব্যথা দূর হয়ে গেলো। প্রায় আধা ঘণ্টা লাগলো গুণে শেষ করতে। শেষ করার পর দেখা গেলো সবার মুখেই চওড়া হাসি। পুরোটাই আছে এখানে। এমনকি তামান্নাও কঠিন ভাব ছেড়ে ক্রিস্টোফারের পাশে এসে বসে ওর পায়ের উপর হাত রেখে উরুতে চিমটি দিতে লাগলো।
