কিন্তু সারাহ চিৎকার করে উঠলো, “ওদেরকে দিয়ে দাও ওটা, টম! ঈশ্বরের দোহাই, এই তরবারির জন্যে মরতে হবে না তোমাকে। ওরা ছয়জন আর তুমি একা। কুচি কুচি করে কেটে ফেলবে ওরা তোমাকে।”
টমও জানে ব্যাপারটা। ও তরবারিটা নামিয়ে টুঙ্গারের দিকে ছুঁড়ে দিলো। তরবারিটার ডগার দিকটা মাটিতে গেঁথে ঠরঠর করে কাঁপতে লাগলো। কবজির একটা মাত্র মোচড়ে টুঙ্গার টমের হাত থেকে ওর চাবুকটা ছাড়িয়ে নিয়ে সামনে বাড়ার জন্যে ঘোড়ার পেটে গুতো দিলো।
সামনে এগিয়ে ও ঘোড়ার পিঠ থেকেই ঝুঁকে তরবারিটার হাতল ধরে টান দিয়ে ছুটিয়ে নিলো। তারপর সেটাকে সোজা টমের চেহারা বরাবর তাক করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো। টম অনড় দাঁড়িয়ে রইলো। সারাহ চিৎকার দিয়ে ওর দিকে দৌড় দিলো যাতে টমকে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করতে পারে। কিন্তু অ্যানা আর ফ্রান্সিস ওকে টেনে ধরে রাখলো।
একেবারে শেষ মুহূর্তে টুঙ্গার তরবারিটা সরিয়ে নিয়ে হাতলের নীলাটা দিয়ে টমের কপালের মাঝখানে আঘাত করে ওকে ছাড়িয়ে কিছুদূর সামনে এগিয়ে গেলো। টম কপালের জায়গাটা চেপে ধরে বসে পড়লো মাটিতে। ওখান থেকে রক্ত বেরিয়ে ওর মুখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে লাগলো।
টুঙ্গার ওর ঘোড়াকে আবার ফিরিয়ে এনে টমের সামনে এসে দাঁড়ালো। মুখে শয়তানি হাসি, টমকে এভাবে ভড়কে দিতে পেরে নিজের উল্লাস লুকানোর কোনো চেষ্টাই করছে না।
“এই শুয়োরের বাচ্চাটা বলছে কি?” অঝোর ধারায় কাঁদছে সারাহ।
“ও বলছে ওর মালকিন, মহামহিম রানি, এই উপহার পেয়ে খুবই খুশি হবেন। আর উনি এমনকি আমাদেরকে কিছু খাবার ভিক্ষাও দিতে পারেন, তারপর যেখান থেকে এসেছি সেখানেই পাঠিয়ে দেবেন।”
টুঙ্গারের মজা নেওয়া শেষ। সে দাঁড়ানো লোকগুলোকে ধমক দিয়ে কিছু একটা বলতেই সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে বসে পড়লো। চলে যাওয়ার আগে ও অ্যানার দিকে চেয়ে কিছু একটা বললো, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে ঝড়ের বেগে প্রস্থান করলো। একটু পরেই খাড়িটা ধরে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেলো সবাই।
সারাহ টমের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলো, “বেশি ব্যথা পেয়েছো?”
টম ওর কপাল থেকে রক্ত মুছলো। কাটাটা খুব বেশি গভীর না, তবে বিশাল একটা কালশিটে পড়ে যাবে। “এরচে খারাপ অবস্থা বহুবার হয়েছে।”
কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো ওর। “যাওয়ার সময় কি বলে গেলো শয়তানটা?”
“উপকূল ধরে কয়েক মাইল গেলে নাকি একটা টুপিওয়ালাদের থাকার জায়গা আছে। গ্রামের মাতবরকে বললে একজন লোক সাথে দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবে।”
“টুপিওয়ালা?” টম মাথা ঝাঁকিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করলো।
“ইউরোপিয়ানদের ওরা এই নামে ডাকে। এরা পাগড়ি পরে, আমরা পরি টুপি।”
“হুম, ঠিকই আছে,” টম বললো।
অ্যানা ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে যাওয়ার জন্যে গ্রামের মাতবরের সাথে ওদের সাথে একজনকে দেওয়ার ব্যাপারে আলাপ করলো। টম লোকটাকে পুরস্কার হিসেবে ওর তরবারিটার বেল্টটা দেবে বলে কথা দিলো। ওটার আর কোনো দরকার নেই। কিন্তু লোকটা খুশি হয়ে গেলো ওটা পেয়ে।
গ্রাম ছাড়িয়ে আগে আলফ উইলসন আর কেস্ট্রেল-এর বেঁচে যাওয়া বাকি লোকদের খুঁজতে গেলো ওরা।
তারপর ওদের গাইড উপকূলের বন ধরে উত্তর দিকে যাওয়া শুরু করলো। রাস্তাটা সম্ভবত ব্যবহার হয় না অনেক দিন। কখনো বন ছাড়িয়ে খোলা সৈকত দিয়ে আগালো ওরা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট নদী বা সাগরের জমে থাকা পানি হেঁটে পার হতে হলো।
দলের প্রত্যেকেই ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আছে, গায়ে একদমই শক্তি নেই। পথিমধ্যে কয়েকটা পচা আম পাওয়া গেলো, যারা পেড়েছিলো, তারাই সম্ভবত ফেলে গিয়েছে।
অবশেষে বড়সড় একটা নদীর কিনারে এসে পৌঁছালো ওরা। নদীটা সাগরে গিয়ে মিশেছে। নদীর অপর পাড়ে একটা পাথরের দুর্গ দেখা যাচ্ছে। ওটার চুড়ায় ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা উড়ছে লাল আর সাদা ডোরা কাটা আর এক কোনায় ইউনিয়ন জ্যাক (ব্রিটেনের পতাকা)।
দুর্গের সামনে ভারী ব্রেকার (ঢেউ ভেঙে দেওয়ার জন্যে বসানো বাধ) বসানো। ঢেউ আছড়ে পড়ে ফেনায়িত হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে চারদিকে। পানির সীমার উপরে, বালির ভিতর কয়কেটা চোখা মাথার নৌকা তুলে রাখা হয়েছে। দুর্গের পিছনে ছয়টা গোডাউন আর গোলাঘর, ওখানে কোম্পানির মালামাল রাখা হয়। পাম গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া কয়েকটা কুটির দেখা গেলো ওগুলোর পাশে।
“এই পতাকাটা দেখে যে কোনোদিন এতো খুশি হবো, তা স্বপ্নেও ভাবিনি,” টম স্বগোক্তি করলো।
ওদের গাইড শিষ বাজাতেই কয়েকজন স্থানীয় মাঝি নৌকা নিয়ে এগিয়ে এলো। ওদেরকে পার করে দিতে প্রস্তুত। নদীর অপর পাড়ে পৌঁছাতেই দেখলো দুর্গ থেকে কয়েকজনের একটা দল ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাল পোশাক পরা প্রায় ডজনখানেক সৈন্য দেখতে পেলো টম। নীল পোশাক পরা কর্মচারীরাও আছে সাথে। তিন চারজন মহিলাকেও দেখা গেলো তাদের ছোট ছোট ছাতার নিচ থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মনে হলো অবশেষে ওরা আবার সভ্য কোনো জায়গায় পৌঁছেছে। এবার ওদের কষ্টের অবসান হবে।
দর্শকদের ভেতর থেকে লাল রঙের আঁটসাঁট পোশাক পরা দশাসই এক লোক এগিয়ে এলো। এই ভ্যাপসা গরমের মাঝেও সে একটা পরচুলা পরে আছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে মুখের পাউডার ধুয়ে মুখ আর কাপড়ে সাদা রঙের সর্পিল রেখা একে দিয়েছে।
