টম কাঁধ ঝাঁকালো। “বেচে আছি-এখন এটাই একমাত্র ব্যাপার।” জোর করে ও জাহাজডুবির ফলে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে সেসব ভাবা থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। সেসব নিয়ে পরেও ভাবা যাবে।
সারাহ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ধপ করে চার হাত-পায়ে বসে পড়ে বালির উপর বমি করে দিলো।
“এখানেই অপেক্ষা করো,” বললো টম।
টম আর ফ্রান্সিস অ্যানাকে আনতে গেলো। ওখানে পৌঁছে দেখে অ্যানার জ্ঞান ফিরেছে পুরোপুরি। কিন্তু নিজেই হেঁটে যাবে বলে জোর করে উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে আবার ফ্রান্সিসের গায়ে ঢলে পড়লো।
“আমি ভেবেছিলাম আমি মরেই গিয়েছি।”
“আমি সেটা হতে দিতাম না।”
টম বুঝলো ঝড়টা ফ্রান্সিসকে বদলে দিয়েছে। ওর মনের জোর এখন অন্য এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। ফ্রান্সিস অ্যানাকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো, আর টম অ্যানার চোখের দৃষ্টি খেয়াল করলো। সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতার চাইতেও আরো বেশি কিছু আছে। এখন আর অ্যানা ফ্রান্সিসকে একটা বাচ্চা ছেলে মনে করছে না, বরং পুরুষ হিসেবে দেখছে। হঠাৎ টমের নিজেকে কাবাবমে হাড্ডি মনে হতে লাগলো।
“আমাদের এখন যাওয়া উচিত।”
বেলা বাড়তেই পড়ে গেলো বাতাস, বৃষ্টির জোরও কমে গুঁড়ি গুঁড়ি পড়তে লাগলো। কিন্তু স্রোতের চেহারা পাল্টালো না; সৈকতে তাণ্ডব চালাতেই লাগলো। প্রতিবার আছড়ে পড়ার সময় শব্দ শুনে মনে হতে লাগলো যেনো বজ্রপাত হচ্ছে। নৌকাটা গায়েব হয়ে গিয়েছে। স্রোতে টেনে নিয়ে আছাড় মেরে গুড়ো গুড়ো করে ফেলেছে হয়তো। টমের প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগতে লাগলো, কিন্তু তবুও ও পুরো সৈকত চষে ফেলে কেস্ট্রেল-এর যে কয়জন তীরে আসতে পেরেছিলো তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করলো। আলফ উইলসনকে এদের মধ্যে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ও। তারপর সবাইকে নিয়ে যতোদূর সম্ভব সৈকতের উপরে উঠে গিয়ে, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে বসে রইলো।
সাগরে তখনও কেস্ট্রেল-এর খোলটা দেখা যাচ্ছে। স্রোত ভেঙ্গে পড়ছে। ওটার উপর। মাঝে মাঝে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আবার ভাসছে। একবার সেদিকে তাকিয়েই টম বুঝলো যে ওটার পক্ষে আর কোনোদিন সমুদ্রে নামা সম্ভব হবে না। ওটার পিছন দিক ভেঙ্গে গিয়েছে, ফলে খোলটা একেবার হা হয়ে খুলে আছে। মুল মাস্তুলের শুধু গোড়াটুকু আছে। বাকি দুটো ভেসে গিয়েছে কোথায় কে জানে? জাহাজের অর্ধেক তক্তা ভেসে ভেসে সৈকতে চলে এসেছে। ওটার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা জিনিসপত্রের উপর সামুদ্রিক পাখি এসে বসছে। যেনো কোনো শকুন একটা লাশকে ঠুকরে খাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
দৃশ্যটা সহ্য হলো না টমের। তারপরেই মনে পড়লো মারা যাওয়া লোকগুলোর কথা, লজ্জিত বোধ করতে লাগলো ও। লোকগুলোর জীবনের বিনিময়ে এই জাহাজ, মালপত্র সব আরো দুইবার হলেও দিয়ে দিতে রাজি টম।
“আমরা এখন কি করবো?” ফ্রান্সিস বললো।
“উপায় একটা বের হবেই,” সারাহ বললো। চেহারায় রঙ ফিরেছে ওর। নড়েচড়ে বেড়াতে পারছে এখন। তাই নাবিকদের ক্ষতের পরিচর্যা করছে যতোটা সম্ভব। যার যার গায়ের কাপড় ছিঁড়েই তাদের ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে। ভেসে আসা কাঠ দিয়ে চটা বানাচ্ছে।
“বসে বসে নাকি কান্না কাঁদলে কখনো কিছু ঠিক হয়ে যায় না,” বলতে বলতে টম উঠে দাঁড়ালা। তারপর সৈকত ধরে আরো খানিকটা উঠে এসে পাম গাছের গায়ের কাটা দাগগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলো ও। দা দিয়ে নারিকেল কাটার দাগ ওগুলো।
“কেউ এই গাছগুলো লাগিয়েছে। কাছেই কোনো গ্রাম আছে নিশ্চয়ই।”
কিছুদূর আরো আগাতেই ওরা একটা ছোট্ট খাড়ি দেখতে পেলো যেটা ভিতরের দিকে চলে গিয়েছে। ওটার পাড় দিয়ে একটা পায়ে চলা পথে দেখা গলো। কাদার ভিতরে অনেকগুলো পায়ের ছাপ সেখানে।
“আমি আর ফ্রান্সিস গিয়ে দেখে আসছি,” নেপচুন তরবারিটা কোমরে বেঁধে বললো টম। “সারাহ আর অ্যানা, আলফ আর বাকিদের সাথে থাকো।”
“না,” জোর গলায় বললো সারাহ। “আজ একটুর জন্যে আমরা বেঁচে গিয়েছি। আমি আর তোমার কাছ ছাড়া হবো না।”
টম জানে যে তর্ক করে লাভ নেই। আলফকে বাকিদের দায়িত্বে রেখে ওরা চারজন রাস্তাটা ধরে এগিয়ে চললো। একটা নারিকেল আর কাঁঠাল গাছের বনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে রাস্তাটা। লাল মাটির উপর উজ্জ্বল সবুজ। বৃষ্টির কারণে বনের ভিতর থেকে অদ্ভুত সব ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। বাতাস তাই সোদা মাটি আর কচি কান্ডের ঘ্রাণে ভারি হয়ে আছে।
কিছুদূর আগানোর পরেই ফ্রান্সিস চিৎকার দিয়ে উঠলো। সেদিকে তাকিয়ে সামনেই একটা কাঁটা ঝোঁপের বেড়া দেওয়া বাড়ি দেখতে পেলো বাকিরা। বাড়িটা ছোট, মাটির তৈরি। সামনে এক চিলতে উঠোন। ওটার পরেই খাড়ির ধারে আরো অনেকগুলো বাড়ি দেখা গেলো। প্রতিটা বাড়িই নির্দিষ্ট দুরত্বে বানানো। সব মিলে গ্রামটা আধা মাইলটাক চওড়া। খাড়িতে একজন মহিলা কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে কাপড় ধুচ্ছে। মহিলা বেশ কৃশকায়, আর কোমরে বাঁধা ছোট্ট একটা পাতলা কাপড় বাদে গায়ে আর কোন কাপড় নেই। এই শুলির মতো জোরালো বৃষ্টিতেও কোনো বিকার নেই তার।
“এদের কি কোনো লজ্জা শরম নেই নাকি?” ফ্রান্সিস অবাক হলো।
“আমরা লন্ডনের সমাজ থেকে এখন বহু দূরে,” টম মনে করিয়ে দিলো।
