“আপনারা কারা? কি চান এখানে?” ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো সে।
“আমার আসল নাম বলো না,” ফিসফিসিয়ে বললো টম সবাইকে। “এখানে গাই-এর লোক থাকতে পারে। গাই যদি টের পায় যা আমরা ওদের সদর দরজায় এসে হাজির হয়েছি তাহলে কি দশা হবে মনে রেখো।”
“টম উইল্ড,” মোটা লোকটাকে বললো টম। “আমার ভাতিজা ফ্রান্সিস, আমার স্ত্রী সারাহ। আমাদের সফরসঙ্গী অ্যানা দুয়ার্তে।”
টম জানে ওদেরকে কতোটা উস্কুখুস্কু আর নোংরা দেখাচ্ছে। সে কারণেই সম্ভবত লোকটা ওদের দিকে চরম বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
“লরেন্স ফয়,” লোকটা জানালো। “আমি ব্রিঞ্জোয়ানের ব্রিটিশ কুঠির গভর্নর।”
“ঝড়ে আমাদের জাহাজ ডুবে গিয়েছে,” টম ব্যাখ্যা করলো।
“জাহাজ?” ফয় সন্দেহের দৃষ্টিতে টমকে দেখতে লাগলো। “কোন জাহাজ?”
“কেস্ট্রেল। কেপ টাউন থেকে গুড হোপ হয়ে মাদ্রাজে যাচ্ছিলাম আমরা।”
“এই নামের কোম্পানির কোনো জাহাজের কথা তো শুনিনি,” ফয় বললো। “ইন্টারলোপার নাতো আপনারা?”
টম প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেলো। “এই মুহূর্তে স্যার, আমরা কয়েকজন ভাগ্যবিড়ম্বিত নাবিক বাদে আর কিছুই নই।”
ফয় নাক সিটকালো। “হায় ঈশ্বর, আপনার গা থেকে আসছে।”
“কাপড় বদলাতে পারলে আমরাও বেঁচে যাই,” টম বললো।
ফয় নিজের ঠোঁট চেপে ভাবলো কিছু একটা। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুব কষ্টে আছে-যেনো বায়ু ত্যাগ করতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। টম মনে মনে হাসলো। ও জানে ফয় আপ্রাণ ভেবে বের করার চেষ্টা করছে যে, এই অনাহূত নোকগুলোর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার ভদ্র কোনো উপায় আছে কি না।
“ঠিক আছে ভিতরে এসে আগে খুলে বলুন সব,” কর্কশ কণ্ঠে বললো ফয়।
ওদেরকে দুর্গের ভিতরে নিয়ে গেলো ফয়। এক নজর দেখেই টম বুঝলো এখানে নিয়ম শৃঙ্খলা ঠিকভাবে মানা হয় না। দরজায় কোনো পাহারাদার নেই, শুধু দুর্গের ছাদে একজনকে দেখা গেলো, সে-ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটা কার্ণিশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে গভর্নরের থাকার জায়গাটা কাঠ দিয়ে বানানো, উপরে তালপাতার ছাউনি। গরমের মৌসুমে এই জিনিস বন ফায়ারের মতো জ্বলবে।
“এখানকার লোকজনের সাথে নিশ্চয়ই খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আপনার?” টম জিজ্ঞেস করলো।
ফয় হাত নেড়ে একটা মাছি তাড়ালো। “ওরা মাঝে মাঝে একটু আধটু ঝামেলা করে, কিন্তু উপযুক্ত জবাব পেয়ে ওদের টনক নড়েছে।”
টমের ঐ ঘোড়সওয়ারটার কথা মনে পড়লো, যে ওর তরবারিটা কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সে সম্পর্কে কিছু বললো না। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখা গেলো মেঝে বালিতে ভরে আছে, বাতাসের বেগ তখনো কমেনি। একজন অর্ধ উলঙ্গ ছোট ভারতীয় বাচ্চা বসে বসে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করছে। তাতে বাতাসের স্রোতের দিক বদল হচ্ছে শুধু, গরম এক বিন্দুও কমছে না।
ফয় ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লো। এক বাটি খেজুর তার সামনের ডেস্কে রাখা। ও একসাথে তিনটা মুখে পুরে দিলো, কিন্তু অতিথিদেরকে নেওয়ার জন্যে বললো না। এমনকি বসতেও বললো না। ক্ষুধায় টমের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো।
“আচ্ছা,” মুখভর্তি ফল নিয়ে বললো ফয়। “আপনাদের জাহাজডুবি হয়েছে বলছেন। কি ছিলো আপনাদের জাহাজে?”
প্রশ্নটা শুনে টম অবাক হয়ে গেলো। “সেটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক, স্যার।”
“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।” সরু চোখে টমের দিকে তাকিয়ে বললো ফয়। টম টের পেলো এই ভালোমানুষি পোশাকটার নিচে আসলে ফয় একটা কুৎসিত আর কূট বুদ্ধির মানুষ।
“আইভরি, কাপড়, কিছু হাতে বোনা জিনিস।”
“ইউরোপিয়ান মালপত্র।”
“আমরা কেপ টাউন থেকে কিনেছি সব।”
“সেটা তো আপনাদের কথা। আপনাদের কাছে লগ বই আছে? বা কোনো ইশতেহার? রশিদ? মানে আপনাদের কথার প্রমাণের পক্ষে কিছু আছে?”
রাগ সামলাতে কষ্ট হলো টমের। “আমাদের সব কাগজপত্র জাহাজের সাথেই ডুবে গিয়েছে।”
“তাই নাকি?” বলে ফয় মুখ থেকে খেজুরের বিচি ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে। “কোম্পানি ইন্টারলোপারদের কি করে জানেন তো? আমি চাইলে আপনাদেরকে গ্রেপ্তার করে ডাণ্ডা বেড়ি পরিয়ে আবার ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠাতে পারি। বোম্বেতে পাঠিয়ে গভর্নর কোর্টনীর হাতে তুলে দিতে পারি। বোম্বেতে কিন্তু ইংরেজ আইন সবসময় চলে না। ওখানে গভর্নরের আদেশই আইন।”
ফয় চুপ করে কিছুক্ষণ কি যেনো ভাবলো। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। “তবে আমরা যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি তাহলে ভিন্ন কথা।”
শালা ঘুষ চায়! টম বুঝলো। কিছুটা শান্ত হলো ও। এধরনের পরিস্থিতিতে বহুবার পড়েছে ও, তাই ব্যাপারটা ভালোই বুঝতে পারছে।
“কিন্তু জাহাজডুবির পর আমরা এখন নিঃস্ব,” খুবই হতাশার একটা ভঙ্গি করলো টম।
ফয় ওর আঙুল তুললো। “খুবই দুঃখজনক।”
“যাইহোক,” টম বলে চললো। “আমাদের সাথে আইভরির একটা চালান ছিলো। যদি ঝড়ে আমাদের জাহাজের তলা ফেটে না যায় তাহলে ওটা জাহাজের ভিতরেই থাকবে। আর জাহাজ কম পানিতেই ডুবেছে। আমাদেরকে যদি একটা নৌকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে ওখান থেকে যা উদ্ধার হবে তার চার ভাগের এক ভাগ আপনাকে দিতে আমার আপত্তি নেই।”
“এটা আবার কি ধরনের প্রস্তাব?” ফয় এমনভাবে মুখ বিকৃত করলো যাতে টম বুঝতে পারে যে ও আসলে কতোটা আহত হয়েছে। “আমিতো চাইলে নিজেই সব উদ্ধার করে আমার বলে দাবি করতে পারি।”
