“খচরে নেই?” জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার।
বাম হাত দিয়ে তামান্না উপুড় করে দিলো বস্তাটা। চেরির বানানো ব্রান্ডির ছোট একটা বোতল মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেলো। তারপরেই কাগজে মোড়া আরো কিছু জিনিস ধুপধাপ পড়তে লাগলো মাটিতে। ক্রিস্টোফার তরবারির ডগা দিয়ে একটা মোড়ক ছিঁড়ে ফেলতেই ভেতর থেকে কিছু ধাতব খণ্ড বেরিয়ে এলো। একটা তুলে নিয়ে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই বেকে গেলো সেটা।’
“সীসা?”
সওদাগর একটা আক্রমণ আশা করে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে জিজ্ঞেস করলো, “স্বর্ণ কোথায়?”
“স্বর্ণ নেই।”
“তাহলে তিনদিন আগে ব্রিঞ্জোয়ানে যে কাপড়গুলো নিয়ে গেলি সেগুলোর কি হয়েছে?” তামান্না জানতে চাইলো।
“ওখানকার ইংরেজ লোকটা একটা পাক্কা চোর। আমার জিনিস নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু টাকা দেয়নি। তার বদলে আপাতত এই সীসা দিয়েছে। গরমের সময় আসলে বাকি টাকা স্বর্ণে পরিশোধ করবে বলেছে।”
“মিথ্যা কথা,” ঠাণ্ডা স্বরে বললো তামান্না। “এর কাপড়চোপড় সব খুলে পরীক্ষা করে দেখো, আর যদি কাপড়ের নিচে কিছু না পাও তাহলে চামড়া খুলে দেখো কোথায় লুকিয়ে রেখেছে স্বর্ণ।”
“না,” আর্তনাদ করে উঠলো লোকটা। “আমি মরে গেলে আপনাদের কোনোই লাভ হবে না। জ্যান্ত থাকলে কিন্তু লাভ করতে পারবেন।”
“এ চাচ্ছে আমরা যেনো ওকে না মেরে ওর ভাইদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করি,” ক্রিস্টোফার বললো।
“আমরা কাউকে অপহরণ করি না,” সোজাসুজি বলে দিলো তামান্না। “আর ধরা না পড়ে মুক্তিপণ আদায় করবোই বা কিভাবে? তোর পরিবারের লোকজন আমাদের সাথে দরদরি করতে চাইবে। আর প্রতিবার খবর দেওয়া নেওয়ার সময়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।”
“কোন দরাদরি করতে হবে না,” সওদাগর ওয়াদা করলো। “কতে চান বলুন শুধু। আমি আমার ভাইদের কাছে খবর পাঠাবো যাতে বিনা বাক্যব্যয়ে টাকাটা দিয়ে দেয়। আপনারা যেখানে চান সেখানেই ওরা টাকাটা রেখে আসবে।”
“যদি তোকে জ্যান্ত ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে ওরা কেনোই বা টাকা দেবে?”
“কারণ তাহলে আমাকে ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর থাকবে না।” সওদাগরের চেহারার রঙ ফিরে আসছে আবার। সে হাতের শেষ আংটিটা খুলে তামান্নার সামনে তুলে ধররলো। “আমি এক সামান্য ব্যবসায়ী। চলুন এমন কিছু করি যাতে দুজনেই লাভবান হতে পারি।”
*
“আমি একে বিশ্বাস করি না, তামান্না বললো। একটা পাথরের আড়ালে হামাগুড়ি দিয়ে বসে নিচু স্বরে কথা বলছে ওরা। গভীর রাত এখন। আকাশে চাঁদ আছে, কিন্তু চাঁদনী নেই। ফলে অন্ধকার আরো জাঁকিয়ে বসেছে। ব্যাপারটা অবশ্য কাকতালীয় কিছু না। আজকের সব কিছু অনেকবার আলোচনা আর তর্কাতর্কির পর ঠিক করা হয়েছে। স্থান, সময়, দিক নির্দেশনা-সব। প্রায় ডজনখানেক পরিকল্পনা নাকচ করে শেষে এটা নির্ধারণ করেছে ওরা। ক্রিস্টোফার বেশ কয়েকবার ভেবেছে তামান্না বোধহয় বন্দিকে খুন করে সব তর্ক অবসান করে দেবে। এখনো অবশ্য সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় নি।
রাতের বাতাসে একটা অস্পষ্ট পেঁচার ডাক ভেসে এলো। কিন্তু ডাকটা হুবহু পেঁচার মতো না। ক্রিস্টোফার শক্ত হয়ে গেলো।
“সংকেত দিচ্ছে।”
পাহাড়ের উপর একটা পাথুরে গুহা নির্ধারণ করেছে ওরা। রাস্তা বা গ্রাম থেকে বহু দূরে। রাস্তা ভরে পাহারাদার রেখেছে, যাতে ওরা কোনো চালাকি করার চেষ্টা করলে সাথে সাথে ধরা পড়ে যায়। এখনই প্রমাণ হবে পুলা কি আসলেই কথা দিয়ে কথা রাখে কিনা।
“টাকা পেলেও আমাদের কিন্তু ওকে মেরেই ফেলা উচিত, তামান্না অস্থির হয়ে উঠছে। “ও আমাদের চেহারা আর নাম দুটোই জানে। ও বাড়ি ফিরেই রানির কাছে অভিযোগ করবে, আর রানিও আমাদের ধরার জন্যে সৈন্য পাঠিয়ে দেবে।”
“এ একটা বলদ,” ক্রিস্টোফার বললো। “জান নিয়ে যে পালাতে পারছে সে জন্যেই ওর ঈশ্বরদের ধন্যবাদ দেবে। আর এতেই সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। তাছাড়া, মুক্তিপণ নেওয়ার পরেও যদি খুন করি তাহলে কথাটা জানাজানি হয়ে যাবে। পরের বার কাউকে অপহরণ করলে আর কেউ টাকা দেবে না।”
তামান্না কাঁধ ঝাঁকালো, “আমাদের যথেষ্ট স্বর্ণ আছে।”
“যথেষ্ট স্বর্ণ বলে দুনিয়াতে কোনো কিছু নেই।”
পাথুরে মেঝেতে পদশব্দ পেতেই ওরা চুপ করে গেলো। দুজন কুলি এসে দাঁড়ালো গুহাটার মুখে। পিঠে বিশাল ওজনের দুটো সিন্দুক। চাপে ওদের পিঠ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ওরা সিন্দুক দুটো নামিয়ে রেখে হাত ডলতে ডলতে অন্ধকারে ইতিউতি তাকাতে লাগলো।
“মালিক পুলাকে নিতে এসেছি আমরা,” একজন বললো।
ক্রিস্টোফার টের পেলো তামান্না পিস্তল তুলে নিচ্ছে। ক্রিস্টোফার ওকে বাধা দিলো। “আগে শুনে নেই কি বলে?”
“আমরা বলেছিলাম মাত্র একজন পাঠাতে,” জিজ্ঞেস করলো তামান্না। ওর কথা পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো। ফলে কোথা থেকে কথা বলছে। সেটা বোঝা গেলো না। কুলিগুলো এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। এই অন্ধকারেও ওদের আতংকিত চেহারা দেখতে পেলো ক্রিস্টোফার।
“সিন্দুকটা একজনের পক্ষে টেনে আনা সম্ভব না,” একজন কুলি উচ্চস্বরে মিনতি করলো।
“তাহলে তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।”
“মালিকের কি হবে?”
“টাকা গোণা শেষ হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এখন ভাগ।” তামান্না পিস্তল তুলে ফাঁকা গুলি ছুঁড়লো। প্রতিধ্বনির কারণে মনে হলো যেনো পুরো এক কোম্পানি বন্দুকধারী সৈনিক একযোগে গুলি ছুঁড়েছে।
