“এদের ধর্মে নগ্নতায় লজ্জার কিছু নেই,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “আর এই আবহাওয়ায় কাপড় আসলে খুব একটা গায়ে রাখাও যায় না।”
মহিলা ওদের গোলার আওয়াজ পেয়ে মুখ তুলে তাকালো। তারপর চিৎকার দিয়ে হাতের কাপড়চোপড় এক করে ডাঙ্গার দিকে দিলো দৌড়।
“দাঁড়ান,” টম ডাকলো। মহিলা কাছের একটা কুঁড়েতে ঢুকে গেলো, চেঁচানো থামছেই না। টম কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুঁড়ের ভিতর থেকে এক লোক শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। এর পরনেও মহিলাটার মতোই পোশাক। হট্টগোল শুনতে পেয়ে অন্য কুঁড়েগুলো থেকেও লোকজন বেরিয়ে এলো। একটু পরেই সারা গ্রাম এসে জড়ো হলো ওদের পাশে। বিচিত্র ভাষায় ওদেরকে দেখিয়ে কি সব বলতে লাগলো।
চুল-দাড়ি সাদা হয়ে যাওয়া এক কুজো বুড়ো এগিয়ে এলো সামনে। সম্ভবত ইনি-ই হচ্ছেন গ্রামের মাতবর। অ্যানা প্রথমে পর্তুগিজ ভাষায় তার সাথে কথা বললো। তারপর ভারতীয় একটা ভাষায়। কিন্তু মাতবরের মুখের ভঙ্গি বদলালো না। টেনে টেনে কথা বলতে লাগলো সে।
“তুমি এদের কথা বুঝতে পারছো?” অ্যানাকে জিজ্ঞেস করলো টম।
“মালায়ালম ভাষার একটা কথ্য রূপে কথা বলছে এরা, অ্যানা জানালো। “অনেকটা তামিলের মতোই। তাই ইনি কি বলছেন বুঝতে পারছি।”
“বলো যে আমাদের খাবার লাগবে। আর কাছের বন্দরটা কোথায় সেটা জিজ্ঞেস করো।”
অ্যানা কথা বলতে লাগলো। আলাপ শেষ হওয়ার পর মাতবর কিছু একটা আদেশ দিলেন। একটা তালপাতার সেপাই ছেলে বনের ভিতর দৌড়ে গেলো। কয়েকজন মহিলা গেলো খাবার আনতে। আর একজন মহিলা শুকিয়ে আসা কাদার মতো দেখতে কিছু একটা হাতে নিয়ে পাশের একটা কুঁড়েতে ঢুকে গেলো। প্রথমে সে জিনিসটা ফেটে যাওয়া মাটির মেঝেতে লেপে দিলো, তারপর সারা দেওয়ালে একই কাজ করতে লাগলো।
“কি করছেন উনি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“বাড়িটা পরিষ্কার করছে।”
“কাদা দিয়ে?”
অ্যানা মুখ টিপে হাসলো। “ওটা কাদা না, গোবর।”
“গোবর?” আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রান্সিস। খুবই অবাক হয়েছে। ময়লা জিনিস দিয়ে ওরা ঘর পরিষ্কার করে?”
“গরু এদের কাছে খুব পবিত্র,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “ওটার বর্জ্যও তাই ঘরকে শূচি করে।”
মহিলাটা বেরিয়ে এলে মাতবর ওদেরকে ভিতরে যেতে ইঙ্গিত করলো।
“উনি আমাদেরকে ভিতরে যেতে বলছেন।”
টম ঢুকে গেলো। দরজাটা অনেক নিচু। আর ভিতর কোনো জানালা-ও নেই। শুধু দেয়ালের ফাটা থেকে চুঁইয়ে কিছু আলো আসছে। বেশি ফাটা জায়গায় আবার গোবর দিয়ে পট্টি মারা। তবে মেঝেটা শুকনো, বৃষ্টি ঢুকছে না ভিতরে। মাঝখানে একটা পাথরের চক্রের ভিতরে ছোট্ট একটা আগুন জ্বলছে।
তবুও জায়গাটা মানুষের থাকার জায়গার বদলে জন্তু জানোয়ারের থাকার জায়গা বলে মনে হতে লাগলো। টমের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, এই অজানা দেশে, অচেনা মানুষের মাঝে এরকম বদ্ধ ঘরে প্রবেশ করতে ওকে নিষেধ করতে লাগলো।
“আমার বাইরেই ভালো লাগছে।”
অ্যানা গ্রামবাসীকে সেটা বললো। হয় ওরা ব্যাপারটা বুঝলো না অথবা ব্যাপারটা ওদের কাছে আদবের বিশাল একটা বরখেলাফ। ওরা কোর্টনীদের চারপাশে জড়ো হয়ে জোর করে দরজার দিকে ঠেলে দিতে লাগলো। অনেকেই আবার টমের কোমরে বাধা নেপচুন তরবারিটা ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। ওটার কারিগরি নৈপুণ্য আর বাটে বানো নীলকান্তমণিটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নানান কথা বলাবলি করছে সবাই।
মেঝেতেই বসলো ওরা সবাই, আর গ্রামবাসীরা দরজায় অপেক্ষা করতে লাগলো। বৃষ্টিতে ভিজছে, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। উলঙ্গ বাচ্চারা তাদের বাবা মায়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে ওদেরকে দেখার জন্যে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মহিলারা ওদের জন্যে এক বাটি ভাত আর আঙ্গুরের বিশাল একটা পাতায় করে ডাল নিয়ে এলো। টম গোগ্রাসে গিলতে লাগলো সেসব। পেট পুরে খেয়েও খিদে মিটলো না ওর। কিন্তু সবার হাড্ডিসার শরীর দেখে বুঝতে পারলো, ওদের যা কিছু ছিলো তার সবই সম্ভবত মেহমানদারিতে শেষ করে ফেলেছে।
খাওয়া শেষ করে টম দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু লোকজন একটুও নড়লো না।
“ওরা বলছে আমাদেরকে নাকি এখানেই থাকতে হবে,” আনা জানালো।
“কেন?”
“আমি যতোদূর বুঝতে পারছি, ওরা সম্ভবত ওদের স্থানীয় সর্দারকে খবর দিতে গিয়েছে,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “উনি আসলে হয়তো আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবেন।”
টম নিজের জাগায় ফিরে গিয়ে হতাশ হয়ে মাটিতে বসে মেঝেতে আঙুল দিয়ে ড্রাম বাজাতে লাগলো। “আমরা কোথায় আছি সেটা কি বলেছে ওরা?”
“না। আমাদের জাহাজের নিশানা যা ছিলো তাতে আমরা কোনদিকে আসছিলাম সেটা বলতে পারেন না?”
টম কাঁধ ঝাঁকালো। ঝড়টা এতো জোরে আমাদেরকে টেনে এনেছে যে পঞ্চাশ মাইলের ভিতরে কোথায় কি আছে তা বুঝতে পারছি না। জায়গাটা সিলন হতে পারে…”
“এটা সিলন না,” অ্যানা বললো। “ওদের ভাষা আলাদা।”
“তার মানে ভারত। মালাবার উপকূল সম্ভবত।”
অ্যানা মাথা ঝাঁকালো। “সেটাই মনে হয়-তাহলে আমাদের জন্যে ভালোই হবে। উপকূল জুড়ে ব্রিটিশ আর পর্তুগিদের কুঠি আছে। আমরাও একটা খুঁজে বের করতে পারবো।”
“ওরা আমাদেরকে সাহায্য করবে?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।’
“আমাদের জাহাজ গভীর পানিতে ডোবেনি,” সারাহ বললো। “ঝড় কমলে হয়তো ওটার মালপত্রগুলো উদ্ধার করা যাবে। দরকার হলে তা দিয়েই ওদের সাহায্য কিনে নেওয়া যাবে। মানে যদি ওরা আমাদেরকে এমনিতে সাহায্য করতে না চায় আরকি।”
