“দুর্গে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা কি?” জিজ্ঞেস করলো টম।
“নদী থেকে পানি আনা হয়,” ফয় জবাব দিলো। আবারও দরদর করে ঘামতে আরম্ভ করেছে সে। হাত দিয়ে নদীর ঘাট পর্যন্ত একটা পথ দেখালো। প্রায় চারশ গজ মতো দূরে।
“কেউ অবরোধ করলে তো পানির অভাবেই মরে যাবেন,” মন্তব্য করলো ফ্রান্সিস।
“ওহ! সেরকম কিছু হবে না। এই কালাগুলোর লড়াই করারই হিম্মত নেই। একটা গুলিই যথেষ্ট, সোটার শব্দেই ওরা জঙ্গলে গিয়ে পালাবে।”
সারাহ হাচি দিলো একটা। ওরা গোডাউনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। আর কালো মরিচের গন্ধে ওর নাকে সুড়সুড়ি লাগছে। গোলাঘরের দরজাগুলো বন্ধ, কারণ এখন উপসাগরে কোনো জাহাজ নেই।
“বর্ষাকাল শুরু হয়ে গিয়েছে, এখন আর এদিক দিয়ে কোনো জাহাজ যাবে না। শরতের আগ পর্যন্ত ব্যবসা বাণিজ্য পুরো বন্ধ।” দুঃখিত গলায় বললো ফয়।
“মরিচ কি আপনার মূল ব্যবসা নাকি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
ফয় মাথা ঝাঁকালো। “আগের মতো এখন আর দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজগুলোতে করে নির্দিষ্ট পরিমাণ মশলা সবসময় পাঠাতেই হয়। স্থানীয়দের সাথে চুক্তির কারণে এখানকার যতো মরিচ চাষ হয়। সবকিছুর একচেটিয়া খরিদ্দার আমরা, তাই কেনা আর বেচা দুটো ব্যবসা-ই আমাদের। যদি ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে তাহলে সামান্য কিছু লাভ শেষ পর্যন্ত থাকে।”
টম বুঝতে পারলো ‘ঠিক ব্যবস্থাপনা’ বলতে ফয় আসলে কি বুঝিয়েছে। ও যতোদূর শুনেছে, কোম্পানির এসব ছোট ছোট দূরবর্তী কুঠিকে সেখানকার গভর্নরেরা নিজেদের ব্যক্তিগত জায়গীর মনে করে। এরা স্থানীয়দেরকে যেমন ঠকায়, তেমন এদের উপরওয়ালাদের সাথেও দুই নম্বরি করে। ফয় যেটুকু লাভই করুক না কেন, তার খুব সামান্যই লেডেনহল স্ট্রিটে পৌঁছায়।
“এখানকার চাষীরা এতে খুশি?” অ্যানা জানতে চাইলো।
“খুশি?” ফয় যেনো আঁতকে উঠলো কথাটা শুনে। “আমার দেওয়া দামে যদি ওরা খুশি থাকে তাহলে সেটাকে আমি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নেবো।”
“ব্যবসা ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে হলে উভয় পক্ষকেই লাভবান হতে হয়।”
“আবার বলছি, এরা হচ্ছে অশিক্ষিত বর্বর একেকটা। এক মাস আগে কয়েকজন স্থানীয় চাষী আমার কাছে মাল বেচতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি ওদের গলায় একটা তরবারি ধরে সোজা মাল আনতে পাঠিয়ে দেই। ওদের কিছু করার নেই। ওদের রানির আদেশ এমনই।”
টম থমকে দাঁড়ালো। “চিত্তাত্তিঙ্কারা-র রানি?”
আবারও ফয় সন্দিহান চোখে ওর দিকে তাকালো। “ওনার সাথেও আপনার খাতির আছে নাকি?”
“ডাঙায় ওঠার পর ওনার কিছু লোকের সাথে দেখা হয়েছিলো। আমার কাছ থেকে একটা দামি জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছে ওরা।”
“দামি? কি রকম?” ফয়ের চেহারা আগ্রহে উজ্জ্বল হয়ে গেলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ওরা ভারতীয় কায়দায় বানানো একটা একতলা কিন্তু চওড়া বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। এধরনের বাড়িকে বলে বাংলো। “চলে এসেছি।”
ফয় দরজায় টোকা দিলো। পিছনে সারাহ আর টম উদ্বিগ্ন দৃষ্টি বিনিময় করলো। সারাহ ওর বোনকে সর্বশেষ দেখেছে সেই ষোল বছর আগে। এখনো কি ও আগের মতো আছে?
একটা ভারতীয় কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিলো। ফয়কে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখালো সে।
“তোমার মালকিনকে বলো যে কয়েকজন মেহমান এসেছেন।”
কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন মহিলাকে দেখা গেলো দরজায়। এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ানো দলটাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো সে। ভাল মতো দেখার জন্যে কয়েকবার চোখ পিটপিট করতে হলো তাকে।
“সারাহ?” দম আটকে বললো মহিলাটা। “আমি কি স্বপ্নে দেখছি নাকি?”
আনন্দের অতিশয্যে কাঁপতে শুরু করলো সে। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে ভেবে টম দ্রুত গিয়ে তাকে ধরলো।
“অ্যাগনেস, কান্না চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করে কোনোমতো বললো সারাহ। “আমিতো ভেবেছিলাম তোমার পুরনো বন্ধু সারাহ উইল্ডকে চিনতেই পারবে না।”
ফয় সরু চোখে ওদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে।
“আপনার এক বোনের নামও না সারাহ ছিলো, মিসেস হিকস?”
“বেচারি, কয়েক বছর আগে সে মারা গিয়েছে।” অ্যাগনেস বুদ্ধি করে বললো। ও সারাহের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলো। “ভিতরে আসো। তোমার সাথের ওদেরকেও আসতে বলল।” টম, ফ্রান্সিস আর অ্যানার দিকে ইঙ্গিত করলো ও। “ইশ! কতদিন পর। অনেক গল্প হবে আজ। আপনিও থাকবেন নাকি, মি. ফয়?”
“দুঃখিত, আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।” টুপির কোনা ধরে বললো ফয়। “আজকের মতো আসি। গুড ডে।”
ফয় যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হতেই অ্যাগনেস এক প্রকার ঝাঁপিয়েই পড়লো সারাহের উপর। এতো জোরে জড়িয়ে ধরলো যে সারাহের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো।
“সারাহ,” নিচু স্বরে কাঁদতে লাগলো অ্যাগনেস। “আসলেই তুমি? আমি ভেবেছিলাম তুমি আফ্রিকাতে মারা গিয়েছে।”
“মরতে মরতে বেঁচেছি-তাও কয়েকবার।” অ্যাগনেসের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো সারাহ। তারপর ওর চেহারা থেকে কান্নায় ভিজে যাওয়া চুলগুলো সরিয়ে দিলো। “কিন্তু এইতো দেখা হলো।”
“তুমি এখনো বেঁচে আছে সেটা আমাকে জানাওনি কেন?”
“তুমি কোথায় আছ সেটা তো জানা ছিলো না। আর চিঠি দিলেও সেটা যে গাই-এর হাতে পড়বে না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলাম না।”
তারপর একটু সরে টমের দিকে মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করলো।
