ও টেলিস্কোপটা নামিয়ে আবার চামড়ার ব্যাগে রেখে দিলো। শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে, হয় ভুল দেখেছে নইলে ওর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
হঠাৎ কেপ টাউনে দেখা সেই সবুজ দ্যুতির কথা মনে পড়লো ওর। একটা আত্মা আবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসবে।
টেলিস্কোপ ছাড়া সৈকতের লোকটাকে এখন পিঁপড়ার মতো ছোট লাগছে। কিন্তু তবুও টম ওর উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। ওরা জায়গাটা চক্কর দিয়ে আবার উল্টোদিকে ফিরে যেতে যেতে যখন জায়গাটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো, তখনই টম চোখ নামালো।
আবারও ব্রিঞ্জোয়ানে ফিরতে লাগলো ওরা। হিকসের সতর্কবার্তাটা কানে বাজছে টমের। ওই মহিলা নিশ্চিত কোনো শয়তানি ফন্দি আঁটছে।
*
পেটের উপর ভর দিয়ে ক্রিস্টোফার খাড়া পাহাড়টার ধার দিয়ে নিজেকে টেনে তুললো। ওখান থেকে একটা পচা গাছের উপর দিয়ে উঁকি দিতেই দেখতে পেলো নিচের বহরটা। সবার সামনে আছে একটা পর্দায় ঘেরা পালকি, আটজন ডুলি বইছে সেটা। পিছনে আছে বিশজন সশস্ত্র লোক।
তামান্না উঠে এলো ওর পাশে। “বলেছিলাম না যে অপেক্ষা করলে ভালো
এই একই বহরটাকে তিনদিন আগে এই রাস্তা দিয়েই উল্টোদিকে যেতে দেখেছে ওরা। ক্রিস্টোফার চেয়েছিলো তখনই আক্রমণ করতে, কিন্তু তামান্না বলেছিলো ধৈর্য ধরতে। “এরা ব্রিঞ্জোয়ানের ইংরেজ কুঠিতে কাপড় নিয়ে যাচ্ছে। যখন ফিরে আসবে তখন এদের কাছে থাকবে বিক্রি করে পাওয়া স্বর্ণ।”
এখন সেটার সত্যতা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে ক্রিস্টোফার। তিন দিন আগের বহরে প্রায় একশো স্থানীয় কুলি ছিলো পালকিটার পিছনে। সবার মাথায় ছিলো নিখুঁতভাবে বোনা সৃতি কাপড়ের গাঁটরি। এখন আর ওরা নেই। তার বদলে আছে একটা মাত্র খচ্চর। ওটার পিঠের বস্তাটার যে অনেক ওজন তা জটার চলার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে। এতোগুলো পাহারাদারের ভীড়ে ওটা যে নির্ভয়ে চলছে। তাতেই ক্রিস্টোফার বেশ অবাক হলো। সব দেখে একটু পিছনে সরে এলো ও।
মনের ভিতর কেমন যেনো একটা আশংকা দোলা দিয়ে গেলো ওর, কেনো এমনটা হলো ভেবে পেলো না। ব্যাপারটা যে ওর বিবেকের দংশন না সেটা ও নিশ্চিত। ছয় মাস হয় ও তামান্নার ডাকাত দলে যোগ দিয়েছে, আর এর মাঝে কতোবার যে এই কাজ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। একাকী পথচারীদেরকে ছিনতাই করে খুন করেছে, কড়া পাহারায় থাকা ক্যারাভানও লুট করেছে। অব্যাহত সফলতার কারণে ওদের নাম ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। লাভ ক্ষতি দুটোই হয়েছে তাতে। লাভ হচ্ছে ওদের দলে এখন এক ডজন লোক। আর ঝামেলা হচ্ছে ওদেরকে আরো উত্তরে চিত্তাত্তিস্কারাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে। কারণ আগের জায়গার রাজা ওদেরকে ধরার জন্যে মরণ পণ করেছিলেন।
“এখনই আক্রমণ করবো?”
তামান্না একটা শয়তানি হাসি হাসলো। “বেচারা খচ্চরটার পিঠটাই ভেঙে যাবে যদি আমরা ওর পিঠের বোঝাটা কমিয়ে না দেই। ভয় পাচ্ছো নাকি?”
“আরে নাহ।”
“তাহলে ওরা পালানোর আগেই ফাঁদটা পেতে ফেলা যাক।”
জায়গাটা আক্রমণের জন্যে একেবারে উপযুক্ত। রাস্তাটা এখানে মোড় নিয়ে একটা সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে। কাদা কাদা অবস্থা। উপরের চড়াটা ভাঙা পাথরের টুকরো দিয়ে ভরা, ফলে লুকিয়ে থাকার জন্যে প্রচুর জায়গা পাওয়া যায়। প্রহরীরাও জানে ব্যাপারটা। ক্রিস্টোফার দেখলো প্রহরীরা সবাই নিজেদের তরবারি খাপমুক্ত করে হাতে তুলে নিলো। এদের সর্দার হচ্ছে লাল পাগড়ি পরা বিশালকায় একটা লোক। সে কিছু একটা আদেশ দিলো। ওদের চারজনের হাতে বন্দুক আছে, তারা সবাই বন্দুকের ঘোড়ায় আগুন জ্বেলে প্রস্তুত করে নিলো, যাতে দরকার হওয়া মাত্র গুলি ছুঁড়তে পারে। খাড়া ধারটায় কড়া নজর রেখে আগাতে লাগলো ওরা, সামান্য নাড়াচাড়াও চোখ এড়াচেই না। তবে ক্রিস্টোফারও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ওস্তাদ। দম বন্ধ করে পড়ে রইলো ও।
ক্যারাভানটা বাঁক ঘুরতেই একটা আতংকিত চিৎকার শোনা গেলো আর দলটা থেমে পড়লো। একটা গাছ ভেঙে পড়ে পুরো রাস্তা আটকে দিয়েছে। প্রহরীরা খচ্চরটাকে ঘিরে একটা চক্র করে দাঁড়িয়ে গেলো, চেহারা পাথরগুলোর দিকে। ক্রিস্টোফার দেখলো সর্দার লোকটা গাছের গোড়াটা পরীক্ষা করে দেখছে। নিজের কাজ ভালোই জানে সে। যদি খুঁড়িটায় কুড়ালের আঘাতের চিহ্ন থাকে তাহলে ঠিকই বুঝে যাবে যে ইচ্ছা করে গাছটা ফেলা হয়েছে।
কুড়ালের কোনো দাগ নেই। ক্রিস্টোফারের লোকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাটি খুঁড়ে এমন অবস্থা করে রাখে যাতে গাছগুলো নিজের ভারেই ঢলে পড়ে। তাতে করে মনে হয় যে ব্যাপয়ারটা আপনাআপনিই ঘটেছে।
সর্দারও ধোকা খেয়ে গেলো ব্যাপারটায়। বন্দুকধারী লোকগুলো পাহারায় থাকলো আর বাকিরা অস্ত্র নামিয়ে রেখে গাছটা ঠেলে সরানোর কাজে লেগে গেলো। ঝটপট কাজ করতে লাগলো তারা। মুলত জানের ভয়েই যতো দ্রুত সম্ভব এলাকাটা পার হতে চায়। সেই সাথে সর্দারের গালাগাল তো আছেই। কয়েক মিনিটের ভিতরে ওরা ভারি গাছটাকে ঠেলে সরিয়ে ফেললো। কোনো আক্রমণ এলো না দেখে ওদের দুশ্চিন্তাও কমলো কিছুটা। ক্রিস্টোফার ওদের ঠোঁটে হাসি দেখতে পেলো, হাসির শব্দও কানে এলো ওর। এতে ভয় পেয়ে যাওয়ায় এখন সবাই কেমন লজ্জা পাচ্ছে। পালকির পর্দার ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এলো। ইশারায় রওনা দেওয়ার জন্যে আদেশ করছে।
