“টম কোর্টনীকে মনে আছে?”
অ্যাগনেস আসলে অধিক আনন্দে পাথর হয়ে গিয়েছে। টমের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো ও। তারপর নরম স্বরে বললো, “তার মানে ক্যারোলিনের কথা-ই সত্যি। তুমি আর সারাহ জাঞ্জিবার থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে।”
টম কুর্নিশের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালো। “শেরপা-তে করে আমরা প্লইমাউথ থেকে চলে আসি।” সারাহ আর অ্যাগনেস তখন অনেক ছোট। এমনকি তখন টম ওদের দুজনকে আলাদা করে চিনতো-ও না। ও তখন ওদের বড় বোন ক্যারোলিনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সে শেষমেশ গাইকে বিয়ে করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত দুই বোনের চেহারায় যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। সারাহের তুলনায় অ্যাগনেসের চুল বেশি কালো, আর গায়ের রঙ বেশি ফর্সা। চেহারার টানটানে ভাব দেখেই বোঝা যায় ভালোই যত্ন নেয় ও নিজের। একসময় যে দুরন্ত কিশোরি ছিলো, তা আর এখন নেই। অবশ্য ওরা কেউই আর আগের মতো নেই।
সবাই অ্যাগনেসের বসার ঘরে বসলো। পনের বছর আগে সারাহ আর টম গাই-এর কাছ থেকে জাঞ্জিবার ছেড়ে পালানোর পর থেকে যা যা হয়েছে সব খুলে বললো সারাহ। আফ্রিকায় ওদের অভিযান, কেপ টাউনে বিয়ে করার কথা থেকে শুরু করে ফ্রান্সিসের সাথে দেখা হওয়া আর এখানে এসে জাহজডুবি, সবকিছুই সংক্ষেপে জানালো অ্যাগনেসকে।
অ্যাগনেস মোহাবিষ্টের মতো চুপচাপ শুনে গেলো সব। পুরোটা সময় ও সারাহের হাত ধরে রাখলো, এমন ভাব যেনো ছেড়ে দিলে সারাহ আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে।
“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি আমার সামনে বসে আছো,” ফ্যাসফেসে গলায় বললো ও। “আর উইলিয়াম কোর্টনীর ছেলে ফ্রান্সিস এতো বড় হয়ে গিয়েছে। পুরোটাই অলৌকিক লাগছে আমার কাছে।”
“ভাগ্যের নির্মম খেলায় আমরা আবার একসাথে হলাম,” টম স্বীকার করলো। “তবে এখন আগে ভাবতে হবে এই ঝামেলা থেকে পালাবো কিভাবে। আপনার স্বামীকে কি বিশ্বাস করা যায়?”
অ্যাগনেস মাথা ঝাঁকালো। “ক্যাপ্টেন হিকসের সাথে গাই কোর্টনীর কোনো খাতির নেই। বোম্বেতে গাই যতোভাবে পারে আমাদেরকে অপমান করেছে। আমার মনে হয় সে আমাদেরকে দেখতেই পারে না। গাই নিজে শয়তানি করে আমার স্বামীকে এই জঘন্য জায়গায় পাঠিয়েছে।”
“আর মিস্টার ফয়?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞে করলো।
“মিস্টার ফয় আছে শুধু নিজের ধান্দায়। গভর্নর হিসেবে উনি এখানকার সৈন্যদলের প্রধান, আর সেটা আমার স্বামীকে বারবার মনে করিয়ে দিতে ছাড়েন না। ওনার বৌ-টাও ওরকম। তবে আমি আর আমার স্বামী খেয়াল রাখবো যাতে ওরা আমাদের আসল সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই না জানে।”
“তাহলে ঠিক আছে, সারাহ বললো। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।”
বলেই ও জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে অ্যাগনেসের কোলের উপর পড়ে গেলো।
“হায় হায়,” আর্তনাদ করে উঠলো অ্যাগনেস। “করেছি কি? আপনারা সবাই না খেয়ে, ভেজা কাপড়েই বসে আছেন। আর আমি কিনা বকবক করেই যাচ্ছি। আপনাদের এখন খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম করা দরকার।”
টম আর ফ্রান্সিস ধরাধরি করে সারাহকে ভিতরে নিয়ে গেলো। ওর গা গরম হয়ে আছে, জ্বর আসছে সম্ভবত। ওকে এতো কষ্ট দেওয়ার জন্যে টম মনে মনে নিজেকে গালাগাল করতে লাগলো। বিছানায় শুইয়ে একটা কম্বল দিয়ে সারাহের শরীরটা ঢেকে দিলো ও। অ্যাগনেস ডাল আর লেবুর তৈরি একটা স্যুপ নিয়ে এলো। তারপর সারাহের পাশে বসে যত্ন করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগলো।
সদর দরজা খুলে গেলো। সামনের ঘর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ অ্যাগনেসের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভিতরে এসে ঢুকলো। কয়েক মুহূর্ত পর এঘরের দরজায় দেখা গেলো তাকে। একজন লম্বা, একহারা লোক। বালু রঙের চুল একেবারে খুলির সাথে লাগিয়ে কাটা। চামড়া রোদে পুড়ে লাল হয়ে আছে। বোম্বে রেজিমেন্টের লাল, সবুজে মেশানো পোশাক পরনে ওনার।
“ফয় বললো বাসায় নাকি মেহমান এসেছে।” আগন্তুকদের দিকে নজর বুলাতে বুলাতে সে হাত বাড়িয়ে দিলো। “এলিয়াহ হিকস, অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।”
“টম…” টম ইতস্তত করলো। “টম কোর্টনী।”
“কোর্টনী?” হিকসের স্বর বিস্ময় আর সন্দেহে ভারী হয়ে গেলো। সে অ্যাগনেসের দিকে ফিরলো। “তুমি এদেরকে…”
“এরা সবাই ঘরের লোক, সারাহের ফ্যাকাশে, উষ্ণ গাল মালিশ করতে করতে অ্যাগনেস বললো। “এ হচ্ছে আমার বোন সারাহ। বিশ বছর পরে ওকে দেখলাম আমি। আমাদের ভাতিজা ফ্রান্সিস কোর্টনী। উইলিয়ামের ছেলে।”
হিকস কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। টম আর ফ্রান্সিসের সাথে করমর্দন করে অ্যানার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো ও। তারপর অ্যাগনেস সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিলো। “ওর বিশ্রাম দরকার। এখানে এতে হৈ চৈ করলে হবে না। যাও সবাই!”
মহিলাদেরকে ওখানে রেখে আবার বসার ঘরে ফিরে এলো বাকিরা। হিকস ছেলেদের জন্যে বোয়া জামা আর পায়জামা এনে দিলো। ফ্রান্সিসের ঠিকমতোই হলো, তবে টম জামার বোতাম লাগাতে গলদঘর্ম হয়ে গেলো। ওয়াইন দিয়ে ওদেরকে আপ্যায়ন করলো হিকস। সামান্য পরেই টেবিলে মাছ আর ভাত সাজিয়ে ওদেরকে ডাক দিলো কাজের মেয়েটা।
“এই জঘন্য গরম,” হিকস অভিযোগের সুরে বললো। “ঈশ্বর জানে কিভাবে এখনো টিকে আছি।”
খাওয়া শেষে আবার ওয়াইন খেতে খেতে বৃষ্টি পড়া দেখতে লাগলো ওরা। হিকস কম কথার মানুষ, আর এখন এই সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদেরকে ও কি বলবে সেটাই ভেবে পাচ্ছিলো না।
