অ্যানা মাথা ঝাঁকালো। “মনে হয়।”
“তাহলে চলো, জাহাজ থেকে নামতে হবে।” ফ্রান্সিস অ্যানার হাত ধরে মাস্তুলটার কাছে নিয়ে গেলো। কাছে গিয়ে ওকে বলতে হলো না, একাই ওটা ধরে হামাগুড়ি দিয়ে পানির উপর দিয়ে আগাতে লাগলো। ফ্রান্সিসও আগালো পিছু পিছু।
এ যেনো এক বুনো ঘোড়ার পিঠে চড়া। এখনো পোষ মানেনি, গায়ে স্যাডলও পরানো নেই-এরকম কোনো ঘোড়া। মাস্তুলটা ক্রমাগত নড়ছে। মোচড়াচ্ছে, ঢেউয়ের আঘাতে দুলছে। ফ্রান্সিস চার হাত পা দিয়ে গুঁড়িটা আঁকড়ে ধরে ইঞ্চি ইঞ্চি করে আগাচ্ছে। মাঝে মাঝে উপরে উঠে আসছে, বাকি সময়টা গাছে ঝোলা বানরের মতো হাত পা দিয়ে ধরে ঝুলে থাকছে। ঠিক নিচেই গর্জন করছে ঢেউ।
সামনেই দেখতে পেলো জাহাজ থেকে আশেপাশে নজর রাখতে ক্রোজ নেস্ট নামের গোল গামলার মতো যে জায়গাটা ব্যবহার করা হয়, সেটা তখনও মাস্তুলের সাথে আটকে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে ওটায় গিয়ে নামলো ফ্রান্সিস। অ্যানা আগেই নেমে একটা পাশ আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ফ্রান্সিস-ও অ্যানার পাশে হেলান দিয়ে বসলো। অবশেষে একটা আশ্রয় মিললো, যদিও ঝড় থেকে এখানে ওদের নিরাপত্তা খুবই কম।
ওখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। জাহাজটা এখনো ঝড়ের ধাক্কায় ঘুরছে; যে কোনো সময় মাস্তুলটা গড়ান খেয়ে ওদেরকে শুঙ্কু পানির নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওরা ধ্বংসাবশেষের অংশটুকু পেরিয়ে এসেছে, কিন্তু এখনো একটা ঢেউই ওদের কম্ম কাবার করে দিতে পারে। ফ্রান্সিস ঝড়ের মাঝেই চেষ্টা করলো নৌকাটাকে দেখার, আশা করছে টম আর বাকিরা নিরাপদেই আছে। কিন্তু ওদের কোন নিশানা পেলো না ও।
“সাঁতরাতে পারবে তুমি?” ফ্রান্সিস চিৎকার করে বললো অ্যানাকে।
অ্যানা মাথা নাড়লো। ফ্রান্সিস আর দেরি করলো না। অ্যানাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কয়েকশো গজ দূরেই ডাঙা দেখতে পাচ্ছে। তবে ও সোজা ওটার দিকে সাঁতরালো না। তার বদলে সমস্ত : শক্তি ব্যয় করলো শুধু ভেসে থাকার পিছনে। ও অ্যানার কোমরের নিচে হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে যাতে ওর মাথাটা পানির উপরে থাকে। অর্থাৎ স্রোতের কাছেই নিজেদের সঁপে দিয়েছে। স্রোতই ভাঙা জাহাজটা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে ওদেরকে। একসময় ধ্বংসস্তূপের শেষ অংশটাও পেরিয়ে এলো ওরা। এরপরেই শুরু করলো সাঁতার।
এতো কষ্টের পর আসলে ফ্রান্সিস স্রোতের ধাক্কা আর অনুভবই করছিলো না। ওগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারও চেষ্টা করলো না। স্রোতের টানে পানির নিচে ডুবে গেলো একবার, তারপর আবার লাথি মেরে মেরে উপরে উঠে এলো। আচমকা ও পায়ের নিচে শক্ত কিছু একটা অনুভব করতে পারলো। যে ঢেউগুলো ওদের এই ক্ষতির জন্যে দায়ী, সেই ঢেউই অবশেষে কৃপা করলো : ওদেরকে তুলে নিয়ে সৈকতের বালিতে আছড়ে ফেললো।
শরীরের শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে অ্যানাকে টেনে পানি থেকে দূরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেলো ফ্রান্সিস। যাতে স্রোতের টানে আবার ভেসে না যায়। সামনেই একসারি পাম গাছ দেখা গেলো। ওগুলোর নিচে গেলে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচা যায়, কিন্তু ফ্রান্সিস ফাঁকা জায়গাতেই থাকবে ঠিক করলো। বাতাসের চোটে গাছগুলো উলুখাগড়ার মতো বেঁকে যাচ্ছে, গাছের পাতা আর ফল প্রচণ্ড বেগে ছুটে যাচ্ছে একেক দিকে। গাছ থেকে পড়া নারিকেল কামানের গোলার মতোই মারাত্মক।
ফ্রান্সিসের সারা শরীর ব্যথা করছে। সাঁতার কেটে পা-গুলো এতোটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটাও আর নেই। ঝড়ো বাতাস এসে বিঁধছে ওর গায়ে। ইচ্ছে করছে বালি খুঁড়ে তার ভিতর শুয়ে থেকে ঝড় থামার অপেক্ষা করে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। টম এখনো সমুদ্রে, সাথে আছে সারাহ আর বাকি সব লোকজন।
ফ্রান্সিস অ্যানাকে শুইয়ে রেখে বাকিদের খুঁজতে বের হলো। অ্যানার জ্ঞান নেই প্রায়। কিছু জায়গা ফ্রান্সিস হামাগুড়ি দিলো, কোথাও দৌড়ে দৌড়ে সৈকত ধরে এগিয়ে চললো। উষ্ণ বৃষ্টির পানি পড়তে লাগলো ওর চেহারায়। বাতাসের ধাক্কায় বালি উড়ে এসে লাগতে লাগলো সারা গায়ে। কিন্তু তবুও থামার কথা চিন্তাও করলো না। টমের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সারা সৈকত খুঁজতে লাগলো। একসময় নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হতে লাগলো ওর। শেষে কাউকেই না পেয়ে সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই সর্বনাশা দুর্যোগের ভিতরে ওই ছোট্ট নৌকাটা টেকার সম্ভাবনা খুবই কম।
আর একটু এগিয়ে, সৈকতের পাশেই ফ্রান্সিস দেখলো বালির উপর একগাদা কাঠ পড়ে আছে। দৌড়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো ও। ওটা একটা ডিঙ্গি নৌকা, দুমড়ে মুচড়ে উল্টে পড়ে আছে। তবে এখনো আস্তই আছে। ওটার পাশের কালো অবয়বগুলো আসলে মানুষ। নৌকা থেকে যে যেখানে পড়েছে সেখানেই শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস দৌড়ে সবার কাছে গিয়ে দেখতে লাগলো। এক সময় সারাহকে খুঁজে পেলো, সবার শেষে পেলো টমকে।
“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আপনাদেরকে খুঁজে পেয়েছি।”
“আর অ্যানা?” সমুদ্রের দিকে ভীত চোখে তাকিয়ে বললো টম।
ফ্রান্সিস যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে দেখালো। “ও নিরাপদেই আছে।”
“আমরা এখন কোথায়?” খড়খড়ে কণ্ঠে বলে উঠলো সারাহ। লবণাক্ত পানি ঢুকে ওর গলা ছুলে গিয়েছে। পাশের বালিতে হাত ডুবিয়ে দিলো ও। টম নেপচুন তরবারির ঝিলিক দেখতে পেলো। এতো কিছুর পরেও সারাহ কিভাবে যেনো ঠিকই ওটাকে ধরে রেখেছে।
