“লাফ দাও।”
ফ্রান্সিস না দিয়ে বললো। “অ্যানা কোথায়?”
টম চারপাশ তাকালো। ডেক ফাঁকা।
“ও সম্ভবত নৌকায় উঠে পড়েছে।” দেরি করার সময় নেই। টম ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে নৌকায় ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ দিলো। একেবারে ফ্রান্সিসের উপর এসে পড়লো ও। দুজনে জড়াজড়ি করে গড়িয়ে গেলো আর নৌকাটাও দুলে উঠলো প্রচণ্ডভাবে।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। “অ্যানা কোথায়?” আবার বললো ও।
টম আশেপাশের মুখগুলো জরিপ করলো। অ্যানা নৌকায় নেই।
“ও তো আমার সাথেই কেবিনের দিকে গিয়েছিলো,” সারাহ বললো।
ফ্রান্সিসের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। “আর উপরে আসেনি?”
“আমাকে বলেছিলো তোমাকে খুঁজতে যাবে।”
জাহাজটা কেঁপে উঠলো। একটা আহত জন্তুর মতো গোঙ্গাচ্ছে ওটা। কাটা মাস্তুলটা বিচ্ছিন্ন হয়ে সাগরে পড়ে গেলো। এতো কাছে যে আর একটু হলে নৌকার উপরেই পড়তো। টম ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রেখে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, “এখন আর কিছুই করার নেই।”
“না”
আচমকা একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে এতো উপরে তুলে দিলো যে ওটা জাহাজের খোলের গায়ে বাড়ি খাওয়ার উপক্রম হলো। টম কিছু করার আগেই লাফ দিলো ফ্রান্সিস। চিৎকার দিয়ে উঠে আতংকিত চোখে টম দেখলো যে ফ্রান্সিস উন্মত্ত সাগর পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে জাহাজের দিকে। ওর বাড়িয়ে রাখা দুই হাত পাখির ডানার মতো বাতাসে ঝাঁপটাচ্ছে। একটা ঢেউ এসে জাহাজের উপর আছড়ে পড়তেই ও ডুবে গেলো পানির নিচে। টমও ঝাঁপ দিতে গেলে কিন্তু ঐ ঢেউটাই নৌকাটাকে এক ধাক্কায় জাহাজ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিলো।
তবে ফ্রান্সিস তখনও টিকে আছে। ফেনা সরে যেতেই টম দেখলো ফ্রান্সিস জাহাজের একটা রশি আঁকড়ে ভেসে আছে, আর জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসা পানির বিপরীতে নিজেকে টেনে সামনে আগানোর চেষ্টা করছে।
“আমাদেরকে ওকে উদ্ধার করতে হবে,” আলফের উদ্দেশ্যে চেঁচালো টম।
কিন্তু বলামাত্র আরো একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে আরো দূরে নিয়ে গেলো। অর্ধেক দাঁড় পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। আর বাকি অর্ধেক ভাঙা। যদি এখন ওরা সাগরের সাথে লড়াই করতে যায় তাহলে নৌকা উল্টে সবাই ডুবে যাবে।
ফ্রান্সিসের এখন নিজেকেই যা করার করতে হবে।
৪. ফ্রান্সিস কেস্ট্রেল
ফ্রান্সিস কেস্ট্রেল-এর ভাঙা দিকটা দিয়ে নিজেকে টেনে তুললো। তারপর কাত হয়ে থাকা ডেক ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। মনে মনে প্রার্থনা করছে যেনো কোনো কামান দড়ি ছিঁড়ে ছুটে না আসে। হ্যাচের কাছে পৌঁছে মাথা গলিয়ে দিলো ভিতরে। নিচে নামার সিঁড়িটা ভেঙ্গে গিয়েছে। খোলের ভিতর আস্তে আস্তে পানিতে ভরে যাচ্ছে। ওর বুকটা ধড়াস করে উঠলো। কেউ কি এর মধ্যে বেঁচে আছে? ওর মনে হচ্ছে না।
শুধু কালো রঙের পানি দেখা যাচ্ছে।
অ্যানা?” চিৎকার করে ডাকলো ও।
কোনো উত্তর এলো না।
খোলের আরো খানিকটা ভেঙ্গে পড়তেই জাহাজটা আরো একটু কাত হয়ে গেলো। ওর হাতে একদম সময় নেই। ও কিনারটা আঁকড়ে ধরে নিচের পানিতে নেমে এলো। নিচের দিকটা পানিতে পুরোপুরি ভরে গেলেও উপরের দিকে ঠিকই বাতাস আছে। ও জাহাজের এটা সেটা ধরে ধরে পানির উপর নাক উঁচিয়ে সামনে আগাতে লাগলো।
জাহাজটা উল্টে গেলেই এর ভিতর আটকে যাবো, ভাবলো ফ্রান্সিস। জোর করে নিজেকে আতংকিত হওয়া থেকে বিরত রাখলো ও ভারসাম্য রাখতে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই কি যেন একটা ঠেকলো
লাশ। ঠাণ্ডা আর ভেজা, তবে ও নিশ্চিত যে ওটা একটা মানুষের শরীর। এই অন্ধকারে ওর পক্ষে বলা সম্ভব না যে এটা অ্যানা কিনা। ও শরীরটাকে নিজের দিকে টেনে এনে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বের করলো মাথাটা। তারপর ঘাড়ে হাত রাখতেই মৃদু পালস টের পেলো।
জাহাজটা আবারও কাত হলো কিছুটা, পানিও ঢুকলো আরো। ফলে ফাঁকা জায়গা আর থাকলো না। পানিতে ডুবে যাওয়ার আগে ফ্রান্সিস আর মাত্র একবার শ্বাস নিতে পারলো।
হ্যাচের কাছে যাও, নিজেকে বললো ও। পানি ওকে ঠেলে ছাদের সাথে ঠেসে ধরছে। অজ্ঞান শরীরটা হাত দিয়ে চেপে ধরে ও ডুব দিলো। নোনা জলের ভিতরে চোখ খোলা রাখতে খবর হয়ে যাচ্ছে। আবার ভোলা না রেখেও উপায় নেই। হ্যাচের খোলা জায়গাটা দিয়ে সূর্যের কিরণ দেখেতে পাওয়া মাত্র মরিয়া হয়ে পানিতে পা চালালো ও। ভাঙা কাঠের টুকরো এসে আঘাত করলো ওকে। একটুর জন্যে ছাদে আটকানো একটা লোহার হুক চোখে বিধলো না। তবে শেষমেশ ঠিকই হ্যাচ-এর কাছে পৌঁছাতে পারলো। এবার সাগরই বরং সাহায্য করলো ওকে। ফুলে ওঠা পানিই ওকে হ্যাচ দিয়ে বের করে ভাঙা সিঁড়ির উপর দিয়ে ডেক-এ টেনে তুললো।
এতোক্ষণে ও দেখতে পেলো কাকে উদ্ধার করেছে। অ্যানাকেই-অবশ্য এখন এখান থেকে যেতে না পারলে এতো কষ্টের কোন মানেই থাকবে না। ওদের হাতে কয়েক সেকেন্ড সময় আছে মাত্র। জাহাজ ডুবে যাচ্ছে।
“জাহাজ ছেড়ে যেতে হবে,” ফ্রান্সিস চিৎকার করলো। চারপাশের পানি জাহাজের ভাঙা টুকরো টাকরা দিয়ে ভরে গিয়েছে। এর ভিতর দিয়ে সাঁতরাতে গেলে ওগুলোর আঘাতে ভর্তা হয়ে যেতে হবে। তবে মাস্তুলটা সবকিছুর উপর দিয়ে একটা সাঁকোর মতো শুয়ে আছে। ওটার অমসৃণ গা ওটাকে সরতে দিচ্ছে না।
ওর কোলে অ্যানা নড়ে উঠলো। চোখ খুলে তাকালো সাথেসাথেই।
“কি-?”
“সময় নেই।” ফ্রান্সিস ওর পিঠে চাপড় দিলো। একগাদা নোনা পানি বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। “নড়তে পারবে তুমি?”
