টম ও গ্লাসটা দুর্গের দিকে তাক করে বললো, “জায়গাটায় নিরাপত্তা দেখলাম তেমন ভালো না।”
হিকস মুখ বেজার করে বললো, “এসব ফয়ের কারবার। লোকটা এতো বেশি হিংসুটে যে আমি যা-ই বলি না কেন, তার কাছে মনে হয় যে তাকে ছোট করার জন্য বলছি। তাই আমার পরামর্শের উল্টোটা করে সবসময়। আমি আমার লোকদের নিয়ে মহড়া করতে পারি না, বা এলাকাটা একটু টহলও দিতে পারি না। সে কোন না কোনো ছুতো তুলে আমার কাজে বাগড়া দেবেই।”
টম খুশি হলো যে এখানকার এই দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যে অ্যাগনেসের স্বামী কোনোভাবেই দায়ী না। সত্যি কথা বলতে লোকটার সোজা সাপ্টা হাবভাব আর সরাসরি সত্যিটা বলার মানসিকতা টমের খুবই পছন্দ হলো। এমন একজনকে ওদের পক্ষে পেয়ে ভালোই হয়েছে।
আর এ হচ্ছে আমার ভায়রা ভাই, মনে মনে ভাবলো টম। এতোদিন পর পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকা দুই বোন আবার ভাগ্যের ফেরে কিভাবে একত্রিত হলো সেটা ভেবে টম অবাক হলো।
“স্থানীয় লোকজন কেমন?”
“খুব বেশি পছন্দ করে না আমাদেরকে। ফয় তাদেরকে ক্রমাগত খুঁচিয়েই চলে। তার শুধু নিজের লাভের চিন্তা। তাই এসব করতে গিয়ে ও যে আসলে কি ক্ষতিটা করছে সেটা চোখে পড়ে না। লোকজন না খেয়ে মরলেও ফয় নিজের মর্জির বাইরে এক দানা মরিচও কেনে না। এখানকার ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করে ওর বলা দামে সব বিক্রি করতে। যদি তারা রাজি না হয় তাহলে কি করে তা আর না-ই বলি।”
“ওরা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কিছু করে না?”
“ফয়ের বিশ্বাস রানি এসব সামাল দেবেন।”
টমের চেহারা বাঙলা পাঁচের মতো হয়ে গেলো। “এই নিয়ে তৃতীয়বার এই রানির কথা শুনলাম। কে ইনি?”
“স্থানীয় রানি। বয়স খুবই কম। কিন্তু আমি যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে মানসিকতার দিকে থেকে সে আসলে একটা সাপের চাইতে কম না। তার দরবারে দুটো পক্ষ। একদল আমাদের সাথে ব্যবসা করতে রাজি, আর একদল আমাদেরকে তাড়িয়ে দিতে চায়। সে এদের দুই দলকেই সামলে রাখে। তবে উপায়টা খুব বেশি সুন্দর না।” :
“কিন্তু আমিতো দেখলাম রানির লোকজন ইংরেজদের সাথে খুব বেশি ভালো আচরণ করে না।”
টম, হিকসকে গ্রামের ঘটনাটা খুলে বললো। হিকস মাথা ঝাঁকালো।
“টুঙ্গারকে চিনি। রানির সেনাপতিদের একজন। ও ইংরেজদের পছন্দ করে না। কারণ আমরা আসার আগে ওর চাচা-ই মরিচের ব্যবসা সব নিয়ন্ত্রণ করতো।”
“ও আমার মূল্যবান একটা জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছে। একটা তরবারি। আমার পরিবারের কাছে কয়েক প্রজন্ম ধরে আছে ওটা। ওটাকে উদ্ধার করতে হবে।”
খাওয়াদাওয়া আর শুকনো কাপড় পাওয়ার পর টমের মন আপনাআপনি আবার নীলাখচিত তরবারিটার দিকে চলে যাচ্ছে। ওটা শুধু একটা অস্ত্র না, ওর কাছে ওটা কোটনী পরিবারের গৌরব আর ইজ্জতের প্রতিনিধি। এখনতো হাই উইন্ডও হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। আছে শুধু তরবারিটাই। টম ওখানে বসেই একটা প্রতিজ্ঞা করলো : তরবারিটা উদ্ধার না করে ও এই জায়গা ছেড়ে নড়বে না।
“ফয়ের ইচ্ছা আগামী তিনদিনের মধ্যে রানির দরবারে দেখা করতে যাবে, হিকস বললো। “শুনে টুঙ্গার আবারও ঝামেলা করছে। তাই ফয় ওর একটা বিহিত করতে চাচ্ছে। আপনিও এই ফাঁকে রানির সাথে ওটা ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে আলাপ করতে পারেন। তবে রানি উপহার নিতেই পছন্দ করেন, মনে হয় না ফেরত দিতে সম্মত হবেন। সে-ও মিস্টার ফয়-এর মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ।”
“তাহলেতো ভালোই ঝামেলা হবে মনে হচ্ছে,” চিন্তিত মুখে শেষমেশ বললো টম।
*
সেরাতে টম মরার মতো ঘুমালো। ঘুম থেকে উঠে দেখে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। সারাহের অবস্থাও আগের চাইতে ভালো। তবে সকালে অ্যাগনেস যখন ওকে খাওয়াতে গেলো তখন কয়েক চামচের বেশি খেতে পারলো না।
একজন কাজের লোক একটা চিরকুট এনে টমকে দিলো। ফয় পাঠিয়েছে। টম ভেবে পেলো না কি এমন খবর যে ফয় নিজে ওর অফিস থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে এই বাসায় এসে দিতে পারলো না।
আশা করি আপনি আমাদের মধ্যকার চুক্তিটা ভুলে যাননি, চিরকুটে লেখা।
“তার মানে সে এখনি আমাকে জাহাজডুবির ওখানে গিয়ে দেখতে বলছে যে কিছু পাওয়া যায় কিনা,” টম বুঝতে পারলো। “বুঝতে পারছি যে আমরা যদি খরচাপাতি পরিশোধ করতে না পারি তাহলে তার জন্যে বাড়তি ঝামেলা হয়ে দাঁড়াবো।”
“আমি যাবো নাহয় আপনাদের সাথে,” হিকস বললো।
“তাহলেতো ভালোই হয়,” কৃতজ্ঞচিত্তে বললো টম। “তবে এখানে আপনার কাজের যেনো আবার গাফিলতি না হয়।”
হিকস মুখ দিয়ে অবজ্ঞাসূচক একটা শব্দ করলো। আমি সারাদিনে যা করি, তার চাইতে নারিকেল কুড়ানো ভালো। মিস্টার ফয় সারাদিনে আমার চেহারা না দেখতে পেলে বরং খুশিই হবেন।”
টম কেস্ট্রেল-এর লোকদের মধ্যে আটজনকে পেলো যারা এখনো অক্ষত দেহে আছে। হিকস ওর লোকদের মধ্য থেকে চারজন সেপাইকে নিলো ওদের সাথে। নেতৃত্বে থাকলো মোহিত নামের এক হাবিলদার। লোকটার মোচটা বেশ দর্শনীয়। হাবিলদার হচ্ছে বোম্বের সেনাবাহিনির সার্জেন্টের সমতুল্য। দুজনের মধ্যেকার আন্তরিকতা দেখেই টম বুঝলল হিকস এর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে।
একটা ভাড়া করা স্থানীয় নৌকায় রওনা দিলো ওরা। এগুলোকে গালিভাত বলে ডাকা হয়। জাহাজের ডিঙির সমানই বড়, তবে পাল খাটানো যায়। টম চিন্তিত মুখে আকাশের দিকে খেয়াল করতে লাগলো। তবে ঝড়টা শেষ পর্যন্ত কেটেই গিয়েছে। বাতাসের টানে মসৃণভাবে ভেসে চললো গালিভাত। ওটার তিনকোণা পালটা একদম পুরোটা ফুলে ফেঁপে আছে।
