প্রথম তীরটা সরাসরি সর্দারের গলা এফোড় ওফোড় করে দিলো। পরেরটা লাগলো খচ্চরের গায়ে। তামান্নার লোকেদের বন্দুক আছে, কিন্তু ওরা সবসময় প্রথম আক্রমণটা করে তীর দিয়ে। এতে করে শিকার দিশেহারা হয়ে। যায়। কারণ তীর ছুড়লে কোনো ধোয়া বা অন্য কিছু দেখা যায় না যা দিয়ে কেউ অনুমান করবে যে আক্রমণ ঠিক কোথা থেকে আসছে।
সর্দার না থাকায় দলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। এলোপাথাড়ি গুলি করতে লাগলো ওরা। খামাখা বন্দুকের গুলিও খরচ হলো আবার গুলির ধোঁয়ায় নিজেরাই কিছু দেখতে পেলো না আর। বন্দুকে আবার গুলি ভরতে পারার আগেই তামান্না আর ওর লোকেরা ঢাল বেয়ে নেমে এসে আক্রমণ করলো। ক্রিস্টোফার উরুমিটা অবমুক্ত করে যোগ দিলো ওদের সাথে। ধোয়ার ভিতর দিয়েও দেখতে পেলো একজন প্রহরী মরিয়া হয়ে বন্দুকে গুলি ভরার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উরুমিটা সোজা উড়ে গিয়ে ওর বুকটা চিরে দিলো। দক্ষ হাতে ক্রিস্টোফার আবার ওটাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে হাতল ঘুরিয়ে আর একটা প্রহরীর দিকে ছুঁড়ে দিলো। তার হাঁটু কেটে বেরিয়ে এলো ওটা। আর্তনাদ করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো লোকটা।
কিছুদিন আগেও ক্রিস্টোফারও ছিলো এরকমই একজন প্রহরী। ধোয়ার ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলো ও, কিন্তু তামান্নার লোকেরা আগেই সব সেরে রেখেছে। উরুমিটা আর ব্যবহার করতে হলো না ওকে। কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেলো আটজন ডুলি বাদে আর কেউই জ্যান্ত নেই। শরীরের উর্ধাংশে কিছুই নেই লোকগুলোর আক্রমণের প্রচণ্ডতা আর দ্রুততায় ওরা আর জায়গা ছেড়ে নড়ার সময় পায়নি।
হাতে অস্ত্র থাকলে এরাও কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারতো। তবে ক্রিস্টোফার ভারত সম্পর্কে একটা জিনিস জানে, এখানে জাত ব্যাপারটা খুব কড়াভাবে মানা হয়। একজন ডুলি কখনো লড়াই করবে না, আবার একজন যোদ্ধা কখনো গরুর দুধ দুইবে না। একজন লোকের জন্মই তার নিয়তি ঠিক করে দেয় এখানে।
তাই ওরা যখন পালকি ফেলে ছুট দিলো তখন ক্রিস্টোফার বিশেষ অবাক হলো না। এমনটাই আশা করেছিলো এদের কাছ থেকে। ওদেরকে যেতে দিয়ে পালকিটার দিকে আগালো ও।
পর্দা সরে গেলো। একজন বেটে, মোটাসোটা লোক মাথা বের করলো ভিতর থেকে। পরনে সবুজ রঙের রেশমি কাপড়। বাইরের দৃশ্য চোখে পড়তেই চেহারার প্রচণ্ড রাগের অনুভূতি পাল্টে নির্জলা আতংক ভর করলো সেখানে। ক্রিস্টোফার ঠিক সামনেই তার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটা হাতের আংটিগুলো খুলে ক্রিস্টোফারের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিতে শুরু করলো। মোটা আঙুল থেকে আংটি খোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা দেখে খুব মজা পেলো ক্রিস্টোফার।
“এর চাইতে আঙুলগুলো কেটে দিলে তাড়াতাড়ি খুলবে,” সাহায্য করার ভঙ্গিতে বললো ক্রিস্টোফার।
লোকটা বিলাপ করতে করতে আরো জোরে চেষ্টা করতে লাগলো। কার্নেলিয়ান আর চুনি বসানো একটা আংটি এতো বেশি এঁটে ছিলো যে খোলার সময় চামড়া সমেত উঠে এলো। রক্ত উপচে পড়তে লাগলো ক্ষত থেকে।
ক্রিস্টোফার তরবারির ডগাটা লোকটার গলায় ঠেকালো। যেনো নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেলো লোকটা।
“এতো কষ্ট করতে হবে না। তোকে মারার পর আমি নিজেই খুলে নেবো।”
ভয় পেয়ে আবার নিজের পালকির ভিতরে সেধিয়ে গেলো লোকটা। টান দিয়ে পর্দাগুলো ছিঁড়ে ফেললো ক্রিস্টোফার। ভিতরে দেখা গেলো অনেকগুলো নকশা করা বালিশ। ওগুলো থেকে সুগন্ধ ভেসে আসছে। ক্রিস্টোফারের পছন্দ হলো বালিশগুলো। এগুলোতে রক্ত যাতে না লাগে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
“দয়া করুন,” লোকটা অনুনয় করলো। “আপনি কি জানেন, আমি কে?”
“না,” ক্রিস্টোফার বললো।
ওর চোখ লোকটার টাকা পয়সার হিসাব কষতে ব্যস্ত থাকায়, সওদাগরের চোখের ধূর্ত দৃষ্টিটা খেয়াল হলো না।
“আমার নাম মহেন্দ্র পুলা। আমার ভাইয়েরা সব বড় বড় ব্যবসায়ী। আমাকে ছেড়ে দিলে ওনারা অনেক টাকা দেবেন।”
“আমরা কাউকে অপহরণ করি না,” শান্ত স্বরে ব্যাখা করলো ক্রিস্টোফার।
“আমার ভাইয়েরা এখান থেকে কাছেই থাকে। সব কিছুর ব্যবস্থা করতে কয়েকটা দিন লাগবে মাত্র।” লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে অনুনয় করতে লাগলো। “সামনেই বর্ষাকাল আসছে, তখন রাস্তাঘাটে আর পালকি চলবে না। বর্ষার আগে তাই বড়সড় একটা দাও মারতে পারলে আপনাদেরই লাভ।”
“ঐ খচ্চরে যে স্বর্ণ আছে তা দিয়েই হেসে খেলে চলে যাবে অনেকদিন।”
সওদাগরের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। “ওটার জন্যে আপনারা আমার লোকগুলোকে মেরেছেন? ওই খচ্চরের পিঠের জিনিসের জন্যে?”
“তাছাড়া কি?” ক্রিস্টোফার কোপ দেওয়ার জন্যে তরবারি তুললো। লোকটার চেহারার আতংক তারিয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। বালিশ জাহান্নামে যাক। ওগুলো কোনো অশিক্ষিত চাষীর কাছে বেঁচে দেবে। রক্তের দাগ নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা থাকার কথা না। তরবারি নামিয়ে কোপ দিলো ও।
“থামো।”
তামান্নার গলা শুনে সওদাগরের ঘাড়ের এক ইঞ্চি আগে ক্রিস্টোফারের তরবারি থেমে গেলো। এই একটা মাত্র কণ্ঠই ক্রিস্টোফারকে থামাতে পারে। ঘুরে দেখে তামান্না একটা মোটা সোটা বস্তা নিয়ে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। সওদাগর ততোক্ষণে আকূল হয়ে কাঁদতে শুরু করেছে।
“কি হয়েছে?”
কোনো কথা না বলে তামান্না লোকটাকে টেন দাঁড় করিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বললো, “স্বর্ণ সব কোথায়?”
