“ডোরিয়ান থাকলে ভালো হতো,” আক্ষেপ করে টম বললো। “ও ঠিকই ভাঙা জাহাজ থেকেও অনেক কিছু বের করে ফেলতো।”
“ভাগ্য ভালো হলে, কয়েকদিন পরেই উনি গনের সৈকতে বসে আবোলির সাথে কফি খেতে খেতে কেমন কামাই করলেন সেসব হিসাব করবেন,” ফ্রান্সিস বললো।
ব্রিঞ্জোয়ানে ওরা এসেছিলো হাটা পথে, টম সেসময় সৈকতের কিছুই দেখতে পায়নি। দিগন্ত বরাবর কয়েক ঘণ্টা নৌকা চালালো ওরা। আকাশ পুরোপুরি মেঘমুক্ত না, যেকোনো সময় আবার প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যেতে পারে।
ওরা একটা ছোট বেরিয়ে থাকা চড়া পেরিয়ে একটা লম্বা কিন্তু অগভীর অংশে এসে পৌঁছালো। টমের মনে হলো কেঁদেই দেবে। কেস্ট্রেলকে দেখা যাচ্ছে সামনে। একটা বিশাল ধ্বংসস্তূপ। বাতাস আর ঢেউ ওটাকে তীরের কাছাকাছি ঠেলে এনেছে। পানি এখানে এতো কম যে ওটার ভাঙা ডেক পানির উপরে উঠে আছে।
তবে জাহাজটা খালি না। তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে ওটার উপর। সৈকতে দাঁড়ানো আরো একদল লোককে চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। সৈকতের লোকগুলো একপাল ষাঁড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের গায়ে একটা শেকল বেঁধে অপর প্রান্ত বাধা হয়েছে ষাঁড়গুলোর সাথে। টম দেখলো লোকগুলো সপাং করে ষাড়ের গায়ে বাড়ি দিলো আর জম্ভগুলো ঝাঁকি মেরে সামনে বাড়লো। ওদের গায়ে বাঁধা শেকলগুলোর সমুদ্রের পানি থেকে বেরিয়ে এলো। পানি ঝরছে ওগুলো থেকে। বঁড়গুলো সৈকত ধরে উঠতে উঠতে গাছের সারির ওপাশে হারিয়ে গেলো। ওখানে কিছু পাম গাছ কেটে জায়গা করা হয়েছে।
“ওরা কি পুরো জাহাজটাকেই ডাঙায় টেনে তুলবে নাকি?” ফ্রান্সিস অবাক হলো।
হিকস হাতের টেলিস্কোপটা দিয়ে সৈকতের দিকে নজর রাখছে। ও সেটা টমের হাতে ধরিয়ে দিলো। ওটা দিয়ে টম পানির নিচে একটা কালো হাঙরের আকৃতির জিনিস দেখতে পেলো।
ষাঁড়গুলো ওটাকে ঢেউয়ের নিচ থেকে টেনে তুলতেই দেখা গেলো ওদের জাহাজের নয় পাউন্ডের কামানগুলোর একটা। ওটা পানির উপরে উঠে আসতেই লোকজন দৌড়ে গিয়ে ওটাকে থেকে একটা কাঠের খাঁচার মধ্যে তুলে দিলো যাতে আর গড়িয়ে না যেতে পারে।
“এরা করছেটা কি?”
“ইউরোপিয়ান কামান এখানকার লোকের কাছে সাত রাজার ধনের মতো,” হিকস বললো। “ওদের রানি এগুলোর জন্যে এগুলোর ওজনের সমান স্বর্ণ দিতে রাজি। কিন্তু তোমার ভাই গাই পর্যন্ত অস্ত্র বেচা-কেনা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করেছে। লাভ যতোই হোক, এগুলো যে একসময় কোম্পানির জাহাজ বা কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কি?”
টম আবার সৈকতটা পর্যবেক্ষণ করলো। কামানটা গাছের সারির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর ষাঁড়গুলোকে আবারও নিয়ে আসা হলো পানির কাছে। দুজন লোক শেকলের মাথা হাতে নিয়ে ভাঙা জাহাজটার দিকে এগিয়ে গেলো। বোঝাই যাচ্ছে ওরা সবগুলো কামানই উদ্ধার করতে চায়।
টেলিস্কোপ দিয়ে টম ওদের সর্দারকে দেখতে পেলো। লম্বা, চওড়া কাধ, অন্য সবার চাইতে তার মাথা উঁচিয়ে আছে। লোকটার উর্ধাঙ্গে কোনো কাপড় নেই। কোমরে পিস্তল গোজা, আর বুকে কোনাকুণিভাবে ঝুলছে কার্তুজের বেল্ট। দুটো তরবারিও দেখা গেলো। ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে কাজ করাচ্ছে সে। তবে লোকগুলোর যেভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে কাজে ছুটছে সেটা দেখে অবাক হলো টম। এরা যে খুব ভালমতো প্রশিক্ষিত তা-ই না, এরা লোকটাকে প্রচণ্ড ভয়ও পায়।
“একেবারে জবরদস্ত এক লোক দেখি,” টম বিড়বিড় করে বললো। লোকটাকে দেখে মনে কু ডাক ডাকছে ওর। “এ আবার কে?
হিকস টেলিস্কোপটা নিলো আবার। “একে আগে কখনো দেখিনি। সম্ভবত রানির নতুন লোক।”
“অথবা ডাকাতও হতে পারে।”
“রানির এলাকা থেকে জাহাজডুবির মাল লুট করতে হলে বুকের পাটা থাকতে হবে। আর কামান সরানো আর লোকজনের টাকার ব্যাগ মেরে দেওয়া এক জিনিস না। এতো গুলো লোক নিয়ে আসা, এতোগুলো ষাড় জোগাড় করা… আর নিয়ে যাওয়ার ঝামেলার কথা বাদই দিলাম। রানির অনুমতি ছাড়া এতোসব সম্ভব না।”
“তাহলেতো দেখা যাচ্ছে রানির সাথে দেখা করতে গেলে আমার তরবারির সাথে সাথে আরো অনেক কিছুই ফেরত চাইতে হবে।”
হিকসের ভ্রু কুঁচকে গেলো। “আমার এসব পছন্দ হচ্ছে না। ওই মহিলা নিশ্চিত কোনো শয়তানি ফন্দি আঁটছে। আমি নিশ্চিত।”
সৈকতের লোকেরা গালিভাতটাকে দেখতে পেলো। চিৎকার করে হাত ছুঁড়তে লাগলো তারা। তবে ওদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে নাকি সরে যেতে হুশিয়ার করছে সেটা বোঝা গেলো না। টম আবার টেলিস্কোপে চোখ দিলো।
“সোজা যেতে থাকো,” হাল ধরে রাখা আলফ উইলসনকে বললো টম। “ওরা সংখ্যায় অনেক, আর আমরা যে ওদেরকে এসব করতে দেখে ফেলেছি। সেটা বুঝতে দেওয়া যাবে না।” ওর মনে হয় না যে সৈকতের লোকগুলোর কাছে কোনো স্পাই গ্লাস থাকবে। ভাগ্য ভালো হলে ওরা বুঝবেই না যে নৌকার লোকগুলো বিদেশি।
হিকস ওর চিন্তা ধরতে পারলো। “যদি বোঝাতে চান যে আমরা নিরীহ যাত্রী, তাহলে টেলিস্কোপটা নামিয়ে রাখলেই ভালো হবে। এখানকার জেলেরা এরকম কিছু ব্যবহার করে না।”
তবুও টম আরো একবার সর্দার লোকটাকে না দেখে পারলো না। কিন্তু ও টেলিস্কোপটা চোখে দিতেই লোকটাও সোজা ওর দিকে তাকালো। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ কাকতালীয়, কিন্তু টমের মনে হলো এতো দূর থেকেও সে টের পেয়ে গিয়েছে। লেন্সের ভিতর দিয়ে লোকটার চোখ দেখতে পেলো টম। ও নিশ্চিত যে একে জীবনেও কখনো দেখেনি, কিন্তু তবুও চেহারাটা নজরে আসতেই মেরুদণ্ড। বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো। অব্যাখ্যেয় কোন কারণে ওর মনে হলো একে বহুদিন ধরে চেনে, মনে হলো যেনো আয়নায় নিজের চেহারাটাই দেখতে পেলো।
