“তবে আমার মনে হচ্ছে বেশিরভাগ মালই নষ্ট হয়ে যাবে,” টম বললো। “আইভরিগুলো হয়তো উদ্ধার করা যাবে। আর ডোরিয়ান আর আবোলির কাছে তো সেন্টারাস আছেই। ওদের সাথেও ভালো ব্যবসা করার মতো যথেষ্ট মালামাল আছে। আমরা যদি জায়গামতো না পৌঁছাই, ওরা কেপ টাউনে ফিরে যাবে। আর আমরা যদি ফিরে যাওয়ার মতো কোনো জাহাজ পেয়ে যাই, তাহলে এবারের মতো অল্পের উপর দিয়ে বেঁচে যাবো আশা করি।”
ওরা অপেক্ষা করতেই লাগলো। মাথার উপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। কিন্তু গ্রামবাসীরা নড়লো না।
“ওদেরকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা কিছু একটার জন্যে অপেক্ষা করছে,” ফ্রান্সিস মন্তব্য করলো।
“ওদের সর্দারের জন্যে,” অ্যানা বললো। ও বসেছে ফ্রান্সিসের পাশে। উষ্ণতার জন্যে ওর গায়ের সাথে গা লাগিয়ে আছে। “এই লোকগুলো এদের। সর্দারকে সাংঘাতিক ভয় পায়। অনুমতি ছাড়া এক পা-ও নড়বে না।”
“আশা করি এদের সর্দারের কাছে আমার মাপের এক সেট শুকনো কাপড় পাবো,” সারাহ বললো। এতোক্ষণ ধরে ভেজার পরে এই লবণ মাখা জামাটা পরে থাকতে থাকতে ওর গায়ে চুলকানি শুরু হয়েছে। কিন্তু ওগুলো পাল্টে পরার মতো কিছুই নেই সাথে।
“সাথে আমাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে একটা জাহাজ,” বললো ফ্রান্সিস।
“সাথে একটা খাসীর ঠ্যাং,” ঘুম জড়ানো গলায় বললো টম। মাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে ও। আগুনের তাপে উষ্ণ হতে শুরু করেছে। গত দুই দিন এক ফোঁটা ঘুমায়নি। ওর চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো।
ঘুমিয়ো না, নিজেকে বললো টম। এখনো নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাওনি।
ঘুম তাড়ানোর আশায় নিজের গালে চিমটি কাটলো ও। কিন্তু কিছুই অনুভব করতে পারলো না। আর ওর পক্ষে জেগে থাকা সম্ভব না। নিজের মনের এক অতল কালো গর্তের ভিতর ডুবে যেতে লাগলো ও।
*
টমের ঘুম ভাঙলো কারো হাতের ঝাঁকুনিতে। সারাহকে স্বপ্নে দেখছিলো ও। তাই প্রথমে মনে হলো সারাহই বুঝি ঝাঁকাচ্ছে ওকে।
ঝট করে চোখ খুললো টম। ওরা আর এখন কুঁড়ের ভিতর একা না। কয়েকজন গ্রামবাসী ভিতরে ঢুকে ওকে ধরে টানছে। টেনে তারা সোজা দাঁড় করিয়ে দিলো ওকে। সারাহ আর বাকিদের খোঁজে চারপাশে তাকালো ও, কিন্তু কাউকেই দেখা গেলো না। সহসা ও পুরো সজাগ হয়ে গেলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লোকগুলোর হাত ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিলো। তারপর দরজার চৌকাঠ দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো বাইরে।
সারাহ, অ্যানা আর ফ্রান্সিসকে ঘিরে গ্রামবাসীরা বিশাল একটা চক্র করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সামনেই সাতজন অদ্ভুতদর্শন লোক ঘোড়ার পিঠে বসা। প্রত্যেকের চেহারাই কঠোর, মুখে কাটাকুটির দাগ; গায়ে বর্ম, আর মাথার পাগড়িটা ইস্পাতের শিরস্ত্রাণের উপরে পেচানো। প্রত্যেকেই ভারি অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত। কোমরে পিস্তল আর ছোট আকারের তরবারিও দেখা গেলো। চারজনের হাতে বর্শা, বাকি তিনজন তরবারি হাতে।
টম, সারাহ আর অ্যানার সামনে গিয়ে ওদেরকে আড়াল করে দাঁড়ালো। “কারা এরা?” জানতে চাইলো ও।
সর্দার মতো লোকটা ঘোড়ায় লাথি মেরে সামনে এগিয়ে ওদের চারপাশে চক্কর দিতে দিতে অগ্নিদৃষ্টিতে ওদেরকে দেখতে লাগলো। লোকটার মাথার পাগড়িতে একটা হলুদ রঙের পাখির পালক গোজা, আর ওর বুকের বর্মটার চারপাশ স্বর্ণ দিয়ে বাঁধানো। একটা সরু ক্ষতচিহ্ন তার কপাল বেয়ে চোখের মাঝ দিয়ে নাকে এসে থেমেছে। তাতে চেহারায় একটা আলাদা শয়তানি ভাব প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। যেনো ওর মাথাটা কেউ দুই ভাগ করে দিয়েছিলো, তারপর আবার কোনোমতে জোড়ে লাগিয়ে দিয়েছে।
লোকটা চিৎকার করে গ্রামের মাতবরকে কিছু একটা বললো। মাতবর আমতা আমতা জবাব দিল প্রশ্নের। কথা বলার সময় দুই হাত ক্ষমার ভঙ্গিতে জড়ো করে মাথা নিচু করে রেখেছে।
“এই ব্যাটার নাম হচ্ছে টুঙ্গার,” অ্যানা অনুবাদ করে শোনালো। “ও এখানকার স্থানীয় প্রশাসক, চিত্তাত্তিঙ্কারা-র রানির একজন সুবলদার।”
টুঙ্গার জুলজুলে চোখে নেপচুন তরবারিটার নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো। টমও হাতলে হাত রেখে চেয়ে রইলো ওর দিকে।
“ওকে বল যে আমাদের জাহাজ ভেঙ্গে পড়েছে, আর আমরা শুধু একটু খাবার চাই আর নিরাপদে কাছাকাছি ইউরোপিয়ান কোনো উপনিবেশে যেতে চাই, আর কিছু না।”
অ্যানা বললো, কিন্তু বোঝা গেলো টুঙ্গারের ওর কথার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। এমনকি ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই ও বেয়াদবের মতো রূঢ় ভাষায় অ্যানাকে থামিয়ে দিলো।
“কি বলে ও?” টম জিজ্ঞেস করলো।
“বলছে এদেশে যে-ই আসুক না কেন, তাকে নাকি রানিকে কিছু একটা উপঢৌকন দিতে হবে।”
“ওকে বল যে আমাদের সব কিছুই জাহাজডুবিতে ভেসে গিয়েছে।”
অ্যানা কথাটা বলতেই টুঙ্গার টমের দিকে টিটকারির ভঙ্গিতে হাসলো। তারপর সামনে ঝুঁকে ঘোড়ার চাবুকটা দিয়ে ওর নেপচুন তরবারিটা দেখালো।
“না,” টম মাথা নাড়লো। “এটা কোনোদিনও না। এটা আমার পারিবারিক ঐতিহ্য। যাই হোক। আমাদের জাহাজে আইভরি ছিলো কিছু। সাগর শান্ত হলে আমরা ওগুলো উদ্ধার করে এনে রানিকে উপহার দেবো।”
টুঙ্গার লম্বা চাবুকটার প্যাঁচ খুলে, জ্যান্ত সাপের মতো সামনে ছুঁড়ে মারলো। ওটার আগা গিয়ে টমের কবজি পেঁচিয়ে ধরে, ওর হাতটাকে আঁকি দিয়ে তরবারির হাতল থেকে সরিয়ে দিলো। তারপর পায়ের গুতোয় টুঙ্গার ওর ঘোড়াটাকে পিছিয়ে নিতে গলো যতক্ষণ না চাবুকটা টানটান হয়ে যায়। দুজন লোক ঘোড়া থেকে নেমে এসে তরবারিটা নিতে গেলো। টম ওদের দিকে লাথি ছুঁড়ে মোচড় দিয়ে সরে গেলো একদিকে। আরো দুজন লোক নেমে এসে টমকে ঘিরে ধরলো। ওদের বর্মগুলো টমের বুক বরাবর তাক করা। রেগেমেগে টম বাম হাত দিয়ে তরবারিটা খাপ থেকে বের করে এনে ওকে ঘিরে থাকা লোকগুলোকে ভয় দেখাতে লাগলো।
