“আপনি কি নিশ্চিত?” মেট বললো। “নোঙ্গরটা গেলে কিন্তু আমরা পুরোপুরি সাগরের দয়ায় পড়ে যাবো।”
“আমাদেরকে ডাঙা থেকে দূরে সরে যেতে হবে,” টম চেঁচিয়ে জবাব দিলো। “নোঙ্গর ছুঁড়ে মারো।”
নোঙ্গর পানিতে গিয়ে পড়লো। একই সাথে সর্বশক্তি দিয়ে হাল টেনে ধরা হলো। খুবই আস্তে, একটু একটু করে ঘুরে যেতে লাগলো জাহাজের মুখ। ঢেউয়ের সাথে সমান্তরালে চলে আসায় জাহাজ কাত হয়ে গেলো একদিকে। প্রচণ্ড জোরে কাঁপছে।
“দড়ি কেটে দাও।” কুড়াল হাতের লোকগুলো নোঙ্গরের সামনের দিকের দড়ি কেটে দিলো। জাহাজটা ঝাঁকি দিয়ে ভারমুক্ত হলো। এবার জাহাজের পিছনের দিকের দড়িতে টান পড়লো। আর জাহাজটা ঘুরতে লাগলো।
তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না ব্যাপারটা। ঢেউ আর বাতাস একসাথে দুটো প্রতিপক্ষের কারণে, জাহাজটা পর্যাপ্ত গতি পাচ্ছিলো না। আবার ওটা বাতাসের দিকে ঘুরে যেতে লাগলো।
আরো দুজন লোক হালীর সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে টেনে ধরলো। হাল। জাহাজের নাকটা সোজা রাখতে কষ্ট হচ্ছে। আচমকা ওরা সবাই হুড়মুড় করে ডেক-এর উপড় আছড়ে পড়লো। আর হালের চাকাটা বনবন করে ঘুরতেই লাগলো। ওটার সাথে আর কোনো কিছুর সংযোগ নেই।
“হালটা গেলো,” চেঁচিয়ে উঠলো হালী।
“সাথে পাল-ও,” বললো আলফ। পালটা একেবারে মাঝ বরাবর ফেসে গিয়েছে। জামার সামনের দিকের মতো লাগছে এখন ওটাকে।
কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কেস্ট্রেল আবার পিছনে সরে গেলো। ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগলো ওটার খোলের উপর। আস্তে আস্তে আবার সমুদ্রের সমান্তরালে চলে আসছে ওটা। টম জাহাজের বামপাশে তাকাতেই দেখলো বিশাল একটা ঢেউ ওদের মাথার উপর দিয়ে এগিয়ে আসছে।
“সাবধান!”
ঢেউটা একদম সোজা কেস্ট্রেল-এর পাশে এসে আঘাত করলো। জাহাজটা উল্টে যেতে যেতে গেলো না। দুনিয়াটাই উল্টে গেলো যেনো। জাহাজের পাটাতন একেবার সমুদ্রতলের সাথে লম্ব হয়ে গিয়েছিলো প্রায়। মাস্তুলগুলো এতোটাই ঝুঁকে গিয়েছিলো যে ঢেউ স্পর্শ করলো ওগুলো। যারা কিছু আঁকড়ে ধরার সময় পায়নি, তারা অকস্মাৎ খেয়াল করলো পায়ের নিচে কিছু নেই। সোজা সমুদ্রে গিয়ে পড়লো তারা। কয়েকজন দড়িদড়া আকড়ে ধরেছিলো; বাকিরা ভেসে গেলো। টম দেখলো একটা লোকের মাথা সোজা নোঙ্গরের কপিকলের একটা কাঠে গিয়ে বাড়ি খেলো। সাথে সাথে ডুবে গেলো লোকটা, আর ভাসলো না।
ডানদিকের একটা কামানের বাধন আলগা হয়ে গিয়ে গড়াতে গড়াতে উল্টো দিকের কিনারাটা গুঁড়িয়ে পানিতে ডুবে গেলো। বাকি কামানগুলোও টান টান হয়ে থাকলো।
“মাস্তুলগুলো গোড়া থেকে কেটে ফেলো,” চিৎকার করে ডাকলো টম। একটু পরেই জাহাজটা আবার সোজা হবে, আর তখন মাস্তুলগুলো এটাকে একটা পেন্ডুলামের মতো উল্টোদিকে বাঁকিয়ে ফেলবে। আর এভাবে হতে থাকলে জাহাজটা দুলতে দুলতে উল্টেই যাবে।
কয়েকজনের হাতে তখনও কুড়াল ধরা ছিলো। ফেনায় ভরা ডেক-এ পিছলে পড়তে পড়তে ওরা দৌড়ে গেলো বড় মাস্তুলটার দিকে। বেশি কষ্ট করতে হলো না। সামান্য কেটে দিতেই অভিকর্ষ আর সাগরই বাকি কাজটা সারলো। দড়াদড়ি আর ক্যানভাস সহ ওটা ঝপাস করে গিয়ে পড়লো সাগরে। লোকজন লাফ দিয়ে ওটার রাস্তা থেকে সরে গেলো।
আবার সোজা হতে শুরু করলো কেস্ট্রেল। ডেক পুরো নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে উল্টোদিকে বেঁকে যেতে লাগলো। আরো, আরো… এতো বেশি যে পাশ দিয়ে পানি উঠে এলো।
ভাঙা মাস্তুলটাই বাঁচিয়ে দিলো ওদেরকে। পানিতে ঝুলে থাকায় ওটার ভর জাহাজটাকে সোজা রেখে উল্টে যাওয়া থেকে বিরত রাখলো। অল্পের জন্যে রক্ষা পেলো ওরা।
সব শেষ, টম ভাবলো। জাহাজের ডানপাশ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছে; সেদিক দিয়ে কলকল করে পানি ঢুকছে। কিছুক্ষণের মাঝেই জাহাজ ডুবে যাবে। সব দেখে কাউকে যে কিছু করতে আদেশ দেবে সেই মনোবল ওর থাকলো না।
ফ্রান্সিস ওর হাত ধরে ফেললো। টম ওকে ডেক-এ উঠে আসতে দেখেনি। “জাহাজের খোল পানিতে ভরে গিয়েছে; পাম্পগুলোও আর কাজ করছে না।”
কথাগুলো টমের শেষ আশাটাকেও মরীচিৎকার মতো মিলিয়ে দিলো। “জাহাজ ছেড়ে নেমে যাও,” আদেশ দিলো ও। “নৌকা নামাও।”
নৌকা নামানোর কথা কারো মাথায় ছিলো না। নৌকায় নামার সিঁড়িগুলো ভেসে গিয়েছে। টম নৌকার দড়িগুলো কেটে দিতেই ওগুলো বাঁকা হয়ে থাকা ডেক থেকে পিছলে পানিতে গিয়ে পড়লো। ঢেউ ওটাকে ভাসিয়ে নেওয়ার আগেই লোকজন যতো দ্রুত সম্ভব হুড়োহুড়ি করে নৌকায় চড়ে বসলো।
সারাহ কেবিন থেকে উপরে উঠে এলো। ওর হাতে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। ঝড়ের অমানিশার মাঝেও উজ্জ্বলতা কমছে না জিনিসটার। ওটা হচ্ছে। সেই নেপচুন তরবারি, গিলটি করা খাপে ভরা। টম যে কতোটা খুশি হলো বলতে পারবে না। সারাহ জানে এই ভাঙা জাহাজ থেকে একটা জিনিস যদি টম বাঁচাতে চায় তাহলে সেটা হচ্ছে এই তরবারিটা।
“নৌকায় ওঠো।” বলে টম পিছল ডেকটায় সারাহের হাত ধরে নিয়ে চললো যাতে ও পড়ে না যায়। আর একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। সারাহ লাফ দিলো। নৌকায় পড়া মাত্র ওর ধাক্কায় নৌকাটা উল্টেই গিয়েছিলো প্রায়। তবে ও তরবারিটা ছাড়লো না।
“এবার তুমি,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। ওকেও ও এই ধ্বংসস্তূপের ভিতরে হাত ধরে নিয়ে চললো।
